রাজউকের ‘বিতর্কিত’ প্লটে এসইএল-এর বহুতল ভবন

রাজউকের ‘বিতর্কিত’ প্লটে এসইএল-এর বহুতল ভবন
সেলিনা আক্তার

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যেকোনো কর্মকর্তার দপ্তরে গেলেই চোখে পড়ে টেবিলে কাচের নিচে রাখা একটি তালিকা। প্রায় দুই যুগ আগে হওয়া সেই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে রাজধানীর গুলশান, বনানী, মহাখালী ও মতিঝিলের ৩৯টি ‘বিতর্কিত’ প্লটের নাম। তালিকা বানিয়ে এরই মধ্যে ‘বিতর্কিত’ এই প্লটগুলো রাজউক সরকারি সম্পত্তি করে নিয়েছে। এরপরও জাল কাগজপত্র, মূল নথি গায়েব, ভুয়া মালিকানা দাবি ও প্রভাবশালী মহলের দখলের চেষ্টায় একে একে তালিকা থেকে বাদ পড়ছে প্লটগুলো।
এবার সেই তালিকা থেকে নতুন করে ১৫০ থেকে ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের আরেকটি প্লট অবমুক্ত করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বোর্ড সভায় রাজউক গুলশানের এসডব্লিউ (এইচ) ব্লকের ১ ও ২ নম্বর সড়কসংলগ্ন ২২ কাঠার ৭ নম্বর প্লটটিকে অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মূল নথি ছাড়া কেবল ফটোকপির ভিত্তিতে খোলা ‘ছায়া নথি’ ব্যবহার করে প্লটটি অবমুক্ত করা হচ্ছে। এখতিয়ারবহির্ভূত সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ‘তামাদি’ প্রতিবেদনের আলোকে তা বাস্তবায়ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে সংস্থাটির চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বোর্ড সদস্য, সংশ্লিষ্ট পরিচালক, উপ-পরিচালক ও অফিস সহকারী। ফলে ‘নীল নকশার’ অংশ হিসেবে সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুতই গুলশানে এই প্লটটিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তা চড়া মূল্যে বিক্রি শুরু করবে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)।’
রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত
ড. আদিল মুহাম্মদ খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রাজউক কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, অবমুক্তকরণের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করলেও চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আর এসইএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের দাবি, উল্লেখিত প্লট নিয়ে কোনো জটিলতা নেই।
২০ বছরের বিতর্ক, হঠাৎ অবমুক্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত শতকের ষাটের দশকে বরাদ্দ দেওয়া গুলশান, বনানী, মহাখালী ও দিলকুশার ৩৯টি প্লটকে প্রায় ২০-২১ বছর আগে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩১টি প্লটই গুলশান এলাকায়। প্রতিটি প্লটের আয়তন ১৫ কাঠা থেকে এক বিঘারও (২০ কাঠায় এক বিঘা) বেশি। বর্তমানে এসব প্লটের বাজারমূল্য ১০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্লট হাতিয়ে নিতে প্রথমেই রাজউক থেকে মূল নথি গায়েব করা হয়। পরে ফটোকপি দিয়ে ‘ছায়া নথি’ খুলে ফাইল হালনাগাদ এবং মালিকানা পরিবর্তনের নানা প্রক্রিয়া চালানো হয়। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্লটভেদে ১০ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকে। সেই অর্থের বড় অংশ যায় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।
এর মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজউকের ষষ্ঠ বোর্ড সভায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান, সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ্দ বশিরুল হক ভূইয়া, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক, সদস্য (উন্নয়ন) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের উপস্থিতিতে গুলশানের এসডব্লিউ (এইচ) ব্লকের ৭ নম্বরের এই প্লটটি অবমুক্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্লটটির যৌথ লিজগ্রহীতা রওশন আরা বেগমের উত্তরাধিকারীদের আবেদন বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে।
‘মূল নথি গায়েব করে তারা আসেন ফটোকপি নিয়ে’
রাজউকের বিতর্কিত ৩৯টি প্লট মূলত পাকিস্তানি নাগরিকদের রেখে যাওয়া। এই তালিকার ২৮ নম্বরে আছে গুলশানের ১ ও ২ নম্বর রোডসংলগ্ন এই প্লটটি। শুরু থেকেই প্লটটি নিয়ে একাধিক পক্ষ মালিকানা দাবি করে আসছে।
রাজউকের বোর্ড সভার নথি অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৩ আগস্ট আবদুল মান্নানের নামে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল তার নামে লিজ দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। তবে ১৯৬৭ সালে আজহার আলী খান নামে আরেক ব্যক্তি নিজেকে প্লটটির বরাদ্দগ্রহীতা দাবি করে সার্ভিস চার্জ পরিশোধের আবেদন করেন। একইভাবে মাজহার আলী খানও মালিকানা দাবি করেন।
