উচ্চ মূল্যে এলএনজি আমদানির ফাঁদে বাংলাদেশ

উচ্চ মূল্যে এলএনজি আমদানির ফাঁদে বাংলাদেশ
মরিয়ম সেঁজুতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে একসঙ্গে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি দামে এই গ্যাস কেনা হচ্ছে।
স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার এই সিদ্ধান্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আগামী ৫ মাসের জন্য এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আগাম কেনার তোড়জোড় নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
চড়া মূল্যের আমদানি ও দরকষাকষির চিত্র
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আগামী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসের চাহিদা মেটাতে মোট ৩০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর জন্য ‘সরকার টু সরকার’ (জি-টু-জি) নীতিমালার আওতায় ১৮টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানি অনলাইনে দরপত্র জমা দিয়েছে।
দরপত্রে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলো প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১৭ ডলার থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত প্রস্তাব করেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এখন দরকষাকষি করা হবে এবং দাম চূড়ান্ত করে প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে।
টাকার অঙ্কে ব্যয়ের বিশাল খতিয়ান
গত বছর এলএনজি আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর চড়া মূল্যের কারণে এই সামগ্রিক আমদানি ব্যয় একলাফে ৬৫ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু এলএনজি খাতেই সরকারের অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট
দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে ১০৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। জাতীয় গ্রিড সচল রাখতে পেট্রোবাংলাকে প্রতি মাসে ১০টির বেশি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে প্রতি মাসে ৪টি থেকে ৫টি কার্গো পাওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সর্বশেষ কাতার এনার্জির কাছ থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি মাত্র ১৩ দশমিক ৭২ ডলারে কেনা হয়েছিল।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতার, ওমান এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি 'ফোর্স শাটডাউন' (অনিবার্য পরিস্থিতি জনিত বন্ধ) ঘোষণা করে। এদের মধ্যে কাতার এনার্জি আংশিক সরবরাহ ধরে রাখলেও বাকিরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু কাতার এনার্জি সম্প্রতি জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী ৫ বছর তারা চুক্তির চেয়ে ৫০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ করবে। এই সরবরাহ সংকটের কারণেই মূলত বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেটের চড়া দামের এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চাহিদা মেটাতে আগামী পাঁচ মাসে ৫০টির বেশি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫টি কার্গো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, একসঙ্গে বেশি পরিমাণ এলএনজি কিনলে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেতে পারে—এমন ধারণা থেকেই জি-টু-জি নীতিমালার আওতায় বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়। এতে ভিটল, টোটাল এনার্জি, হানবোর, গানভোর, এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, এডনক ট্রেডিং, আইআরএইচ গ্লোবাল ট্রেডিংসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে ১৮টি কোম্পানির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান পাঁচ মাসের জন্য এলএনজি সরবরাহে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সরকারের একটি বড় অংশ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা স্পট মার্কেট থেকে একসঙ্গে ৫ মাসের গ্যাস আগাম কেনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো সমঝোতা হলে বা যুদ্ধ থেমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ১৫ থেকে ১৬ ডলারে নেমে আসতে পারে, যা গত মাসেও ঘটেছিল। এখন এলএনজি কেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশকে ১৯ ডলার করেই কিনতে হবে, যা চরম দূরদর্শিতার অভাব।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বেশি দাম দিয়ে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সরকারের এখন ভর্তুকি দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই। এই ২০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে সারের দাম বাড়বে এবং কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, দেশ এখন একটি ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সার্কেলের মধ্যে পড়ে গেছে। আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে ভারসাম্য নেই। ফলে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি শোধ করতে করতেই দেশ দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকটের সমাধান ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপিয়ে সম্ভব নয়। কারণ, এতে রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে এবং বাজেট ঘাটতি বাড়বে। এ ছাড়া সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দেবে। সবশেষে সরকার টাকা ছাপিয়ে সংকট মেটানোর চেষ্টা করলে টাকার মান আরও কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসেবে তিনি সরকারের কাছে অতিমূল্যের এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জোর দাবি জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে একসঙ্গে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি দামে এই গ্যাস কেনা হচ্ছে।
