ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙা অর্থনীতি

ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙা অর্থনীতি
মরিয়ম সেঁজুতি

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি কিছুটা চাঙা হয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের প্রান্তিক বাজার- সবখানেই উৎসবের আমেজ। একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ঈদ বোনাস; এই দুইয়ের প্রভাবে দেশের বাজারে অর্থের প্রবাহ গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতেও লেনদেনের গতি অনেক বেড়েছে।
একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই নগদ লেনদেনের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করছে।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাস, রেমিট্যান্স, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দান এবং ব্যবসায়ীসহ ধনী ব্যক্তিদের জাকাত বিতরণকে কেন্দ্র করে ঈদে অর্থনীতির গতি বাড়ছে। তাঁদের ভাষায়, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি না থাকলে এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনীতিতে আবার গতি ফিরে আসবে।
- ঈদ উপলক্ষে আড়াই লাখ কোটি টাকা লেনদেনের সম্ভাবনা
- ঈদের দুই দিন আগেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিক্রি
- ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি
- মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হবে ২৮ হাজার কোটি টাকার
যদিও ঈদুল ফিতরের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে কোনো গবেষণা নেই। তবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- এ বছর রোজা ও ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অতিরিক্ত ২ লাখ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, দেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এতে জনমনে স্বস্তি এসেছে। স্বভাবতই গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদের কেনাকাটা ভালো হবে। এ ছাড়া ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকেই দেশের বাইরে কেনাকাটা করতে পারেননি। এসব মানুষ এখন দেশেই কেনাকাটা করবেন। আবার বিদেশের পণ্যও দেশে কম এসেছে। ফলে দেশিয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এতে কেনাকাটা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হবে।
আমরা এবার ৩ লাখ কোটি টাকার বানিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। সেটা হয়তো ২ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় আটকে যাবে। এবার নিত্যপণ্যের দামেও বেশ স্বস্তি ছিল।
হেলাল উদ্দিন সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি
হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এবার ৩ লাখ কোটি টাকার বানিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। সেটা হয়তো ২ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় আটকে যাবে। এবার নিত্যপণ্যের দামেও বেশ স্বস্তি ছিল। লেবুর দামে কিছুটা অস্থিরতা ছিল। তবে তা সাময়িক সময়ের জন্য।'
নিত্যপণ্য ও মসলার বাজার
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, এবার ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার নিত্যপণ্য ও মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকেই বিক্রি বাড়তে থাকে, তবে ঈদের আগের সপ্তাহে বেশি বিক্রি হয়। শুধু ২৮ হাজার কোটি টাকার মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হবে।
পর্যটন খাত
পাশাপাশি ঈদের ছুটিতে দেশি-বিদেশি পর্যটনেও ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। ঈদের ছুটিতে দেশের অনেক পর্যটন এলাকার রিসোর্ট ও হোটের-মোটেল অগ্রিম বুকিং হয়ে যায়।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি
এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রবাসী আয়েও তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে যারা ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে আসছেন বা যারা প্রবাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে আটকে আছেন, তাদের বিষয়টি সরকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি হিসাবে ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া হয় প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য এই দান বাধ্যতামূলক। সাধারণত ঈদ উদযাপনে মানুষ যখন শহর থেকে গ্রামে আসেন, তখন তারা তুলনামূলক দরিদ্রদের ফিতরা দেন। ফলে গ্রামীণ জনপদেও ঈদের আমেজ বাড়ে এবং অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। দোকান মালিক সমিতির হিসাব বলছে, রোজার ঈদে গড়ে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের প্রথম ঈদ। তাই তাই এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা থাকবে।
পোশাক বাজারের চিত্র

ঈদ পোশাক বিক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক খাতে ব্যবসা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঈদ যতই এগিয়ে আসে, কেনাকাটা ততই বাড়ে। ঢাকায় ঈদের কেনাকাটার জন্য বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটসহ অভিজাত শপিংমলগুলোয় মানুষের ঢল নামে।
সূত্র জানায়, ঈদের দুই দিন আগেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৫ সালে ঈদের কেনাবেচা হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় এ বছর ঈদে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির সর্বশেষ সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
উৎসবের অর্থনীতি

