শিরোনাম

প্রবাস আয় এবং এভিয়েশন খাতে বড় ধাক্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রবাস আয় এবং এভিয়েশন খাতে বড় ধাক্কা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এখনও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতি শুধু ভূ-রাজনীতিতেই নয়, বিরূপ প্রভাব ফেলেছে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তিন দেশের হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়। যত দিন যাচ্ছে, ততই বাতিল হওয়া ফ্লাইটের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের এভিয়েশন খাত, প্রবাসী কর্মীর জীবনসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ৪৭৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি যাত্রী। যাদের অধিকাংশই প্রবাসী শ্রমিক। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।

এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাবে তাদের কার্যক্রম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে গেছে। ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও এয়ারলাইন্সগুলোর প্রশাসনিক ব্যয়, মেইনটেন্যান্স ও পার্কিং চার্জ থেমে নেই। ফলে অর্থের সংকুলান দেওয়া কঠিন হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য গন্তব্যে চলাচল করা বৈশ্বিক এয়ারলাইন্সগুলোও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক বিমান সংস্থার জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে বলে মত খাত সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রবাসকর্মীদের জন্য বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থাসহ সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।

এদিকে ঈদের ছুটিতে অনেক প্রবাসী শ্রমিক স্বজনদের সঙ্গে কিছু দিন কাটানোর পরিকল্পনা করে দেশে ফিরেছেন। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাদের ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আগেভাগে টিকিট কেটে রাখলেও ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা এখন ঘরবন্দি, যা তাদের জীবিকারও পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রবাসীরা বলছেন, ‘আমাদের ঈদের আনন্দ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কবে ফিরে যেতে পারবো তা জানি না।’

দিন যত যাচ্ছে, উদ্বেগ ততই বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে অনেকেরই চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য দ্বিমুখী সংকট তৈরি করছে। একদিকে এভিয়েশন খাত, অন্যদিকে প্রবাসী আয়ে প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। সরকারি তথ্য অনুসারে, প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক এই ছয়টি দেশে কর্মরত। প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটে যাত্রা করেন। কিন্তু আকাশপথ বন্ধের কারণে দাম্মাম, দোহা, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও কুয়েত রুটগুলো সম্পূর্ণ স্থগিত।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত টানা ১৫ দিনে মোট ৪৭৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যদিও এ কয়দিন সীমিত পরিসরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটের ক্ষমতার ৫৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে। বিমানবন্দরে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ফেরার ফ্লাইটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। আবার ফ্লাইট চালু না হওয়ায় ফেরত যাচ্ছেন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বলেন, ‘বিমানের আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আমরা ব্যাপক সংকটে পড়েছি।’

বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও এই সংকটে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জানান, ‘আমাদের ফ্লাইটের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যগামী। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমরা প্রায় ৬০ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছি। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে ছোট এয়ারলাইন্স হিসেবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, এটি আমাদের সবার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়। সরকারের উচিত এভিয়েশন খাতকে বাঁচাতে জরুরি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা।’

প্রবাসী আয়ে ধসের শঙ্কা

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ আসে প্রবাসী আয় থেকে। দেশের রেমিট্যান্স ও রপ্তানি খাত সংকুচিত হলে অর্থনীতিতে প্রভাব হবে ভয়াবহ। প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে জিসিসি দেশ থেকে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৯৯০ কোটি ডলার এসেছে জিসিসি দেশগুলো থেকে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ পড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের ওপর সরাসরি ও বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। যদি সংঘাত দীর্ঘ হয়, তাহলে অনেক দেশ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও শিল্প উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

আকাশপথ খোলার অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এখনও চলমান রয়েছে। তবে এর মধ্যেও কয়েকটি এয়ারলাইন্স সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চালু করেছে। তবে আকাশপথের অনিরাপত্তা ও মাঝে মাঝে বন্ধের কারণে তা অস্থির। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিকল্প রুট (যেমন তুরস্ক বা অন্যান্য দেশ দিয়ে) খোঁজা হচ্ছে, কিন্তু খরচ অনেক বেশি। ইরান, ইরাক, কুয়েত, ইসরায়েল, বাহরাইন, কাতার, সিরিয়ার আকাশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের আকাশপথ আংশিক সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কমপক্ষে চার-পাঁচ মাস চলতে পারে। যুদ্ধ বন্ধ হলেও আকাশপথ পুরোপুরি চালু হতে আরও সময় লাগবে।

/জেএইচ/