শিরোনাম

এত অভিযোগের পরও পদন্নোতি পাচ্ছেন স্থাপত্য অধিদপ্তরের শাবাব রায়হান

এত অভিযোগের পরও পদন্নোতি পাচ্ছেন স্থাপত্য অধিদপ্তরের শাবাব রায়হান
স্থাপত্য অধিদপ্তরের নির্বাহী স্থপতি শাবাব রায়হান কবীর। ছবি: ফেসবুক

সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণের পর ট্রাভেল এজেন্সিকে বিমান ভাড়ার টাকা সময়মতো পরিশোধ না করা, ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করাসহ নানা ধরনের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নারী সহকর্মীদের অভিযোগের পর তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলাও ছিল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে সেই মামলা থেকে অব্যাহতি পান স্থাপত্য অধিদপ্তরের নির্বাহী স্থপতি শাবাব রায়হান কবীর। আর এখন তো তিনি পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী স্থপতি থেকে তত্ত্বাবধায়ক স্থপতি হতে যাচ্ছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানা গেছে।

ঘটনার শুরু গত বছরের শেষ দিকে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ডিপ্লোম্যাটিক এনক্লেভে বাংলাদেশের স্থায়ী চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণের একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ‘পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ ৪র্থ (সংশোধিত)’ প্রকল্প পর্যবেক্ষণের জন্য পাঁচ সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষক দলের একজন ছিলেন শাবাব রায়হান।

ভ্রমণের জন্য ওই পাঁচ কর্মকর্তা ঢাকা-ইসলামাবাদ-ঢাকা বিমান টিকিট কিনেছিলেন ট্রাভেলারা নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি থেকে। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর বিমান ভাড়ার পুরো টাকা দেওয়ার কথা ছিল। পর্যবেক্ষক দলের বাকি চার সদস্য তাদের পাওনা টাকা দিলেও শাবাব রায়হান পুরোটা দেননি। মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও শাবাব রায়হান দিয়েছিলেন মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

বাকি ৯৮ হাজার ৪০০ টাকা না পেয়ে ট্রাভেলারার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোঃ দেলোয়ার হোসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) বরাবর একটি চিঠি দেন। সেই চিঠির বিষয়– এর ঘরে লেখা ছিল, ‘বিমান ভাড়ার অর্থ পরিশোধ না করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে।’

চিঠির ভেতরে লেখা হয়, শাবাব রায়হান কবীর, নির্বাহী স্থপতি, সার্কেল-৭, বিভাগ-১৯, স্থাপত্য অধিদপ্তর, গত ৭-১১ জুলাই ২০২৫ তারিখে ০৫ সদস্যবিশিষ্ট দলের সদস্য হিসেবে ইসলামাবাদ সফর করেন। উল্লেখ্য যে, এই মর্মে ট্রাভেলারা কর্তৃক ৫ জুলাই থাই এয়ারওয়েজে ৫ জনের ঢাকা-ইসলামাবাদ-ঢাকা বিমান টিকিট (PNR-7GUZWZ) ক্রয় করা হয় জনপ্রতি ২,২৮,৪০০ টাকায়। উক্ত দলের ৪ জন সদস্য নিজ নিজ বিমান ভাড়া ইতোমধ্যে ট্রাভেলারাকে পরিশোধ করেছেন। তবে জনাব শাবাব রায়হান কবীরকে বারংবার বলা সত্বেও গত ২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ না করে মাত্র ১,৩০,০০০ টাকা পরিশোধ করেন। পরবর্তীতে তিনি অবশিষ্ট ৯৮,৪০০ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।’

ট্রাভেলারা থেকে এই চিঠি পাওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে শাবাব রায়হানের বিষয়টি তদন্ত করার জন্য চিঠি পাঠায়। বিষয়টি নিয়ে স্থাপত্য অধিদপ্তর একাধিক সভা করেছে। এই প্রক্রিয়া চলার সময় শাবাব রায়হান ট্রাভেলারার ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেনকে বাকি ৯৮,৪০০ টাকা দেন এবং তাকে সেই টাকা বুঝে পাওয়ার স্লিপ ব্যাক ডেটে দিতে অনুরোধ করেন।