এরপর আবদুল মান্নান মারা গেলে তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম ও সন্তানদের (৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে) নামে ওয়ারিশানসূত্রে নামজারি করা হয় বলে দাবি করা হয়। রওশন আরা বেগমের মৃত্যুর পর তার সন্তানরা নতুন করে নামজারির আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন রাজউক এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি।

২০১৫ সালে আবদুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ প্লটটি বিতর্কিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করেন। বারবার আবেদনকারী মূল বরাদ্দ সংক্রান্ত দালিলিক প্রমাণাদি উপস্থাপন না করে কেবল ফটোকপি জমা দিচ্ছেন।
দেওয়ানি জটিলতা, মন্ত্রণালয়, সিআইডি ও দুদকের তদন্ত
রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখার তৎকালীন উপ-পরিচালক মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী ও সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বিষয়টি তদন্তের জন্য চিঠি দেন।
২০১৮ সালে সিআইডি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও এতে সন্তুষ্ট হয়নি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্তের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটির কাজে কোনো অগ্রগতি না থাকায় ২০২০ সালে দুদক মালিকানা নির্ধারনের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করে। এভাবে কমিটির ধারাবাহিকতা ও কার্যক্রমের চিত্র না পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে পূর্ত মন্ত্রণালয় আরও একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
আদালতের স্থিতাবস্থা উপেক্ষা
রাজউকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালে রাজউক থেকে নামজারি অনুমোদন না হওয়ায় হাইকোর্টে রিট করেন আব্দুল মান্নানের আরেক ছেলে মো. আব্দুল কাইয়ুম। ওই রিটের পর আদালত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্লটটির দখল ও বর্তমান অবস্থার ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ, প্লটের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশনাও আমলে নেওয়া হয়নি। বরং এখতিয়ারবহির্ভূত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামতের উপর ভিত্তি করে প্লটটি বিতর্কিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. সাইদ জায়েদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই।’
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সরেজমিনে দেখা যায়, গুলশান ১ নম্বরে ডা. ফজলে রাব্বি পার্কের গেটের বিপরীতে অবস্থিত এই প্লট। সেখান থেকে কয়েক কদম হেঁটে গেলেই মূল সড়ক। কাছেই পুলিশ প্লাজা ও হাতিরঝিল প্রকল্প। প্লটটির চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একতলা একটি পাকা ভবন ও বিভিন্ন ফলজ গাছ। এসব দেখাশোনার জন্য আছে কেয়ারটেকারও। গেটের ওপরে ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাশেই কোম্পানিটির বিলবোর্ডও রয়েছে।
আমরা মালিকদের কাছ থেকে এই ভূমি নিয়েছি। নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে সব কাজ শেষের পর ভবনটি নির্মাণ হলে প্রতি স্কয়ার ফিট ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে
আবু মোহাম্মদ রাসেল সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক, এসইএল
এই প্লটের বিপরীত দিকে ৩৫ বছর ধরে চায়ের দোকান চালান রবিউল আওয়াল। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই প্লটটি দখলে রেখেছেন রওশন আরা বেগমের উত্তরাধিকারীরা।
জানা গেছে, সম্প্রতি বিতর্কিত তালিকা থেকে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্লটটি ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)’ এর কাছে হস্তান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।
পরিচয় গোপন করে কোম্পানিটির সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক আবু মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘আমরা মালিকদের কাছ থেকে এই ভূমি নিয়েছি। নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে সব কাজ শেষের পর ভবনটি নির্মাণ হলে প্রতি স্কয়ার ফুট ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে।’
এসইএলের এই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে ভবন নির্মাণ হলে ৩ হাজার স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা।

তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২২ কাঠা (১৫ হাজার ৮৪০ বর্গফুট) আয়তনের এই প্লটটিতে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী চারপাশের প্রয়োজনীয় সেটব্যাক বা খালি জায়গা ছেড়ে দেওয়ার পরও ভবনের প্রতি তলায় প্রায় ৬ হাজার ৩৩৬ বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করা যাবে। ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) ৫ ধরলে দুটি গ্রাউন্ড বেজমেন্ট ও ১২ তলা (গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ ১৩ তলা) ভবন নির্মাণ সম্ভব। অবস্থান ও রাস্তার প্রশস্ততা বিবেচনায় প্লটটিতে বাণিজ্যিক অনুমোদনও মিলতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম আরও অনেক বেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজউকের সাবেক কর্মকর্তা বর্তমানে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর সদস্য (প্রশাসন) ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে শনিবার (২৩ মে) কথা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি যে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলাম, তা ১১ বছর আগের। তখন ঘটনা কী ছিল, এখন আর মনে নেই। হয়তো কোনো পক্ষের চিঠির ভিত্তিতে কাজটি করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা অবমুক্ত করার মতো কোনো সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত দিইনি।’
আমরা এখনো নামজারি করিনি। বিধি মোতাবেক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়
ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি ১১ মে এই পদে যোগদান করেছি। বোর্ড সভায় প্লটটি অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। নথিটি আইন শাখায় মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট শাখার উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মাহাবুব রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বোর্ড সভায় সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই।’
সার্বিক বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমরা এখনো নামজারি করিনি। বিধি মোতাবেক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়।’
রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত
ড. আদিল মুহাম্মদ খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জানতে চাইলে ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এসইএল)’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল এই সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এই প্লটের মালিকানা বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই, আপনি চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
ইতোপূর্বে এ ধরনের বিতর্কিত প্লটে রাজউক ‘১০টি পরিত্যক্ত প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ’ নামে একটি ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। মূলত অসাধু মহলের হাত থেকে সরকারি প্লট রক্ষা করতে সরকার এমন কার্যক্রম নিয়েছিল বলে শোনা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ওই ১০টি প্লটের মতো সব বিতর্কিত প্লটই আরও আগেই সরকারের আত্তীকরণ করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত।’

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যেকোনো কর্মকর্তার দপ্তরে গেলেই চোখে পড়ে টেবিলে কাচের নিচে রাখা একটি তালিকা। প্রায় দুই যুগ আগে হওয়া সেই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে রাজধানীর গুলশান, বনানী, মহাখালী ও মতিঝিলের ৩৯টি ‘বিতর্কিত’ প্লটের নাম। তালিকা বানিয়ে এরই মধ্যে ‘বিতর্কিত’ এই প্লটগুলো রাজউক সরকারি সম্পত্তি করে নিয়েছে। এরপরও জাল কাগজপত্র, মূল নথি গায়েব, ভুয়া মালিকানা দাবি ও প্রভাবশালী মহলের দখলের চেষ্টায় একে একে তালিকা থেকে বাদ পড়ছে প্লটগুলো।
এবার সেই তালিকা থেকে নতুন করে ১৫০ থেকে ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের আরেকটি প্লট অবমুক্ত করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বোর্ড সভায় রাজউক গুলশানের এসডব্লিউ (এইচ) ব্লকের ১ ও ২ নম্বর সড়কসংলগ্ন ২২ কাঠার ৭ নম্বর প্লটটিকে অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মূল নথি ছাড়া কেবল ফটোকপির ভিত্তিতে খোলা ‘ছায়া নথি’ ব্যবহার করে প্লটটি অবমুক্ত করা হচ্ছে। এখতিয়ারবহির্ভূত সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ‘তামাদি’ প্রতিবেদনের আলোকে তা বাস্তবায়ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে সংস্থাটির চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বোর্ড সদস্য, সংশ্লিষ্ট পরিচালক, উপ-পরিচালক ও অফিস সহকারী। ফলে ‘নীল নকশার’ অংশ হিসেবে সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুতই গুলশানে এই প্লটটিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তা চড়া মূল্যে বিক্রি শুরু করবে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)।’
রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত
ড. আদিল মুহাম্মদ খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রাজউক কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, অবমুক্তকরণের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করলেও চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আর এসইএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের দাবি, উল্লেখিত প্লট নিয়ে কোনো জটিলতা নেই।
২০ বছরের বিতর্ক, হঠাৎ অবমুক্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত শতকের ষাটের দশকে বরাদ্দ দেওয়া গুলশান, বনানী, মহাখালী ও দিলকুশার ৩৯টি প্লটকে প্রায় ২০-২১ বছর আগে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩১টি প্লটই গুলশান এলাকায়। প্রতিটি প্লটের আয়তন ১৫ কাঠা থেকে এক বিঘারও (২০ কাঠায় এক বিঘা) বেশি। বর্তমানে এসব প্লটের বাজারমূল্য ১০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্লট হাতিয়ে নিতে প্রথমেই রাজউক থেকে মূল নথি গায়েব করা হয়। পরে ফটোকপি দিয়ে ‘ছায়া নথি’ খুলে ফাইল হালনাগাদ এবং মালিকানা পরিবর্তনের নানা প্রক্রিয়া চালানো হয়। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্লটভেদে ১০ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকে। সেই অর্থের বড় অংশ যায় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।
এর মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজউকের ষষ্ঠ বোর্ড সভায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান, সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ্দ বশিরুল হক ভূইয়া, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক, সদস্য (উন্নয়ন) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের উপস্থিতিতে গুলশানের এসডব্লিউ (এইচ) ব্লকের ৭ নম্বরের এই প্লটটি অবমুক্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্লটটির যৌথ লিজগ্রহীতা রওশন আরা বেগমের উত্তরাধিকারীদের আবেদন বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে।
‘মূল নথি গায়েব করে তারা আসেন ফটোকপি নিয়ে’
রাজউকের বিতর্কিত ৩৯টি প্লট মূলত পাকিস্তানি নাগরিকদের রেখে যাওয়া। এই তালিকার ২৮ নম্বরে আছে গুলশানের ১ ও ২ নম্বর রোডসংলগ্ন এই প্লটটি। শুরু থেকেই প্লটটি নিয়ে একাধিক পক্ষ মালিকানা দাবি করে আসছে।
রাজউকের বোর্ড সভার নথি অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৩ আগস্ট আবদুল মান্নানের নামে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল তার নামে লিজ দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। তবে ১৯৬৭ সালে আজহার আলী খান নামে আরেক ব্যক্তি নিজেকে প্লটটির বরাদ্দগ্রহীতা দাবি করে সার্ভিস চার্জ পরিশোধের আবেদন করেন। একইভাবে মাজহার আলী খানও মালিকানা দাবি করেন।
এরপর আবদুল মান্নান মারা গেলে তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম ও সন্তানদের (৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে) নামে ওয়ারিশানসূত্রে নামজারি করা হয় বলে দাবি করা হয়। রওশন আরা বেগমের মৃত্যুর পর তার সন্তানরা নতুন করে নামজারির আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন রাজউক এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি।

২০১৫ সালে আবদুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ প্লটটি বিতর্কিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করেন। বারবার আবেদনকারী মূল বরাদ্দ সংক্রান্ত দালিলিক প্রমাণাদি উপস্থাপন না করে কেবল ফটোকপি জমা দিচ্ছেন।
দেওয়ানি জটিলতা, মন্ত্রণালয়, সিআইডি ও দুদকের তদন্ত
রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখার তৎকালীন উপ-পরিচালক মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী ও সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বিষয়টি তদন্তের জন্য চিঠি দেন।
২০১৮ সালে সিআইডি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও এতে সন্তুষ্ট হয়নি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্তের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটির কাজে কোনো অগ্রগতি না থাকায় ২০২০ সালে দুদক মালিকানা নির্ধারনের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করে। এভাবে কমিটির ধারাবাহিকতা ও কার্যক্রমের চিত্র না পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে পূর্ত মন্ত্রণালয় আরও একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
আদালতের স্থিতাবস্থা উপেক্ষা
রাজউকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালে রাজউক থেকে নামজারি অনুমোদন না হওয়ায় হাইকোর্টে রিট করেন আব্দুল মান্নানের আরেক ছেলে মো. আব্দুল কাইয়ুম। ওই রিটের পর আদালত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্লটটির দখল ও বর্তমান অবস্থার ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ, প্লটের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশনাও আমলে নেওয়া হয়নি। বরং এখতিয়ারবহির্ভূত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামতের উপর ভিত্তি করে প্লটটি বিতর্কিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. সাইদ জায়েদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই।’
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সরেজমিনে দেখা যায়, গুলশান ১ নম্বরে ডা. ফজলে রাব্বি পার্কের গেটের বিপরীতে অবস্থিত এই প্লট। সেখান থেকে কয়েক কদম হেঁটে গেলেই মূল সড়ক। কাছেই পুলিশ প্লাজা ও হাতিরঝিল প্রকল্প। প্লটটির চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একতলা একটি পাকা ভবন ও বিভিন্ন ফলজ গাছ। এসব দেখাশোনার জন্য আছে কেয়ারটেকারও। গেটের ওপরে ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাশেই কোম্পানিটির বিলবোর্ডও রয়েছে।
আমরা মালিকদের কাছ থেকে এই ভূমি নিয়েছি। নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে সব কাজ শেষের পর ভবনটি নির্মাণ হলে প্রতি স্কয়ার ফিট ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে
আবু মোহাম্মদ রাসেল সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক, এসইএল
এই প্লটের বিপরীত দিকে ৩৫ বছর ধরে চায়ের দোকান চালান রবিউল আওয়াল। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই প্লটটি দখলে রেখেছেন রওশন আরা বেগমের উত্তরাধিকারীরা।
জানা গেছে, সম্প্রতি বিতর্কিত তালিকা থেকে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্লটটি ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)’ এর কাছে হস্তান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।
পরিচয় গোপন করে কোম্পানিটির সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক আবু মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘আমরা মালিকদের কাছ থেকে এই ভূমি নিয়েছি। নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে সব কাজ শেষের পর ভবনটি নির্মাণ হলে প্রতি স্কয়ার ফুট ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে।’
এসইএলের এই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে ভবন নির্মাণ হলে ৩ হাজার স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা।

তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২২ কাঠা (১৫ হাজার ৮৪০ বর্গফুট) আয়তনের এই প্লটটিতে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী চারপাশের প্রয়োজনীয় সেটব্যাক বা খালি জায়গা ছেড়ে দেওয়ার পরও ভবনের প্রতি তলায় প্রায় ৬ হাজার ৩৩৬ বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করা যাবে। ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) ৫ ধরলে দুটি গ্রাউন্ড বেজমেন্ট ও ১২ তলা (গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ ১৩ তলা) ভবন নির্মাণ সম্ভব। অবস্থান ও রাস্তার প্রশস্ততা বিবেচনায় প্লটটিতে বাণিজ্যিক অনুমোদনও মিলতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম আরও অনেক বেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজউকের সাবেক কর্মকর্তা বর্তমানে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর সদস্য (প্রশাসন) ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে শনিবার (২৩ মে) কথা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি যে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলাম, তা ১১ বছর আগের। তখন ঘটনা কী ছিল, এখন আর মনে নেই। হয়তো কোনো পক্ষের চিঠির ভিত্তিতে কাজটি করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা অবমুক্ত করার মতো কোনো সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত দিইনি।’
আমরা এখনো নামজারি করিনি। বিধি মোতাবেক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়
ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি ১১ মে এই পদে যোগদান করেছি। বোর্ড সভায় প্লটটি অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। নথিটি আইন শাখায় মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট শাখার উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মাহাবুব রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বোর্ড সভায় সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই।’
