শিরোনাম

কুড়িগ্রামে ভোটের সমীকরণে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

তামজিদ হাসান তুরাগ
কুড়িগ্রামে ভোটের সমীকরণে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
কুড়িগ্রামে জনসভায় ভোটাররা। ছবি: সংগৃহীত

নদীভাঙনে বারবার ক্ষত-বিক্ষত জনপদ কুড়িগ্রামে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা। তারা বলছেন, এবার তারা ভোট দেবেন খুব হিসাব করে। বিগত সময়ে যারা এলাকার উন্নয়ন করেনি তাদের এবার দেখানো হবে লাল কার্ড। আর যারা নদী ভাঙন, বেকারত্ব সমাধানে কাজ করবেন তারাই পাবে ভোট। এখন গ্রাম থেকে চর, শহর থেকে বাজার, চায়ের দোকান থেকে ফেরীঘাট সব জায়গায় একটাই প্রশ্ন কে পালটে দেবে কুড়িগ্রামের ভাগ্য। ভোটাররা বলছেন, জেলার চারটি আসনে এবার হবে ১১ দলীয় জোট, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির লড়াই।

হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় পার্টিরও নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়। মাঠে বড় দল হিসেবে বিএনপির তৎপরতা থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিয়েছে ৪টি আসনের মধ্যে ৩ টিতেই।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় পার্টিরও নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দিয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়। মাঠে বড় দল হিসেবে বিএনপির তৎপরতা থাকলেও প্রার্থী বাছাইয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিয়েছে ৪টি আসনের মধ্যে ৩ টিতেই। বিশেষ করে ১, ৩ ও ৪ নম্বর আসনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের কারণে সুপরিকল্পিত এগোচ্ছে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীরা। মাঠে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশেরও রয়েছে ব্যাপক প্রচার।

কুড়িগ্রাম-১ আসনে (নাগেশ্বরী-ভুরুঙ্গামারী) অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে আশা করছেন ভোটাররা। এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনীত হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি সাইফুর রহমান রানা। ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হয়েছেন আনোয়ারুল ইসলাম। ইসলামি আন্দোলনের কুড়িগ্রাম জেলা শিল্প ও বানিজ্য বিষয়ক সম্পাদক হারিসুল বারী রনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। এখানে ভোটাররা প্রত্যাশা করছেন বিএনপি ও জাপা প্রার্থীর মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।

এই আসনে বিএনপি আর জাতীয় পার্টির লড়াই হবে। তারা প্রচারণায়ও বেশি এগিয়ে। দুজনেই সাবেক এমপি। এখন দেখা যাক সামনে কী হয়। তবে যিনি আমাদের জন্য কাজ করবেন আমরা তাকে ভোট দিবো
রবিউল ইসলাম স্থানীয় ভোটার

স্থানীয় ভোটার রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এই আসনে বিএনপি আর জাতীয় পার্টির লড়াই হবে। তারা প্রচারণায়ও বেশি এগিয়ে। দুজনেই সাবেক এমপি। এখন দেখা যাক সামনে কী হয়। তবে যিনি আমাদের জন্য কাজ করবেন আমরা তাকে ভোট দিবো।’

কুড়িগ্রাম-২ (ফুলবাড়ী, রাজারহাট ও কুড়িগ্রাম সদর) কুড়িগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন। এই আসন অধিকাংশ সময় জাতীয় পার্টির দখলে থাকায় তাদের দুর্গ হিসেবেই পরিচিত। তবে এবার এখানে নতুন সমীকরণ। এ আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী করা হয়েছে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদকে। দলীয় কোনো কোন্দল না থাকায় তার পক্ষে কাজ করছেন সবাই। ব্যানার, ফেস্টুন ও র‍্যালির মাধ্যমে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণা।

ভোটের মাঠে প্রচারণায় সবচেয়ে এগিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সমন্বয়ক ড. আতিক মুজাহিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রনেতা ইতোমধ্যেই তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এলাকায় গণসংযোগ ও বেসরকারি বিভিন্ন টেলিভিশনে কুড়িগ্রাম নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনা তরুন প্রজন্ম ও ভোটারদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। শেষ সময়ে মাঠে নেমেছেন জাপার সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ।

এবার আওয়ামী লীগের ভোট যে প্রার্থী বেশি পাবেন সেই নির্বাচিত হবেন। এ আসনে সবার ভোট কমবেশি আছে।