স্থাপত্য অধিদপ্তরের এ বছরের জুনের ৯ তারিখের সভায় ট্রাভেলারার ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেলোয়ার হোসেন উপস্থিত থেকে পুরো ঘটনার বিবরণ দেন। দেলোয়ার হোসেন সেখানে বলেন, শাবাব রায়হান এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে বাকি টাকা দেন। তবে সেই টাকা গত বছরের ২৭ নভেম্বর দেওয়া হয়েছে, এমন প্রাপ্তিস্বীকার চিঠি দিতে অনুরোধ করেন। স্থাপত্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে শাবাব রায়হানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে চিঠিও দিয়েছে।

শুধু বিমান ভাড়া সময়মতো পরিশোধ না করার অভিযোগই নয়, শাবাব রায়হানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ভ্রমণের সময় ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়েও। এ ছাড়া দেশে ফিরেও তিনি ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব নম্বর পাঠিয়ে অর্থ দাবি করেছেন তিনি। এসবের প্রমাণও বিভিন্ন সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

৯ জুনের সেই সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (উপসচিব) আকতার হোসেন নির্বাহী স্থপতি শাবাব রায়হানের বিমান ভাড়া সম্পূর্ণ পরিশোধ না করার অভিযোগের বিষয়ে বলৈন। পাশাপাশি ইসলামাবাদে ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং দেশে ফিরে ঠিকাদারের কাছে নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বর পাঠিয়ে টাকা চাওয়ার বিষয়ে শোনা গেছে বলে উল্লেখ করেন আকতার হোসেন।

বিষয়টি নিয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফার থেকে যোগাযোগ করা হয় শাবাব রায়হানের সঙ্গে। বিমান ভাড়ার পুরো টাকাই ট্রাভেলারাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়ার ব্যাপারে এই কর্মকর্তা বলেন, অধিদপ্তর থেকে শুধু খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে, তিনি বিমান ভাড়ার টাকা ঠিকঠাক দিয়েছেন কি না।

এরপর তিনি পুরো বিষয়টির জন্য পরারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজনকে দায়ী করে বলেন, ‘বিমানের টিকিট তো এভাবে তারা আমাদের দিয়ে কাটাতে পারে না বা আমাদের দিয়ে টাকা দেওয়াতে পারে না। আমরা যারা পর্যবেক্ষক হিসেবে ইসলামাবাদ গিয়েছিলাম, নিয়ম অনুযায়ী তাদের শুধু টিএ/ডিএ দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা আমাদের দিয়ে কাগজ সই করিয়ে নিয়ে নিজেরাই বিমান টিকিট কেটেছে। আমি এর প্রতিবাদ করেছি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কাজের প্রকল্প পরিচালক আকতার সাহেব আর ট্রাভেলারার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।’

শাবাব রায়হান এরপর অভিযোগ করে বলেন, ‘চ্যান্সারী কমপ্লেক্সের কাজ খুবই বাজে হয়েছে। সেই বিষয়ে আমরা রিপোর্ট দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই রিপোর্টও দিতে দেয়নি তারা। বলেছে রিপোর্ট দিলেও সেটা তারা গ্রহণ করবে না।’

ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছেন, ‘এটাও মনগড়া অভিযোগ। এর কোনো ভিত্তি নেই। পাকিস্তানি ঠিকাদারের কাছে টাকা চেয়ে দেশকে ছোট করতে কেন যাব আমি? যেখানে আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের ওপরে লেখালেখি করেছি, সেখানে এই কাজ আমি কীভাবে করি; আপনিই বলুন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শাবাব রায়হানের পদন্নোতির জন্য বিশেষ তদবির করছেন সরকার দলীয় প্রভাবশালী এক মন্ত্রী। যিনি আবার বিএনপিতে বেশ উঁচু দলীয় পদে আছেন।

/আরএ/