স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার এই সিদ্ধান্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আগামী ৫ মাসের জন্য এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আগাম কেনার তোড়জোড় নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
চড়া মূল্যের আমদানি ও দরকষাকষির চিত্র
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আগামী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসের চাহিদা মেটাতে মোট ৩০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর জন্য ‘সরকার টু সরকার’ (জি-টু-জি) নীতিমালার আওতায় ১৮টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানি অনলাইনে দরপত্র জমা দিয়েছে।
দরপত্রে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলো প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১৭ ডলার থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত প্রস্তাব করেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এখন দরকষাকষি করা হবে এবং দাম চূড়ান্ত করে প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে।
টাকার অঙ্কে ব্যয়ের বিশাল খতিয়ান
গত বছর এলএনজি আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর চড়া মূল্যের কারণে এই সামগ্রিক আমদানি ব্যয় একলাফে ৬৫ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু এলএনজি খাতেই সরকারের অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট
দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে ১০৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। জাতীয় গ্রিড সচল রাখতে পেট্রোবাংলাকে প্রতি মাসে ১০টির বেশি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে প্রতি মাসে ৪টি থেকে ৫টি কার্গো পাওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সর্বশেষ কাতার এনার্জির কাছ থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি মাত্র ১৩ দশমিক ৭২ ডলারে কেনা হয়েছিল।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতার, ওমান এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি 'ফোর্স শাটডাউন' (অনিবার্য পরিস্থিতি জনিত বন্ধ) ঘোষণা করে। এদের মধ্যে কাতার এনার্জি আংশিক সরবরাহ ধরে রাখলেও বাকিরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু কাতার এনার্জি সম্প্রতি জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী ৫ বছর তারা চুক্তির চেয়ে ৫০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ করবে। এই সরবরাহ সংকটের কারণেই মূলত বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেটের চড়া দামের এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চাহিদা মেটাতে আগামী পাঁচ মাসে ৫০টির বেশি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫টি কার্গো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, একসঙ্গে বেশি পরিমাণ এলএনজি কিনলে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেতে পারে—এমন ধারণা থেকেই জি-টু-জি নীতিমালার আওতায় বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়। এতে ভিটল, টোটাল এনার্জি, হানবোর, গানভোর, এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, এডনক ট্রেডিং, আইআরএইচ গ্লোবাল ট্রেডিংসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে ১৮টি কোম্পানির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান পাঁচ মাসের জন্য এলএনজি সরবরাহে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সরকারের একটি বড় অংশ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা স্পট মার্কেট থেকে একসঙ্গে ৫ মাসের গ্যাস আগাম কেনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো সমঝোতা হলে বা যুদ্ধ থেমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ১৫ থেকে ১৬ ডলারে নেমে আসতে পারে, যা গত মাসেও ঘটেছিল। এখন এলএনজি কেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশকে ১৯ ডলার করেই কিনতে হবে, যা চরম দূরদর্শিতার অভাব।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বেশি দাম দিয়ে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সরকারের এখন ভর্তুকি দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই। এই ২০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে সারের দাম বাড়বে এবং কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, দেশ এখন একটি ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সার্কেলের মধ্যে পড়ে গেছে। আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে ভারসাম্য নেই। ফলে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি শোধ করতে করতেই দেশ দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকটের সমাধান ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপিয়ে সম্ভব নয়। কারণ, এতে রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে এবং বাজেট ঘাটতি বাড়বে। এ ছাড়া সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দেবে। সবশেষে সরকার টাকা ছাপিয়ে সংকট মেটানোর চেষ্টা করলে টাকার মান আরও কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসেবে তিনি সরকারের কাছে অতিমূল্যের এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জোর দাবি জানিয়েছেন।

উচ্চ মূল্যে এলএনজি আমদানির ফাঁদে বাংলাদেশ
