বহুমুখী সংকটে পোশাক খাত, চাকরি হারিয়ে বিপাকে শ্রমিক

বহুমুখী সংকটে পোশাক খাত, চাকরি হারিয়ে বিপাকে শ্রমিক
মরিয়ম সেঁজুতি

‘স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। গ্রামের বাড়িতে মা ও বোনও আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কীভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ সম্প্রতি হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন পোশাক শ্রমিক সাইফুল ইসলাম।
সাইফুল ইসলাম গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’নামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কারখানাটি গত মাসে বন্ধ হয়ে যায়। চাকরি হারিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছেন তিনি।
একই কারখানার শ্রমিক হালিমা খাতুনও চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন । তিনি বলেন, ‘হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় আমরা পথে বসে গেছি। মেয়েকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাইছি। এখন সংসার আর মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে পারবো কি না, সেটাই নিয়ে বড় চিন্তা।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা লড়াই করে টিকে আছে, আর কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাক খাত থেকে। অথচ এই খাতের রপ্তানিতে টানা ধস সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। কোরবানির ঈদের পর থেকেই পোশাক খাতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামে অবস্থিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা হেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৮৭টি তৈরি পোশাক খাতের বাইরের। বাকি ১৭০টি কারখানা পোশাক খাতের। এর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) অধীন ১০৮টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ৩৫টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আটটি এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীন ১৯টি পোশাক কারখানা রয়েছে। চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে উৎপাদন ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় ৭৯টি কারখানার ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
তিন বছরে ৪০০ কারখানা বন্ধ
গত ২৬ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানা আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘আর্থিক সংকটই বর্তমানে কারখানা বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার যে সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সংকটে থাকা কারখানাগুলো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না।’ তার মতে, যেসব কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, অথবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
ইইউর বাজারে রপ্তানিতে ধস
দেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। এই বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পোশাক রপ্তানি অনেক কমেছে। ইইউর বাজারে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ সবমিলিয়ে ৬০৯ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে ৭৫৪ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
সংকটের বহুমাত্রিক কারণ
পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক সমস্যার সমষ্টি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদের হার, শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং তীব্র প্রতিযোগিতা।
প্রথমত, কারখানাগুলোর প্রধান সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে সংস্কার ও অস্থিরতা চলছে, তার প্রভাব পড়েছে ঋণপ্রবাহে। চলতি মূলধনের অভাবে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা সময়মতো কাঁচামাল কিনতে পারছে না। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসার খরচ আরও বেড়েছে।
তৃতীয়ত, দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল যেমন সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিভিন্ন সময়ের শ্রমিক অসন্তোষ, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিরোধ এবং বহিরাগতদের উৎপাতের কারণে অনেক মালিক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছেন। কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাবে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দিতে ইতস্তত করছেন।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বড় ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্যের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব
কারখানা বন্ধ হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অসন্তোষও বাড়ছে ।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। কারখানা বন্ধের এই ধারা অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
উত্তরণের পথ
তৈরি পোশাক খাতকে বাঁচাতে হলে সরকারের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থায় জ্বালানি আমদানি করে হলেও পোশাক কারখানার উৎপাদন সচল রাখা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সংকটে পড়া ভালো মানের কারখানাগুলোর জন্য বিশেষ প্যাকেজ বা সহজ শর্তে চলতি মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সহজ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। কোনো পক্ষ যাতে উসকানি দিয়ে কারখানা বন্ধ করতে না পারে, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে যেকোনো অসন্তোষ শুরুতেই সমাধান করা যায়।
সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উচ্চ মূল্যের পোশাক (যেমন- টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, জ্যাকেট) উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। এতে কম ক্রয়াদেশেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
আমেরিকা ও ইউরোপের নির্ধারিত বাজারের বাইরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পোশাকের ব্র্যান্ডিং জোরদার করতে হবে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতে চলমান রক্তক্ষরণ দ্রুত বন্ধ করা না গেলে তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করবে। সময় এসেছে কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি সমস্যার বাস্তবমুখী ও দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করার। সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো আবার চালু হবে এবং শ্রমিকদের মুখে ফিরবে হাসি।

