বেদনা, আতঙ্ক আর বিচারহীনতায় কেটে গেল একটি বছর

বেদনা, আতঙ্ক আর বিচারহীনতায় কেটে গেল একটি বছর
নিজস্ব প্রতিবেদক

দুই জোড়া খোলা চোখ কি আপনাকে ঘুমের মধ্যে ডাকে? আপনি হয়তো ঘুমের মধ্যে কোনো খোলা চোখের ডাক দেখতে পান না। কিন্তু একই সঙ্গে দুই সন্তানকে হারানো এক মা নিশ্চয়ই রাতের আঁধারেও স্পষ্ট দেখতে পান দুই জোড়া খোলা চোখ তাকে করুণ আর্তি নিয়ে ডাকছে! সেই মায়ের মনে তখন কতটা ঝড় ওঠে, তার দুই চোখে কতটা বন্যা নামে; তা ওই মা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউই হয়তো কল্পনা করতে পারবে না।
এক বছর আগে এই দিনে রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান। সেই বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ঝরে পড়ে ৩৫টি তাজা প্রাণ। আহত হয় প্রায় ২০০ জন। গত বছরের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মারা যআওয়া ৩৬ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ২৮ জন, শিক্ষক ৩ জন, অভিভাবক ৩ জন, আয়া ১ জন।
মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিহতদের স্মরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে শোক আর শ্রদ্ধা জানানোর পর বিশেষ দোয়াও করা হয় ইহজগতের মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে।
সকালে কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে তৈরি করা হয় অস্থায়ী বেদি। সেই স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে স্মরণ করা হয় নিহতদের। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের সঙ্গে আমাদের নিহত শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করছি।’
বেদির দুই পাশে দুটি ব্যানারে টাঙানো ছিল নিহতদের ছবি। সেখানে নিহতদের সহপাঠীসহ শিক্ষক-অভিভাবকরা বিভিন্ন বার্তা লিখে নিজেদের শোক আর শ্রদ্ধা জানান। এদিন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
একটি বছর কেটে গেলেও এখনো সেই ঘটনার মানসিক ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। খুব কাছ থেকে পুরো দুর্ঘটনা দেখেছেন প্রতিষ্ঠানটির ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামা মোল্লা। একটি ঘটনার বিবরণ তিনি দিয়েছেন এভাবে, ‘ভবনের ফটকের কাছে এসে কয়েকটি শিশুর মরদেহ দেখতে পাই। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে দেখি শিক্ষক মাহরীন চৌধুরী কয়েকটি শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছেন। তখন মাহরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল।’
জল ছলছল চোখে মনিরুজ্জামান বলে চলেন, ‘ম্যাডাম তখন কথা বলতেও পারছিলেন না। পাশে থাকা এক আয়ার নীল ওড়না দিয়ে তাঁর শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে আমার হাত পুড়ে যায়। ঠিক তখনই পাশে পড়ে থাকা বিমানের লেজের অংশেও বিস্ফোরণ ঘটে। আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই বিস্ফোরণ থেকে প্রাণে বেঁচে যাই।’
বিভীষিকাময় সেই ২১ জুলাইয়ের কথা মনে করে আজও যেন শিউরে ওঠেন স্কুলটির শিক্ষক ফারজানা কাবেরী, ‘আমি শুধু কালিমা পড়ছিলাম। বাচ্চারা বলছিল, মিস, কিছু করেন, আমাদের বাঁচান। কিন্তু চারদিকে আগুনে ঘেরা ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম যেকোনো একদিকে দৌড়াতে। কিন্তু যেদিকেই তাকিয়েছি, আগুনের দেয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না।’
অনেক অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর কথা, তারা এখনো সেই ট্রমার মধ্যে আছেন। এখনো বিমানের শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠেন, রাতে ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। মাঝে মাঝে খুব অস্থির লাগে। কোনো কোনো শিশু নাকি সেই ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত আগুন আগুন বলে রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠত।
ভয়ানক সেই দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়নত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কমত। কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা।
কিন্তু বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২১শে জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এর পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তদন্ত কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানটির পাইলটের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিং এর যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন যেটাই বলুক, বিষয়টি নিয়ে পরে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই জানা গেছে ডয়েচে ভেলে বাংলার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তির আগে নিহত ও আহত একাধিক শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তারা সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান৷ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন চান৷ তারা চান, আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিক৷ তবে তারা ক্ষোভ–আক্ষেপ নিয়ে বললেন, এক বছরে এসবের কোনো নজির দেখতে পাননি৷’
সব মিলিয়ে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে এটা বলাই যায় যে বেদনা, আতঙ্ক আর বিচারহীনতায় কেটে গেল একটি বছর!