এই আসনের সাধারণ ভোটার আব্দুল জব্বার বলেন, ‘এবার আওয়ামী লীগের ভোট যে প্রার্থী বেশি পাবেন সেই নির্বাচিত হবেন। এ আসনে সবার ভোট আছে।’

কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে বিএনপি, ১১ দলীয় ঐক্য আর ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা। প্রত্যেকের রয়েছে ব্যক্তিগত ইমেজ আর ভোট। জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের হাতে বারবার প্রতারণার শিকার এ আসনের ভোটাররা এবার সৎ, যোগ্য ও তরুন নেতৃত্ব খুঁজছেন।

১১ দলীয় ঐক্য থেকে ছাত্র শিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহীকে প্রার্থী ঘোষণা করার পরপর নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি।

অপরদিকে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির প্রার্থী সাবেক সভাপতি তাসভীর উল ইসলামকে প্রার্থী ঘোষণার পরপরই প্রচারণায় নেমেছেন তিনি। তবে তার প্রার্থীতা পরিবর্তনের দাবিতে আন্দলনে নেমেছেন রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেকের কর্মী-সমর্থকেরা। প্রকাশ্যে না থাকলেও গোপনে রয়েছে গ্রুপিং।

ইসলামী আন্দোলন থেকে মনোনয়ন পেয়ে ডা.আক্কাস আলীও বসে নেই। তিনিও বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও পেশায় চিকিৎসক হওয়ার কারণে এলাকায় তার নিজস্ব একটা ভোট ব্যাংক রয়েছে। ঐ আসনের তরুণ ভোটার পাপন সিংহ। তিনি বলেন, কে হবে তা আসলে বলা কঠিন। তবে ভোটের লড়াই হবে তীব্র।

বেকারত্ব, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নদীভাঙন কবলিত কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর) আসনে জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও জেপির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও কেউ এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাই ভোটাররা বারবার নতুন প্রার্থী বেছে নেয় এলাকার উন্নয়ন ও তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। পাঁচ মাস আগেই রৌমারী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রার্থী ঘোষণা করে জামায়াত।

এই আসনে ভোটের লড়াই একটু ভিন্নধরনের। ‍হিসাবটাও মুশকিল আসলে বলা যাচ্ছে না কে হবে। তবে অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় এগিয়ে আছে দুই ভাই
মুজাহিদ ভোটার

বিএনপি থেকে প্রার্থী করা হয় তারই আপন বড় ভাই আজিজুর রহমানকে। এ ছাড়া ইসলামি আন্দোলন থেকে রয়েছেন হাফিজুর রহমান। ভোটের মাঠে তিন প্রার্থী থাকলেও এগিয়ে আছে দুই ভাই বলে মন্তব্য করছেন ভোটাররা। বিএনপি প্রার্থী আজিজুর রহমানের নির্বাচনী এলাকায় দলীয় কর্মী ও ভোটারদের সাথে যোগাযোগ কম থাকার কারনে দুই ভাইয়ের লড়াইয়ে এ আসনে জামায়াত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানকে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা। তবে ভোটের মূল লড়াইটা দুই ভাইয়ের মধ্যে হবে বলে বলছেন ভোটাররা। মুজাহিদ নামের এক ভোটার বলেন, ‘এই আসনে ভোটের লড়াই একটু ভিন্নধরনের। ‍হিসাবটাও মুশকিল আসলে বলা যাচ্ছে না কে হবে। তবে অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় এগিয়ে আছে দুই ভাই।’

কুড়িগ্রাম জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা সংখ্যা ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৩৭ জন। পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৫৪ হাজার ২০৯ জন। এছাড়া হিজরা ভোটার রয়েছেন ১৪ জন।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তরের এই সীমান্তবর্তী জেলার মানুষের কৌতূহল বৃদ্ধি পাচ্ছে। চারটি আসনের অধিকাংশ ভোট কোনদিকে যাবে তা এখনো অনিশ্চিত। তবে কুড়িগ্রামের নদী ভাঙন, মৌসুমি বন্যা, রাস্তা-ঘাটের সমস্যা, কর্মসংস্থান সংকট, সীমান্ত সমস্যা সমাধানে যারা ভূমিকা রাখবে তাদেরই জনগণ বেছে নেবে বলে ধারণা করছেন রাজনীতিবিদ ও ভোটাররা। কুড়িগ্রাম জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৩৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ জন, নারী ভোটার ৯ লাখ ৫৪ হাজার ২০৯ জন। এ ছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৪ জন।

/টিই/