শিরোনাম

ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
গ্রাফিক্স: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে। তবে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।

ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইইউর বাজারে একই সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাকের দাম এবং রপ্তানির পরিমাণ কমে গেছে। যেখানে প্রতিযোগী দেশগুলো কোনো না কোনো কৌশলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে সেখানে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নেতিবাচক প্রবণতাকে পোশাক খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।

মন্দার কবলে ইউরোপের পোশাক বাজার

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ইইউর পোশাক আমদানি সামগ্রিকভাবে কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে ইইউর বাজারে পোশাক আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমেছে। আমদানির পরিমাণ ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে।

পরিসংখ্যান বলছে, এই পতনের পেছনে ক্রেতাদের চাহিদা হ্রাস এবং পণ্যের কম মূল্য- এই দুটি বিষয় সমানভাবে দায়ী। এই সময়ে ইউরোপে পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ। একই সঙ্গে গড়ে পোশাকের ইউনিট প্রতি দাম কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশের দ্বিমুখী সংকট

বিশ্ববাজারের এই মন্দার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ইউরো।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈশ্বিক গড় পতনের তুলনায় বাংলাদেশের পতন প্রায় দ্বিগুণ। এই পাঁচ মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের ইউনিট প্রতি গড় দরও কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ (কেজি প্রতি ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো)।

একক মাস হিসেবে মে মাসের পরিস্থিতি ছিল আরও নাজুক। এই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমার পাশাপাশি পণ্যের গড় দাম কমেছে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এপ্রিলের পর মে মাসেও এই ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করে, এটি কোনো সাময়িক ধাক্কা নয়, বরং আমাদের পোশাক খাতের এক গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা।

প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল

বাংলাদেশের যখন পোশাকের দাম ও পরিমাণ কমে যাচ্ছে তখন চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, কম্বোডিয়া, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশ ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে বাজার ধরে রেখেছে।

চীনের রপ্তানির চিত্র ও কৌশল

চীনের পোশাক রপ্তানি মূল্য ৪ দশমিক ২০ শতাংশ কমলেও (৯ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ইউরো), তারা একমাত্র দেশ যারা রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। পণ্যের দাম ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে তারা বাজারে নিজেদের পণ্যের দখল ধরে রেখেছে।

ভিয়েতনামের কৌশল

ভিয়েতনামের রপ্তানি কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ (১ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ইউরো)। রপ্তানি কমলেও দেশটি পণ্যের গড় দাম ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়ে (কেজি প্রতি ২৯ দশমিক ৪৪ ইউরো) নিজেদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে।

তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার কৌশল

এই দুই দেশের রপ্তানির পরিমাণ যথাক্রমে ১৭ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে। তবে তাদের পণ্যের গড় দাম যথাক্রমে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কৌশল

ভারতের পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে, যা বাংলাদেশের মতো দ্বিমুখী সংকটের একটি মৃদু রূপ। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ২৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ কমলেও তাদের পণ্যের দর ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয়

পোশাক খাতের বিশ্লেষক বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল রপ্তানির এই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের দাম ও পরিমাণ উভয়ই অনেক কমে গেছে। যেখানে ভিয়েতনাম দাম এবং চীন পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে বাজার ধরে রাখছে, সেখানে বাংলাদেশের এই দ্বিমুখী পতন পোশাক খাতের সামগ্রিক সক্ষমতার ঘাটতিকে নির্দেশ করছে।

পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের বা উন্নতমানের পোশাক তৈরিতে পিছিয়ে থাকার কারণেই বাংলাদেশ আজ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হলে এখনই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। এসব উদ্যোগ দ্রুত না নিতে পারলে আগামী দিনগুলোতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

/বিবি/