মরিয়ম সেঁজুতি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে একসঙ্গে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি দামে এই গ্যাস কেনা হচ্ছে।
স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনার এই সিদ্ধান্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আগামী ৫ মাসের জন্য এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আগাম কেনার তোড়জোড় নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
চড়া মূল্যের আমদানি ও দরকষাকষির চিত্র
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আগামী আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসের চাহিদা মেটাতে মোট ৩০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর জন্য ‘সরকার টু সরকার’ (জি-টু-জি) নীতিমালার আওতায় ১৮টি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানি অনলাইনে দরপত্র জমা দিয়েছে।
দরপত্রে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলো প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১৭ ডলার থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত প্রস্তাব করেছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এখন দরকষাকষি করা হবে এবং দাম চূড়ান্ত করে প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে।
টাকার অঙ্কে ব্যয়ের বিশাল খতিয়ান
গত বছর এলএনজি আমদানিতে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর চড়া মূল্যের কারণে এই সামগ্রিক আমদানি ব্যয় একলাফে ৬৫ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু এলএনজি খাতেই সরকারের অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট
দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার মধ্যে ১০৫ কোটি ঘনফুটেরও বেশি আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। জাতীয় গ্রিড সচল রাখতে পেট্রোবাংলাকে প্রতি মাসে ১০টির বেশি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে প্রতি মাসে ৪টি থেকে ৫টি কার্গো পাওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সর্বশেষ কাতার এনার্জির কাছ থেকে প্রতি ইউনিট এলএনজি মাত্র ১৩ দশমিক ৭২ ডলারে কেনা হয়েছিল।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাতার, ওমান এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি 'ফোর্স শাটডাউন' (অনিবার্য পরিস্থিতি জনিত বন্ধ) ঘোষণা করে। এদের মধ্যে কাতার এনার্জি আংশিক সরবরাহ ধরে রাখলেও বাকিরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু কাতার এনার্জি সম্প্রতি জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী ৫ বছর তারা চুক্তির চেয়ে ৫০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ করবে। এই সরবরাহ সংকটের কারণেই মূলত বাংলাদেশকে এখন স্পট মার্কেটের চড়া দামের এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চাহিদা মেটাতে আগামী পাঁচ মাসে ৫০টির বেশি এলএনজি কার্গো প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫টি কার্গো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, একসঙ্গে বেশি পরিমাণ এলএনজি কিনলে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেতে পারে—এমন ধারণা থেকেই জি-টু-জি নীতিমালার আওতায় বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়। এতে ভিটল, টোটাল এনার্জি, হানবোর, গানভোর, এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি, এডনক ট্রেডিং, আইআরএইচ গ্লোবাল ট্রেডিংসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে ১৮টি কোম্পানির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান পাঁচ মাসের জন্য এলএনজি সরবরাহে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সরকারের একটি বড় অংশ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা স্পট মার্কেট থেকে একসঙ্গে ৫ মাসের গ্যাস আগাম কেনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো সমঝোতা হলে বা যুদ্ধ থেমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ১৫ থেকে ১৬ ডলারে নেমে আসতে পারে, যা গত মাসেও ঘটেছিল। এখন এলএনজি কেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশকে ১৯ ডলার করেই কিনতে হবে, যা চরম দূরদর্শিতার অভাব।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বেশি দাম দিয়ে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সরকারের এখন ভর্তুকি দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই। এই ২০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয়ের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে সারের দাম বাড়বে এবং কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, দেশ এখন একটি ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সার্কেলের মধ্যে পড়ে গেছে। আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে ভারসাম্য নেই। ফলে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি শোধ করতে করতেই দেশ দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকটের সমাধান ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির দায় চাপিয়ে সম্ভব নয়। কারণ, এতে রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে এবং বাজেট ঘাটতি বাড়বে। এ ছাড়া সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমিয়ে দেবে। সবশেষে সরকার টাকা ছাপিয়ে সংকট মেটানোর চেষ্টা করলে টাকার মান আরও কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসেবে তিনি সরকারের কাছে অতিমূল্যের এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জোর দাবি জানিয়েছেন।