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সাধারণত যে সব পণ্য বেশি বেচাকেনা হয় সেগুলোর মধ্যে পোশাক, জুতা, ব্যাগ, প্রসাধন সামগ্রী গৃহস্থালী পণ্য, ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার, মুঠোফোনসহ নানা ধরণের ইলেকট্রনিক্স পণ্য।
ঈ; উৎসব ঘিরে এমন শত শত পণ্যের চাহিদা বাড়ে। তাতে স্থানীয় উৎপাদন, পণ্য আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রি ইত্যাদি খাতে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচলও অনেক বেড়ে যায়। একদল নাড়ির টানে ফেরে ঘরে। আরেক দল আবার ঘুরতে যান বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়। এতে ব্যবহার বাড়ে বিমান, বাস, ট্রেন, লঞ্চ, মাইক্রোবাস, রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকসহ নানা বাহনের। সব মিলিয়ে উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, আমদানি করা পণ্য ও সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়।
উৎসবের মহাকর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতির অংশকে উৎসবের অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঈদের অর্থনীতির প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ঈদে সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস পান, যা সরাসরি ভোক্তা ব্যয়ে চলে যায়। পোশাক শ্রমিকরাও বোনাসের টাকা খরচ করেন নতুন পোশাক, উপহার বা যাত্রা খাতে। ফলে পুরো বাজারই চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
অনলাইনে কেনাকাটা
থ্রি-পিস থেকে শুরু করে লিপস্টিক, পাঞ্জাবি-শাড়ি, নারীর গয়না, প্রসাধনী, হস্তশিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। দেশে কয়েক বছর ধরেই অনলাইন কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয় হলেও ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা জমজমাট হয়ে উঠছে। ঈদের আগে শপিং মল ও বাজারে ভিড় এড়াতে অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটা করেন বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
ঈদযাত্রায় আর্থিক লেনদেন
ঈদের ছুটিতে প্রায় ৪-৫ কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যান। ফলে পরিবহন খাতে বিপুল পরিমানের আর্থিক লেনদেন হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী এ সময় বাস, ট্রেন ও নৌপথে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়। তবে তাদের কাছে মোট লেনদেনের কোনো হিসাব নেই। যদিও ২০২৪ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ঈদে বিভিন্ন পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া বাবদই জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি। ২০২৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঈদের আগের চার দিনে ঢাকা ছাড়েন অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
রেমিট্যান্সের পালে হাওয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঈদ ঘিরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মার্চ মাসের প্রথম ১৪ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মোট ২২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি কিছুটা চাঙা হয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের প্রান্তিক বাজার- সবখানেই উৎসবের আমেজ। একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ঈদ বোনাস; এই দুইয়ের প্রভাবে দেশের বাজারে অর্থের প্রবাহ গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতেও লেনদেনের গতি অনেক বেড়েছে।
একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই নগদ লেনদেনের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করছে।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাস, রেমিট্যান্স, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দান এবং ব্যবসায়ীসহ ধনী ব্যক্তিদের জাকাত বিতরণকে কেন্দ্র করে ঈদে অর্থনীতির গতি বাড়ছে। তাঁদের ভাষায়, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি না থাকলে এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনীতিতে আবার গতি ফিরে আসবে।
- ঈদ উপলক্ষে আড়াই লাখ কোটি টাকা লেনদেনের সম্ভাবনা
- ঈদের দুই দিন আগেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিক্রি
- ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি
- মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হবে ২৮ হাজার কোটি টাকার
যদিও ঈদুল ফিতরের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে কোনো গবেষণা নেই। তবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- এ বছর রোজা ও ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অতিরিক্ত ২ লাখ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, দেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এতে জনমনে স্বস্তি এসেছে। স্বভাবতই গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদের কেনাকাটা ভালো হবে। এ ছাড়া ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকেই দেশের বাইরে কেনাকাটা করতে পারেননি। এসব মানুষ এখন দেশেই কেনাকাটা করবেন। আবার বিদেশের পণ্যও দেশে কম এসেছে। ফলে দেশিয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এতে কেনাকাটা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হবে।
আমরা এবার ৩ লাখ কোটি টাকার বানিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। সেটা হয়তো ২ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় আটকে যাবে। এবার নিত্যপণ্যের দামেও বেশ স্বস্তি ছিল।
হেলাল উদ্দিন সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি
হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এবার ৩ লাখ কোটি টাকার বানিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। সেটা হয়তো ২ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় আটকে যাবে। এবার নিত্যপণ্যের দামেও বেশ স্বস্তি ছিল। লেবুর দামে কিছুটা অস্থিরতা ছিল। তবে তা সাময়িক সময়ের জন্য।'
নিত্যপণ্য ও মসলার বাজার
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, এবার ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার নিত্যপণ্য ও মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকেই বিক্রি বাড়তে থাকে, তবে ঈদের আগের সপ্তাহে বেশি বিক্রি হয়। শুধু ২৮ হাজার কোটি টাকার মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হবে।
পর্যটন খাত
পাশাপাশি ঈদের ছুটিতে দেশি-বিদেশি পর্যটনেও ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। ঈদের ছুটিতে দেশের অনেক পর্যটন এলাকার রিসোর্ট ও হোটের-মোটেল অগ্রিম বুকিং হয়ে যায়।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি
এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রবাসী আয়েও তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে যারা ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে আসছেন বা যারা প্রবাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে আটকে আছেন, তাদের বিষয়টি সরকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি হিসাবে ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া হয় প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য এই দান বাধ্যতামূলক। সাধারণত ঈদ উদযাপনে মানুষ যখন শহর থেকে গ্রামে আসেন, তখন তারা তুলনামূলক দরিদ্রদের ফিতরা দেন। ফলে গ্রামীণ জনপদেও ঈদের আমেজ বাড়ে এবং অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। দোকান মালিক সমিতির হিসাব বলছে, রোজার ঈদে গড়ে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের প্রথম ঈদ। তাই তাই এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা থাকবে।
পোশাক বাজারের চিত্র