‘স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। গ্রামের বাড়িতে মা ও বোনও আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কীভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ সম্প্রতি হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন পোশাক শ্রমিক সাইফুল ইসলাম।
সাইফুল ইসলাম গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’নামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কারখানাটি গত মাসে বন্ধ হয়ে যায়। চাকরি হারিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছেন তিনি।
একই কারখানার শ্রমিক হালিমা খাতুনও চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন । তিনি বলেন, ‘হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় আমরা পথে বসে গেছি। মেয়েকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাইছি। এখন সংসার আর মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে পারবো কি না, সেটাই নিয়ে বড় চিন্তা।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা লড়াই করে টিকে আছে, আর কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাক খাত থেকে। অথচ এই খাতের রপ্তানিতে টানা ধস সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। কোরবানির ঈদের পর থেকেই পোশাক খাতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামে অবস্থিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা হেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৮৭টি তৈরি পোশাক খাতের বাইরের। বাকি ১৭০টি কারখানা পোশাক খাতের। এর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) অধীন ১০৮টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ৩৫টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আটটি এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীন ১৯টি পোশাক কারখানা রয়েছে। চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে উৎপাদন ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় ৭৯টি কারখানার ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
তিন বছরে ৪০০ কারখানা বন্ধ
গত ২৬ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানা আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘আর্থিক সংকটই বর্তমানে কারখানা বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার যে সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সংকটে থাকা কারখানাগুলো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না।’ তার মতে, যেসব কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, অথবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
ইইউর বাজারে রপ্তানিতে ধস
দেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। এই বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পোশাক রপ্তানি অনেক কমেছে। ইইউর বাজারে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ সবমিলিয়ে ৬০৯ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে ৭৫৪ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
সংকটের বহুমাত্রিক কারণ
পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক সমস্যার সমষ্টি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদের হার, শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং তীব্র প্রতিযোগিতা।
প্রথমত, কারখানাগুলোর প্রধান সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে সংস্কার ও অস্থিরতা চলছে, তার প্রভাব পড়েছে ঋণপ্রবাহে। চলতি মূলধনের অভাবে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা সময়মতো কাঁচামাল কিনতে পারছে না। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসার খরচ আরও বেড়েছে।
তৃতীয়ত, দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল যেমন সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিভিন্ন সময়ের শ্রমিক অসন্তোষ, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিরোধ এবং বহিরাগতদের উৎপাতের কারণে অনেক মালিক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছেন। কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাবে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দিতে ইতস্তত করছেন।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বড় ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্যের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব
কারখানা বন্ধ হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অসন্তোষও বাড়ছে ।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। কারখানা বন্ধের এই ধারা অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
উত্তরণের পথ
তৈরি পোশাক খাতকে বাঁচাতে হলে সরকারের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থায় জ্বালানি আমদানি করে হলেও পোশাক কারখানার উৎপাদন সচল রাখা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সংকটে পড়া ভালো মানের কারখানাগুলোর জন্য বিশেষ প্যাকেজ বা সহজ শর্তে চলতি মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সহজ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। কোনো পক্ষ যাতে উসকানি দিয়ে কারখানা বন্ধ করতে না পারে, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে যেকোনো অসন্তোষ শুরুতেই সমাধান করা যায়।
সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উচ্চ মূল্যের পোশাক (যেমন- টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, জ্যাকেট) উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। এতে কম ক্রয়াদেশেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
আমেরিকা ও ইউরোপের নির্ধারিত বাজারের বাইরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পোশাকের ব্র্যান্ডিং জোরদার করতে হবে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতে চলমান রক্তক্ষরণ দ্রুত বন্ধ করা না গেলে তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করবে। সময় এসেছে কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি সমস্যার বাস্তবমুখী ও দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করার। সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো আবার চালু হবে এবং শ্রমিকদের মুখে ফিরবে হাসি।