সার্বিক বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমরা এখনো নামজারি করিনি। বিধি মোতাবেক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়।’
রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত
ড. আদিল মুহাম্মদ খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জানতে চাইলে ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এসইএল)’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল এই সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এই প্লটের মালিকানা বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই, আপনি চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
ইতোপূর্বে এ ধরনের বিতর্কিত প্লটে রাজউক ‘১০টি পরিত্যক্ত প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ’ নামে একটি ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। মূলত অসাধু মহলের হাত থেকে সরকারি প্লট রক্ষা করতে সরকার এমন কার্যক্রম নিয়েছিল বলে শোনা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ওই ১০টি প্লটের মতো সব বিতর্কিত প্লটই আরও আগেই সরকারের আত্তীকরণ করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত।’

রাজউকের ‘বিতর্কিত’ প্লটে এসইএল-এর বহুতল ভবন
সেলিনা আক্তার

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) যেকোনো কর্মকর্তার দপ্তরে গেলেই চোখে পড়ে টেবিলে কাচের নিচে রাখা একটি তালিকা। প্রায় দুই যুগ আগে হওয়া সেই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে রাজধানীর গুলশান, বনানী, মহাখালী ও মতিঝিলের ৩৯টি ‘বিতর্কিত’ প্লটের নাম। তালিকা বানিয়ে এরই মধ্যে ‘বিতর্কিত’ এই প্লটগুলো রাজউক সরকারি সম্পত্তি করে নিয়েছে। এরপরও জাল কাগজপত্র, মূল নথি গায়েব, ভুয়া মালিকানা দাবি ও প্রভাবশালী মহলের দখলের চেষ্টায় একে একে তালিকা থেকে বাদ পড়ছে প্লটগুলো।
এবার সেই তালিকা থেকে নতুন করে ১৫০ থেকে ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের আরেকটি প্লট অবমুক্ত করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বোর্ড সভায় রাজউক গুলশানের এসডব্লিউ (এইচ) ব্লকের ১ ও ২ নম্বর সড়কসংলগ্ন ২২ কাঠার ৭ নম্বর প্লটটিকে অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মূল নথি ছাড়া কেবল ফটোকপির ভিত্তিতে খোলা ‘ছায়া নথি’ ব্যবহার করে প্লটটি অবমুক্ত করা হচ্ছে। এখতিয়ারবহির্ভূত সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ‘তামাদি’ প্রতিবেদনের আলোকে তা বাস্তবায়ন করতে উঠে পড়ে লেগেছে সংস্থাটির চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বোর্ড সদস্য, সংশ্লিষ্ট পরিচালক, উপ-পরিচালক ও অফিস সহকারী। ফলে ‘নীল নকশার’ অংশ হিসেবে সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুতই গুলশানে এই প্লটটিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তা চড়া মূল্যে বিক্রি শুরু করবে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)।’
রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত
ড. আদিল মুহাম্মদ খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
রাজউক কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, অবমুক্তকরণের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করলেও চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আর এসইএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের দাবি, উল্লেখিত প্লট নিয়ে কোনো জটিলতা নেই।
২০ বছরের বিতর্ক, হঠাৎ অবমুক্ত
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত শতকের ষাটের দশকে বরাদ্দ দেওয়া গুলশান, বনানী, মহাখালী ও দিলকুশার ৩৯টি প্লটকে প্রায় ২০-২১ বছর আগে ‘বিতর্কিত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩১টি প্লটই গুলশান এলাকায়। প্রতিটি প্লটের আয়তন ১৫ কাঠা থেকে এক বিঘারও (২০ কাঠায় এক বিঘা) বেশি। বর্তমানে এসব প্লটের বাজারমূল্য ১০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্লট হাতিয়ে নিতে প্রথমেই রাজউক থেকে মূল নথি গায়েব করা হয়। পরে ফটোকপি দিয়ে ‘ছায়া নথি’ খুলে ফাইল হালনাগাদ এবং মালিকানা পরিবর্তনের নানা প্রক্রিয়া চালানো হয়। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্লটভেদে ১০ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকে। সেই অর্থের বড় অংশ যায় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে।
এর মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজউকের ষষ্ঠ বোর্ড সভায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান, সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ্দ বশিরুল হক ভূইয়া, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) এরাদুল হক, সদস্য (উন্নয়ন) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের উপস্থিতিতে গুলশানের এসডব্লিউ (এইচ) ব্লকের ৭ নম্বরের এই প্লটটি অবমুক্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্লটটির যৌথ লিজগ্রহীতা রওশন আরা বেগমের উত্তরাধিকারীদের আবেদন বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে।
