শিরোনাম

লোহিত সাগরে হুথিদের শক্ত অবস্থান: কারও লাভ, কারও ক্ষতি

সিজেডএন ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
লোহিত সাগরে হুথিদের শক্ত অবস্থান: কারও লাভ, কারও ক্ষতি
সশস্ত্র হুথি যোদ্ধা

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এখন দেশটির হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সম্প্রতি বন্দরনগর মোখা এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম মূল ধমনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের কার্যত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আফ্রিকা উপকূলে শরণার্থীর ভিড়

ইয়েমেনের সীমানা পেরিয়ে এ সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে দুই হাজারের বেশি মানুষ পালিয়ে জিবুতির ওবকে শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তাদের প্রাথমিক খাদ্য ও পানি দেওয়া হলেও আরও বড় পরিসরে মানবিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করা
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করা

বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধাক্কা

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশই বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। এছাড়া সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৮ শতাংশ আসে এ পথ দিয়ে। এদিকে হুথিদের মিত্র ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। হুথিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য হাজেম আল-আসাদ দাবি করেছেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবে নৌ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে। তবে বড় বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চরম সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

জাহাজ নিশানা করা সহজ হয়েছে

সমুদ্রপথের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের সামগ্রিক সক্ষমতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন না আনলেও জাহাজ নিশানা করা তাদের জন্য অনেক সহজ করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, উপকূলের কাছে কামান বসিয়ে জলসীমায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে তারা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচের তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমেছে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। ফলে বাধ্য হয়েই কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাচ্ছ কোম্পানিগুলো, যার ফলে প্রতিটি যাত্রায় অতিরিক্ত ২০ দিনের বেশি সময় ও পরিবহন খরচ বাড়ছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যাত্রীবাহী নৌকা
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যাত্রীবাহী নৌকা

ফিরছে জলদস্যুরা

লোহিত সাগরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অপারেশন আটালান্টা’ টাস্কফোর্স কাজ করলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও নির্দিষ্ট কাজের পরিধির কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে হুদিস্তেয়ানু বলেন, ‘আমি বলব না যে এসব জাহাজ শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে রয়েছে।...হুমকির জবাব দিতে দেরি করলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।’ এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে নৌবাহিনীর বড় অংশ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে সরে যাওয়ায় হর্ন অব আফ্রিকার উপকূলে নিরাপত্তার ফাঁক তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে সোমালিয়া উপকূলে আবারও জলদস্যুদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। হুদিস্তেয়ানু বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে সোমালিয়ার উপকূলজুড়ে জলদস্যুতার পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছি। বহুস্তরীয় এই সংকটের সময় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’

সরকারি বাহিনীর মোকাবিলায় হুথি যোদ্ধারা
সরকারি বাহিনীর মোকাবিলায় হুথি যোদ্ধারা

মিসরের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

হুতিদের এ হামলার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে মিসর। সুয়েজ খালের টোল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হওয়ায় দেশটি মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিসর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা সুয়েজ খালের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। যদিও হুথিরা হামলা বন্ধের কথা বলেছে, কিন্তু নিরাপত্তা আশঙ্কার কারণে বড় কোম্পানিগুলো আগের রুটে আর ফিরে যায়নি।

কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে ইরিত্রিয়ার

ইয়েমেন সংকটের কারণে লোহিত সাগরের অপর পারে অবস্থিত আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কি দীর্ঘকাল বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নীতিতে চললেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করছেন। বিশ্লেষক আল-শাফেই এ বিষয়ে বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার ভান করছেন আফওয়ার্কি। কিন্তু বাস্তবে লোহিত সাগরে যা ঘটছে, তা থেকে তিনি অনেক সুবিধা পাচ্ছেন।’

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/