ঈদ পোশাক বিক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক খাতে ব্যবসা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঈদ যতই এগিয়ে আসে, কেনাকাটা ততই বাড়ে। ঢাকায় ঈদের কেনাকাটার জন্য বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটসহ অভিজাত শপিংমলগুলোয় মানুষের ঢল নামে।
সূত্র জানায়, ঈদের দুই দিন আগেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৫ সালে ঈদের কেনাবেচা হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় এ বছর ঈদে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির সর্বশেষ সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
উৎসবের অর্থনীতি

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সাধারণত যে সব পণ্য বেশি বেচাকেনা হয় সেগুলোর মধ্যে পোশাক, জুতা, ব্যাগ, প্রসাধন সামগ্রী গৃহস্থালী পণ্য, ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার, মুঠোফোনসহ নানা ধরণের ইলেকট্রনিক্স পণ্য।
ঈ; উৎসব ঘিরে এমন শত শত পণ্যের চাহিদা বাড়ে। তাতে স্থানীয় উৎপাদন, পণ্য আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রি ইত্যাদি খাতে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচলও অনেক বেড়ে যায়। একদল নাড়ির টানে ফেরে ঘরে। আরেক দল আবার ঘুরতে যান বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়। এতে ব্যবহার বাড়ে বিমান, বাস, ট্রেন, লঞ্চ, মাইক্রোবাস, রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকসহ নানা বাহনের। সব মিলিয়ে উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, আমদানি করা পণ্য ও সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়।
উৎসবের মহাকর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতির অংশকে উৎসবের অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঈদের অর্থনীতির প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ঈদে সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস পান, যা সরাসরি ভোক্তা ব্যয়ে চলে যায়। পোশাক শ্রমিকরাও বোনাসের টাকা খরচ করেন নতুন পোশাক, উপহার বা যাত্রা খাতে। ফলে পুরো বাজারই চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
অনলাইনে কেনাকাটা
থ্রি-পিস থেকে শুরু করে লিপস্টিক, পাঞ্জাবি-শাড়ি, নারীর গয়না, প্রসাধনী, হস্তশিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। দেশে কয়েক বছর ধরেই অনলাইন কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয় হলেও ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা জমজমাট হয়ে উঠছে। ঈদের আগে শপিং মল ও বাজারে ভিড় এড়াতে অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটা করেন বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
ঈদযাত্রায় আর্থিক লেনদেন
ঈদের ছুটিতে প্রায় ৪-৫ কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যান। ফলে পরিবহন খাতে বিপুল পরিমানের আর্থিক লেনদেন হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী এ সময় বাস, ট্রেন ও নৌপথে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়। তবে তাদের কাছে মোট লেনদেনের কোনো হিসাব নেই। যদিও ২০২৪ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ঈদে বিভিন্ন পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া বাবদই জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি। ২০২৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঈদের আগের চার দিনে ঢাকা ছাড়েন অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
রেমিট্যান্সের পালে হাওয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঈদ ঘিরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মার্চ মাসের প্রথম ১৪ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মোট ২২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