‘মূল নথি গায়েব করে তারা আসেন ফটোকপি নিয়ে’
রাজউকের বিতর্কিত ৩৯টি প্লট মূলত পাকিস্তানি নাগরিকদের রেখে যাওয়া। এই তালিকার ২৮ নম্বরে আছে গুলশানের ১ ও ২ নম্বর রোডসংলগ্ন এই প্লটটি। শুরু থেকেই প্লটটি নিয়ে একাধিক পক্ষ মালিকানা দাবি করে আসছে।
রাজউকের বোর্ড সভার নথি অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের ২৩ আগস্ট আবদুল মান্নানের নামে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল তার নামে লিজ দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। তবে ১৯৬৭ সালে আজহার আলী খান নামে আরেক ব্যক্তি নিজেকে প্লটটির বরাদ্দগ্রহীতা দাবি করে সার্ভিস চার্জ পরিশোধের আবেদন করেন। একইভাবে মাজহার আলী খানও মালিকানা দাবি করেন।
এরপর আবদুল মান্নান মারা গেলে তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম ও সন্তানদের (৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে) নামে ওয়ারিশানসূত্রে নামজারি করা হয় বলে দাবি করা হয়। রওশন আরা বেগমের মৃত্যুর পর তার সন্তানরা নতুন করে নামজারির আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন রাজউক এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি।

২০১৫ সালে আবদুল মান্নানের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ প্লটটি বিতর্কিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করেন। বারবার আবেদনকারী মূল বরাদ্দ সংক্রান্ত দালিলিক প্রমাণাদি উপস্থাপন না করে কেবল ফটোকপি জমা দিচ্ছেন।
দেওয়ানি জটিলতা, মন্ত্রণালয়, সিআইডি ও দুদকের তদন্ত
রাজউকের এস্টেট ও ভূমি শাখার তৎকালীন উপ-পরিচালক মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী ও সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বিষয়টি তদন্তের জন্য চিঠি দেন।
২০১৮ সালে সিআইডি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও এতে সন্তুষ্ট হয়নি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্তের জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটির কাজে কোনো অগ্রগতি না থাকায় ২০২০ সালে দুদক মালিকানা নির্ধারনের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করে। এভাবে কমিটির ধারাবাহিকতা ও কার্যক্রমের চিত্র না পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে পূর্ত মন্ত্রণালয় আরও একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে।
আদালতের স্থিতাবস্থা উপেক্ষা
রাজউকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালে রাজউক থেকে নামজারি অনুমোদন না হওয়ায় হাইকোর্টে রিট করেন আব্দুল মান্নানের আরেক ছেলে মো. আব্দুল কাইয়ুম। ওই রিটের পর আদালত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্লটটির দখল ও বর্তমান অবস্থার ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ, প্লটের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু আদালতের সেই নির্দেশনাও আমলে নেওয়া হয়নি। বরং এখতিয়ারবহির্ভূত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতামতের উপর ভিত্তি করে প্লটটি বিতর্কিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. সাইদ জায়েদ সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার আমার নেই।’
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সরেজমিনে দেখা যায়, গুলশান ১ নম্বরে ডা. ফজলে রাব্বি পার্কের গেটের বিপরীতে অবস্থিত এই প্লট। সেখান থেকে কয়েক কদম হেঁটে গেলেই মূল সড়ক। কাছেই পুলিশ প্লাজা ও হাতিরঝিল প্রকল্প। প্লটটির চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একতলা একটি পাকা ভবন ও বিভিন্ন ফলজ গাছ। এসব দেখাশোনার জন্য আছে কেয়ারটেকারও। গেটের ওপরে ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। পাশেই কোম্পানিটির বিলবোর্ডও রয়েছে।
আমরা মালিকদের কাছ থেকে এই ভূমি নিয়েছি। নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে সব কাজ শেষের পর ভবনটি নির্মাণ হলে প্রতি স্কয়ার ফিট ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে
আবু মোহাম্মদ রাসেল সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক, এসইএল
এই প্লটের বিপরীত দিকে ৩৫ বছর ধরে চায়ের দোকান চালান রবিউল আওয়াল। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই প্লটটি দখলে রেখেছেন রওশন আরা বেগমের উত্তরাধিকারীরা।