বহুমুখী সংকটে পোশাক খাত, চাকরি হারিয়ে বিপাকে শ্রমিক
মরিয়ম সেঁজুতি

‘স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। গ্রামের বাড়িতে মা ও বোনও আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কীভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’ সম্প্রতি হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন পোশাক শ্রমিক সাইফুল ইসলাম।
সাইফুল ইসলাম গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’নামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কারখানাটি গত মাসে বন্ধ হয়ে যায়। চাকরি হারিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছেন তিনি।
একই কারখানার শ্রমিক হালিমা খাতুনও চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন । তিনি বলেন, ‘হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় আমরা পথে বসে গেছি। মেয়েকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাইছি। এখন সংসার আর মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে পারবো কি না, সেটাই নিয়ে বড় চিন্তা।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা লড়াই করে টিকে আছে, আর কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাক খাত থেকে। অথচ এই খাতের রপ্তানিতে টানা ধস সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। কোরবানির ঈদের পর থেকেই পোশাক খাতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ৪৫৭টি কারখানার মধ্যে ৩৯৮টিই গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামে অবস্থিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা হেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৮৭টি তৈরি পোশাক খাতের বাইরের। বাকি ১৭০টি কারখানা পোশাক খাতের। এর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) অধীন ১০৮টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) ৩৫টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আটটি এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীন ১৯টি পোশাক কারখানা রয়েছে। চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে উৎপাদন ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় ৭৯টি কারখানার ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
তিন বছরে ৪০০ কারখানা বন্ধ
গত ২৬ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক কারখানা আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘আর্থিক সংকটই বর্তমানে কারখানা বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার যে সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সংকটে থাকা কারখানাগুলো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না।’ তার মতে, যেসব কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, অথবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
ইইউর বাজারে রপ্তানিতে ধস
দেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ)। এই বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পোশাক রপ্তানি অনেক কমেছে। ইইউর বাজারে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ সবমিলিয়ে ৬০৯ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে ৭৫৪ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
সংকটের বহুমাত্রিক কারণ
পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং এটি কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি ও তাৎক্ষণিক সমস্যার সমষ্টি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদের হার, শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ হ্রাস এবং তীব্র প্রতিযোগিতা।
প্রথমত, কারখানাগুলোর প্রধান সমস্যা গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে সংস্কার ও অস্থিরতা চলছে, তার প্রভাব পড়েছে ঋণপ্রবাহে। চলতি মূলধনের অভাবে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা সময়মতো কাঁচামাল কিনতে পারছে না। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসার খরচ আরও বেড়েছে।
তৃতীয়ত, দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল যেমন সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বিভিন্ন সময়ের শ্রমিক অসন্তোষ, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিরোধ এবং বহিরাগতদের উৎপাতের কারণে অনেক মালিক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছেন। কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তার অভাবে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দিতে ইতস্তত করছেন।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বড় ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্যের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব
কারখানা বন্ধ হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অসন্তোষও বাড়ছে ।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে পোশাক খাত থেকে। কারখানা বন্ধের এই ধারা অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আয়ে বড় ধস নামবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
উত্তরণের পথ
তৈরি পোশাক খাতকে বাঁচাতে হলে সরকারের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থায় জ্বালানি আমদানি করে হলেও পোশাক কারখানার উৎপাদন সচল রাখা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সংকটে পড়া ভালো মানের কারখানাগুলোর জন্য বিশেষ প্যাকেজ বা সহজ শর্তে চলতি মূলধনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সহজ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। কোনো পক্ষ যাতে উসকানি দিয়ে কারখানা বন্ধ করতে না পারে, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে যেকোনো অসন্তোষ শুরুতেই সমাধান করা যায়।
সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজারের মতো মৌলিক পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্যময় এবং উচ্চ মূল্যের পোশাক (যেমন- টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, জ্যাকেট) উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। এতে কম ক্রয়াদেশেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
আমেরিকা ও ইউরোপের নির্ধারিত বাজারের বাইরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মতো উদীয়মান বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পোশাকের ব্র্যান্ডিং জোরদার করতে হবে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাতে চলমান রক্তক্ষরণ দ্রুত বন্ধ করা না গেলে তা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করবে। সময় এসেছে কেবল আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি সমস্যার বাস্তবমুখী ও দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করার। সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো আবার চালু হবে এবং শ্রমিকদের মুখে ফিরবে হাসি।