ঈদকে কেন্দ্র করে চাঙা অর্থনীতি
মরিয়ম সেঁজুতি

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি কিছুটা চাঙা হয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের প্রান্তিক বাজার- সবখানেই উৎসবের আমেজ। একদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ঈদ বোনাস; এই দুইয়ের প্রভাবে দেশের বাজারে অর্থের প্রবাহ গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতেও লেনদেনের গতি অনেক বেড়েছে।
একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই নগদ লেনদেনের পরিমাণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের ঈদে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করছে।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাস, রেমিট্যান্স, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দান এবং ব্যবসায়ীসহ ধনী ব্যক্তিদের জাকাত বিতরণকে কেন্দ্র করে ঈদে অর্থনীতির গতি বাড়ছে। তাঁদের ভাষায়, চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি না থাকলে এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি এবং কর্মসংস্থান বাড়লে অর্থনীতিতে আবার গতি ফিরে আসবে।
- ঈদ উপলক্ষে আড়াই লাখ কোটি টাকা লেনদেনের সম্ভাবনা
- ঈদের দুই দিন আগেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিক্রি
- ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি
- মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হবে ২৮ হাজার কোটি টাকার
যদিও ঈদুল ফিতরের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে কোনো গবেষণা নেই। তবে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- এ বছর রোজা ও ঈদুল ফিতরকে ঘিরে অতিরিক্ত ২ লাখ কোটি টাকা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, দেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এসেছে। এতে জনমনে স্বস্তি এসেছে। স্বভাবতই গত বছরের তুলনায় এবারের ঈদের কেনাকাটা ভালো হবে। এ ছাড়া ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেকেই দেশের বাইরে কেনাকাটা করতে পারেননি। এসব মানুষ এখন দেশেই কেনাকাটা করবেন। আবার বিদেশের পণ্যও দেশে কম এসেছে। ফলে দেশিয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এতে কেনাকাটা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হবে।
আমরা এবার ৩ লাখ কোটি টাকার বানিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। সেটা হয়তো ২ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় আটকে যাবে। এবার নিত্যপণ্যের দামেও বেশ স্বস্তি ছিল।
হেলাল উদ্দিন সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি
হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা এবার ৩ লাখ কোটি টাকার বানিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম। সেটা হয়তো ২ লাখ ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় আটকে যাবে। এবার নিত্যপণ্যের দামেও বেশ স্বস্তি ছিল। লেবুর দামে কিছুটা অস্থিরতা ছিল। তবে তা সাময়িক সময়ের জন্য।'
নিত্যপণ্য ও মসলার বাজার
দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, এবার ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার নিত্যপণ্য ও মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হতে পারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানের শুরু থেকেই বিক্রি বাড়তে থাকে, তবে ঈদের আগের সপ্তাহে বেশি বিক্রি হয়। শুধু ২৮ হাজার কোটি টাকার মসলাজাতীয় পণ্য বিক্রি হবে।
পর্যটন খাত
পাশাপাশি ঈদের ছুটিতে দেশি-বিদেশি পর্যটনেও ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। ঈদের ছুটিতে দেশের অনেক পর্যটন এলাকার রিসোর্ট ও হোটের-মোটেল অগ্রিম বুকিং হয়ে যায়।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি
এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রবাসী আয়েও তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে যারা ঈদকে কেন্দ্র করে দেশে আসছেন বা যারা প্রবাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে আটকে আছেন, তাদের বিষয়টি সরকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি হিসাবে ঈদুল ফিতরে ফিতরা দেওয়া হয় প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য এই দান বাধ্যতামূলক। সাধারণত ঈদ উদযাপনে মানুষ যখন শহর থেকে গ্রামে আসেন, তখন তারা তুলনামূলক দরিদ্রদের ফিতরা দেন। ফলে গ্রামীণ জনপদেও ঈদের আমেজ বাড়ে এবং অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। দোকান মালিক সমিতির হিসাব বলছে, রোজার ঈদে গড়ে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের প্রথম ঈদ। তাই তাই এ ঈদ ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে। কারণ নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় যাবেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন এবং সাধারণ মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া ঈদকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও হবে। তাই এবারের ঈদে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা থাকবে।
পোশাক বাজারের চিত্র