দুই জোড়া খোলা চোখ কি আপনাকে ঘুমের মধ্যে ডাকে? আপনি হয়তো ঘুমের মধ্যে কোনো খোলা চোখের ডাক দেখতে পান না। কিন্তু একই সঙ্গে দুই সন্তানকে হারানো এক মা নিশ্চয়ই রাতের আঁধারেও স্পষ্ট দেখতে পান দুই জোড়া খোলা চোখ তাকে করুণ আর্তি নিয়ে ডাকছে! সেই মায়ের মনে তখন কতটা ঝড় ওঠে, তার দুই চোখে কতটা বন্যা নামে; তা ওই মা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউই হয়তো কল্পনা করতে পারবে না।
এক বছর আগে এই দিনে রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান। সেই বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ঝরে পড়ে ৩৫টি তাজা প্রাণ। আহত হয় প্রায় ২০০ জন। গত বছরের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মারা যআওয়া ৩৬ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ২৮ জন, শিক্ষক ৩ জন, অভিভাবক ৩ জন, আয়া ১ জন।
মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিহতদের স্মরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে শোক আর শ্রদ্ধা জানানোর পর বিশেষ দোয়াও করা হয় ইহজগতের মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে।
সকালে কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে তৈরি করা হয় অস্থায়ী বেদি। সেই স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে স্মরণ করা হয় নিহতদের। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের সঙ্গে আমাদের নিহত শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করছি।’
বেদির দুই পাশে দুটি ব্যানারে টাঙানো ছিল নিহতদের ছবি। সেখানে নিহতদের সহপাঠীসহ শিক্ষক-অভিভাবকরা বিভিন্ন বার্তা লিখে নিজেদের শোক আর শ্রদ্ধা জানান। এদিন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
একটি বছর কেটে গেলেও এখনো সেই ঘটনার মানসিক ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। খুব কাছ থেকে পুরো দুর্ঘটনা দেখেছেন প্রতিষ্ঠানটির ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামা মোল্লা। একটি ঘটনার বিবরণ তিনি দিয়েছেন এভাবে, ‘ভবনের ফটকের কাছে এসে কয়েকটি শিশুর মরদেহ দেখতে পাই। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে দেখি শিক্ষক মাহরীন চৌধুরী কয়েকটি শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছেন। তখন মাহরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল।’
জল ছলছল চোখে মনিরুজ্জামান বলে চলেন, ‘ম্যাডাম তখন কথা বলতেও পারছিলেন না। পাশে থাকা এক আয়ার নীল ওড়না দিয়ে তাঁর শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে আমার হাত পুড়ে যায়। ঠিক তখনই পাশে পড়ে থাকা বিমানের লেজের অংশেও বিস্ফোরণ ঘটে। আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই বিস্ফোরণ থেকে প্রাণে বেঁচে যাই।’
বিভীষিকাময় সেই ২১ জুলাইয়ের কথা মনে করে আজও যেন শিউরে ওঠেন স্কুলটির শিক্ষক ফারজানা কাবেরী, ‘আমি শুধু কালিমা পড়ছিলাম। বাচ্চারা বলছিল, মিস, কিছু করেন, আমাদের বাঁচান। কিন্তু চারদিকে আগুনে ঘেরা ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম যেকোনো একদিকে দৌড়াতে। কিন্তু যেদিকেই তাকিয়েছি, আগুনের দেয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না।’
অনেক অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর কথা, তারা এখনো সেই ট্রমার মধ্যে আছেন। এখনো বিমানের শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠেন, রাতে ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। মাঝে মাঝে খুব অস্থির লাগে। কোনো কোনো শিশু নাকি সেই ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত আগুন আগুন বলে রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠত।
ভয়ানক সেই দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়নত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কমত। কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা।
কিন্তু বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২১শে জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এর পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তদন্ত কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানটির পাইলটের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিং এর যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন যেটাই বলুক, বিষয়টি নিয়ে পরে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই জানা গেছে ডয়েচে ভেলে বাংলার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তির আগে নিহত ও আহত একাধিক শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তারা সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান৷ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন চান৷ তারা চান, আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিক৷ তবে তারা ক্ষোভ–আক্ষেপ নিয়ে বললেন, এক বছরে এসবের কোনো নজির দেখতে পাননি৷’
সব মিলিয়ে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে এটা বলাই যায় যে বেদনা, আতঙ্ক আর বিচারহীনতায় কেটে গেল একটি বছর!