জানা গেছে, সম্প্রতি বিতর্কিত তালিকা থেকে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে প্লটটি ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এসইএল)’ এর কাছে হস্তান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।
পরিচয় গোপন করে কোম্পানিটির সহকারী বিক্রয় ব্যবস্থাপক আবু মোহাম্মদ রাসেলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘আমরা মালিকদের কাছ থেকে এই ভূমি নিয়েছি। নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে সব কাজ শেষের পর ভবনটি নির্মাণ হলে প্রতি স্কয়ার ফুট ২৬ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হতে পারে।’
এসইএলের এই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানে ভবন নির্মাণ হলে ৩ হাজার স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা।

তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২২ কাঠা (১৫ হাজার ৮৪০ বর্গফুট) আয়তনের এই প্লটটিতে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী চারপাশের প্রয়োজনীয় সেটব্যাক বা খালি জায়গা ছেড়ে দেওয়ার পরও ভবনের প্রতি তলায় প্রায় ৬ হাজার ৩৩৬ বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করা যাবে। ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) ৫ ধরলে দুটি গ্রাউন্ড বেজমেন্ট ও ১২ তলা (গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ ১৩ তলা) ভবন নির্মাণ সম্ভব। অবস্থান ও রাস্তার প্রশস্ততা বিবেচনায় প্লটটিতে বাণিজ্যিক অনুমোদনও মিলতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম আরও অনেক বেড়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজউকের সাবেক কর্মকর্তা বর্তমানে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর সদস্য (প্রশাসন) ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে শনিবার (২৩ মে) কথা হলে তিনি সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমি যে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলাম, তা ১১ বছর আগের। তখন ঘটনা কী ছিল, এখন আর মনে নেই। হয়তো কোনো পক্ষের চিঠির ভিত্তিতে কাজটি করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা অবমুক্ত করার মতো কোনো সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত দিইনি।’
আমরা এখনো নামজারি করিনি। বিধি মোতাবেক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়
ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম চেয়ারম্যান, রাজউক
এই বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) ডা. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি ১১ মে এই পদে যোগদান করেছি। বোর্ড সভায় প্লটটি অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। নথিটি আইন শাখায় মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট শাখার উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) মো. মাহাবুব রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বোর্ড সভায় সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই।’
সার্বিক বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম মুঠোফোনে সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘আমরা এখনো নামজারি করিনি। বিধি মোতাবেক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ, এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত নয়।’
রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত
ড. আদিল মুহাম্মদ খান অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জানতে চাইলে ‘দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এসইএল)’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল এই সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এই প্লটের মালিকানা বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই, আপনি চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
ইতোপূর্বে এ ধরনের বিতর্কিত প্লটে রাজউক ‘১০টি পরিত্যক্ত প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ’ নামে একটি ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। মূলত অসাধু মহলের হাত থেকে সরকারি প্লট রক্ষা করতে সরকার এমন কার্যক্রম নিয়েছিল বলে শোনা যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, ওই ১০টি প্লটের মতো সব বিতর্কিত প্লটই আরও আগেই সরকারের আত্তীকরণ করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘রাজউকের একটি চক্র আছে, যারা অবৈধভাবে এ ধরনের প্লট ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চিহ্নিত করা দরকার। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত করা উচিত।’