ঈদ পোশাক বিক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক খাতে ব্যবসা হয় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঈদ যতই এগিয়ে আসে, কেনাকাটা ততই বাড়ে। ঢাকায় ঈদের কেনাকাটার জন্য বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, খিলগাঁওয়ের তালতলা মার্কেটসহ অভিজাত শপিংমলগুলোয় মানুষের ঢল নামে।
সূত্র জানায়, ঈদের দুই দিন আগেই ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৫ সালে ঈদের কেনাবেচা হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় এ বছর ঈদে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা নিয়ে কোনো গবেষণা করেনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। সংগঠনটির সর্বশেষ সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
উৎসবের অর্থনীতি

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে সাধারণত যে সব পণ্য বেশি বেচাকেনা হয় সেগুলোর মধ্যে পোশাক, জুতা, ব্যাগ, প্রসাধন সামগ্রী গৃহস্থালী পণ্য, ফ্রিজ, টিভি, কম্পিউটার, মুঠোফোনসহ নানা ধরণের ইলেকট্রনিক্স পণ্য।
ঈ; উৎসব ঘিরে এমন শত শত পণ্যের চাহিদা বাড়ে। তাতে স্থানীয় উৎপাদন, পণ্য আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রি ইত্যাদি খাতে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের চলাচলও অনেক বেড়ে যায়। একদল নাড়ির টানে ফেরে ঘরে। আরেক দল আবার ঘুরতে যান বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়। এতে ব্যবহার বাড়ে বিমান, বাস, ট্রেন, লঞ্চ, মাইক্রোবাস, রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকসহ নানা বাহনের। সব মিলিয়ে উৎসবকে কেন্দ্র করে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, আমদানি করা পণ্য ও সেবা খাতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়।
উৎসবের মহাকর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতির অংশকে উৎসবের অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ঈদের অর্থনীতির প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ঈদে সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস পান, যা সরাসরি ভোক্তা ব্যয়ে চলে যায়। পোশাক শ্রমিকরাও বোনাসের টাকা খরচ করেন নতুন পোশাক, উপহার বা যাত্রা খাতে। ফলে পুরো বাজারই চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
অনলাইনে কেনাকাটা
থ্রি-পিস থেকে শুরু করে লিপস্টিক, পাঞ্জাবি-শাড়ি, নারীর গয়না, প্রসাধনী, হস্তশিল্প ও নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। দেশে কয়েক বছর ধরেই অনলাইন কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয় হলেও ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা জমজমাট হয়ে উঠছে। ঈদের আগে শপিং মল ও বাজারে ভিড় এড়াতে অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটা করেন বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
ঈদযাত্রায় আর্থিক লেনদেন
ঈদের ছুটিতে প্রায় ৪-৫ কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যান। ফলে পরিবহন খাতে বিপুল পরিমানের আর্থিক লেনদেন হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী এ সময় বাস, ট্রেন ও নৌপথে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়। তবে তাদের কাছে মোট লেনদেনের কোনো হিসাব নেই। যদিও ২০২৪ সালের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ঈদে বিভিন্ন পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া বাবদই জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে ৮৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি। ২০২৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঈদের আগের চার দিনে ঢাকা ছাড়েন অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
রেমিট্যান্সের পালে হাওয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঈদ ঘিরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মার্চ মাসের প্রথম ১৪ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মোট ২২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।