বেদনা, আতঙ্ক আর বিচারহীনতায় কেটে গেল একটি বছর
নিজস্ব প্রতিবেদক

দুই জোড়া খোলা চোখ কি আপনাকে ঘুমের মধ্যে ডাকে? আপনি হয়তো ঘুমের মধ্যে কোনো খোলা চোখের ডাক দেখতে পান না। কিন্তু একই সঙ্গে দুই সন্তানকে হারানো এক মা নিশ্চয়ই রাতের আঁধারেও স্পষ্ট দেখতে পান দুই জোড়া খোলা চোখ তাকে করুণ আর্তি নিয়ে ডাকছে! সেই মায়ের মনে তখন কতটা ঝড় ওঠে, তার দুই চোখে কতটা বন্যা নামে; তা ওই মা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউই হয়তো কল্পনা করতে পারবে না।
এক বছর আগে এই দিনে রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান। সেই বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ঝরে পড়ে ৩৫টি তাজা প্রাণ। আহত হয় প্রায় ২০০ জন। গত বছরের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মারা যআওয়া ৩৬ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ২৮ জন, শিক্ষক ৩ জন, অভিভাবক ৩ জন, আয়া ১ জন।
মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিহতদের স্মরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে শোক আর শ্রদ্ধা জানানোর পর বিশেষ দোয়াও করা হয় ইহজগতের মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া মানুষগুলোকে।
সকালে কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে তৈরি করা হয় অস্থায়ী বেদি। সেই স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে স্মরণ করা হয় নিহতদের। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের সঙ্গে আমাদের নিহত শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করছি।’
বেদির দুই পাশে দুটি ব্যানারে টাঙানো ছিল নিহতদের ছবি। সেখানে নিহতদের সহপাঠীসহ শিক্ষক-অভিভাবকরা বিভিন্ন বার্তা লিখে নিজেদের শোক আর শ্রদ্ধা জানান। এদিন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
একটি বছর কেটে গেলেও এখনো সেই ঘটনার মানসিক ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। খুব কাছ থেকে পুরো দুর্ঘটনা দেখেছেন প্রতিষ্ঠানটির ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামা মোল্লা। একটি ঘটনার বিবরণ তিনি দিয়েছেন এভাবে, ‘ভবনের ফটকের কাছে এসে কয়েকটি শিশুর মরদেহ দেখতে পাই। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে দেখি শিক্ষক মাহরীন চৌধুরী কয়েকটি শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছেন। তখন মাহরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল।’
জল ছলছল চোখে মনিরুজ্জামান বলে চলেন, ‘ম্যাডাম তখন কথা বলতেও পারছিলেন না। পাশে থাকা এক আয়ার নীল ওড়না দিয়ে তাঁর শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে আমার হাত পুড়ে যায়। ঠিক তখনই পাশে পড়ে থাকা বিমানের লেজের অংশেও বিস্ফোরণ ঘটে। আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই বিস্ফোরণ থেকে প্রাণে বেঁচে যাই।’
বিভীষিকাময় সেই ২১ জুলাইয়ের কথা মনে করে আজও যেন শিউরে ওঠেন স্কুলটির শিক্ষক ফারজানা কাবেরী, ‘আমি শুধু কালিমা পড়ছিলাম। বাচ্চারা বলছিল, মিস, কিছু করেন, আমাদের বাঁচান। কিন্তু চারদিকে আগুনে ঘেরা ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম যেকোনো একদিকে দৌড়াতে। কিন্তু যেদিকেই তাকিয়েছি, আগুনের দেয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না।’
অনেক অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর কথা, তারা এখনো সেই ট্রমার মধ্যে আছেন। এখনো বিমানের শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠেন, রাতে ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। মাঝে মাঝে খুব অস্থির লাগে। কোনো কোনো শিশু নাকি সেই ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত আগুন আগুন বলে রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠত।
ভয়ানক সেই দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়নত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কমত। কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা।
কিন্তু বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২১শে জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এর পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ছিল বলে তদন্ত কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানটির পাইলটের গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিং এর যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন যেটাই বলুক, বিষয়টি নিয়ে পরে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই জানা গেছে ডয়েচে ভেলে বাংলার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তির আগে নিহত ও আহত একাধিক শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তারা সবাই এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান৷ আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন চান৷ তারা চান, আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাষ্ট্র তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিক৷ তবে তারা ক্ষোভ–আক্ষেপ নিয়ে বললেন, এক বছরে এসবের কোনো নজির দেখতে পাননি৷’
সব মিলিয়ে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে এটা বলাই যায় যে বেদনা, আতঙ্ক আর বিচারহীনতায় কেটে গেল একটি বছর!

মাইলস্টোন ট্রাজেডিতে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ
বিক্ষোভে উত্তাল মাইলস্টোন কলেজ
মাইলস্টোন ট্রাজেডিতে বার্সেলোনার শোক







