সংকট মোকাবিলায় বাড়াতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন

সংকট মোকাবিলায় বাড়াতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন
বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে ৪৭.৭% থেকে ৬২.৫%-এ পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ নানা খাতে ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতি আরও ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব বিষয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এই সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পরমর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
যুত্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশকিছু কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড় মূল্য ২৯০% বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চ মূল্য এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯.৫ টাকা এবং ৫.৯ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি করেছে।
শফিকুল আলম আরও বলেন, ২৫% এর কম লোড ভিত্তিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১৬.৮৫ টাকা, যেখানে প্রায় ৭৫% লোড ফ্যাক্টরে তা ছিল মাত্র ৬ টাকা।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। এতে গ্যাসের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে ওই প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২.৩%, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩.৮%-এর তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে অনেক কম ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লে করা হয়েছে, বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি (ডিআরই) ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব। তাইে এই খাতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ‘বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করাই হবে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের অন্যতম উপায়। চুক্তির মেয়াদ শেষে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যেতে পারে।’
গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করত পারে। মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ৬,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে সর্বোচ্চ ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্পোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (সিপিপিএ)-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কম রাখা প্রয়োজন। এতে পোশাক শিল্পসহ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজ হয়।
যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আশঙ্কা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের আয় কমে যাবে। তবে আইইইএফএ এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে গ্রিড-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রাজস্ব ঘাটতি ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা (৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার) দাড়িয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার আর্থিক চাপ আরও বাড়াবে । তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে ৪৭.৭% থেকে ৬২.৫%-এ পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ নানা খাতে ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতি আরও ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব বিষয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এই সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পরমর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
যুত্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশকিছু কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড় মূল্য ২৯০% বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চ মূল্য এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯.৫ টাকা এবং ৫.৯ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি করেছে।
শফিকুল আলম আরও বলেন, ২৫% এর কম লোড ভিত্তিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১৬.৮৫ টাকা, যেখানে প্রায় ৭৫% লোড ফ্যাক্টরে তা ছিল মাত্র ৬ টাকা।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। এতে গ্যাসের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে ওই প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২.৩%, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩.৮%-এর তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে অনেক কম ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লে করা হয়েছে, বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি (ডিআরই) ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব। তাইে এই খাতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ‘বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করাই হবে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের অন্যতম উপায়। চুক্তির মেয়াদ শেষে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যেতে পারে।’
গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করত পারে। মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ৬,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে সর্বোচ্চ ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্পোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (সিপিপিএ)-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কম রাখা প্রয়োজন। এতে পোশাক শিল্পসহ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজ হয়।
যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আশঙ্কা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের আয় কমে যাবে। তবে আইইইএফএ এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে গ্রিড-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রাজস্ব ঘাটতি ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা (৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার) দাড়িয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার আর্থিক চাপ আরও বাড়াবে । তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে।

সংকট মোকাবিলায় বাড়াতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন
বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে ৪৭.৭% থেকে ৬২.৫%-এ পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ নানা খাতে ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতি আরও ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব বিষয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩% পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এই সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পরমর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
যুত্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশকিছু কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার গড় মূল্য ২৯০% বৃদ্ধি, স্বল্প সময়ের জন্য তেলের উচ্চ মূল্য এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদনটির লেখক ও আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় গড়ে যথাক্রমে প্রায় ৯.৫ টাকা এবং ৫.৯ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি করেছে।
শফিকুল আলম আরও বলেন, ২৫% এর কম লোড ভিত্তিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১৬.৮৫ টাকা, যেখানে প্রায় ৭৫% লোড ফ্যাক্টরে তা ছিল মাত্র ৬ টাকা।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। এতে গ্যাসের দাম বেড়ে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার (১৩১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন টাকা) ভর্তুকি দিতে হবে বলে ওই প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হিসাব ২০২৫ সালের একই সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট আমদানি মূল্য প্রায় ২০ ডলার বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২.৩%, যা বৈশ্বিক গড় ৩৩.৮%-এর তুলনায় অনেক কম। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে অনেক কম ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লে করা হয়েছে, বর্তমানে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি (ডিআরই) ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে এর জীবনচক্রে ফার্নেস অয়েল আমদানি কমিয়ে এককালীন আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি সাশ্রয় সম্ভব। তাইে এই খাতে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ‘বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সীমিত করাই হবে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের অন্যতম উপায়। চুক্তির মেয়াদ শেষে কিছু তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলে উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এড়ানো যেতে পারে।’
গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করত পারে। মার্চ-সেপ্টেম্বরের উচ্চ চাহিদার সময়ে নেপাল ও ভুটান থেকে সম্মিলিত ৬,০০০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পেলে ২০৩০ সালের পর বছরে সর্বোচ্চ ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় সম্ভব।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্পোরেট পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (সিপিপিএ)-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কম রাখা প্রয়োজন। এতে পোশাক শিল্পসহ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজ হয়।
যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আশঙ্কা এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের আয় কমে যাবে। তবে আইইইএফএ এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে গ্রিড-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রাজস্ব ঘাটতি ৫৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা (৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার) দাড়িয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার আর্থিক চাপ আরও বাড়াবে । তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর নির্ভর করছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। কারণ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও উচ্চ ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে।




