শিরোনাম

হকারদের জন্য জায়গা বরাদ্দে বিশৃঙ্খলা, ভোগান্তির শঙ্কা

হকারদের জন্য জায়গা বরাদ্দে বিশৃঙ্খলা, ভোগান্তির শঙ্কা
রাজধানীর গুলিস্তানের শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে সড়কের মাঝখানে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা দোকানের জায়গা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ফুটপাত দখলমুক্ত করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং হকারদের নিয়ন্ত্রণে ‘হকার কার্ড’ দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু এই উদ্যোগে পথচারীদের দুর্ভোগ কমবে কি না তা নিয়ে বেশকিছু কারণে সংশয় প্রকাশ করেছে নগরপরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।

নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং হকারদের নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ কাজ নয়। যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু হকার কার্ড চালু করে যানজট ও পথচারীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব না, বরং এতে নতুন করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শনিবার গুলিস্তানের শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ (বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুইপাশ, মাঝখানে এবং ফুটপাতে সদা রং দিয়ে দাগ টেনে হকারদের দোকান বসানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রতিটি দোকানে আয়তন ২০ বর্গফুট। এসব স্থানে ইতোমধ্যে অনেক হকার ভ্যানে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন। একটি দোকান থেকে আরেকটির দূরত্ব মাত্র দেড় ফুট থেকে দুই ফুট। দোকানের জায়গা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, সেসব স্থানে হকাররা বসলে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে কষ্ট হবে পথচারীদের। একই সঙ্গে সড়কের মাঝখানেও দোকানের জন্য জায়গা রাখায় যানবাহন চলাচলেও সমস্যা হবে। এমনকি এতে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

ভোগান্তির আশঙ্কা পথচারীদের

হকারদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করলেও এভাবে সড়কে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পথচারীরা। তারা বলছেন, হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। তবে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে তাদের বসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি কোনো কার্যকর ও টেকসই সমাধান নয়।

হকারদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করলেও এভাবে সড়কে জায়গা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পথচারীরা। তারা বলছেন, হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। তবে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে তাদের বসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি কোনো কার্যকর ও টেকসই সমাধান নয়।

শনিবার শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে নূরে আলম রবিন নামের এক পথচারীর সঙ্গে কথা হয় । কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফুটপাতে হাজার হাজার হকার ব্যবসা করেন এবং তাদের পরিবার এই আয়ের উপরই নির্ভরশীল। তাই তাদের উচ্ছেদ করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তবে পুনর্বাসনের নামে আবার পুরো রাস্তায় দাগ কেটে নির্দিষ্ট স্থান এবং ফুটপাত দখল করে ফেলার বিষয়টিও গ্রহণযোগ্য নয়।

রবিন বলেন, সিটি করপোরেশন চাইলে আরও পরিকল্পিতভাবে হকারদের বসার জায়গা নির্ধারণ করতে পারত। ঘনঘন দাগ দিয়ে ফুটপাত না আটকে নির্দিষ্ট দূরত্বে দোকানের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা উচিত ছিল। আগে যেখানে ২০০ জন হকার বসতেন, সেখানে ১০০ জনকে সুযোগ দিলে পথচারীরা অন্তত কিছুটা স্বস্তিতে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারতেন।

ইয়াসিন আরাফাত নামের আরেক পথচারী বলেন, সিটি করপোরেশন হকারদের কার্ডের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তার মতে, আগে ফুটপাতে ব্যবসা করতে গেলে অনেক হকারকে বিভিন্নভাবে চাঁদা দিতে হতো। কিন্তু এখন একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় সেই অনিয়ম কমবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনও আনুষ্ঠানিকভাবে রাজস্ব পাবে, যা সরকারি তহবিলে জমা হবে।

হকারদের ভাবনা

রিয়াজ নামের একজন হকার বলেন, সিটি করপোরেশনের হকার কার্ড দেওয়ার উদ্যোগটি অনেক ভালো হয়েছে। আগে বারবার উচ্ছেদ করে দেওয়ার পর আবার তারা একই জায়গায় দোকান নিয়ে বসত। এখন সেই ঝামেলা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে । তিনি আরও বলেন, ‘আগে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হতো। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাব। এজন্য আমরা নিয়ম মেনে সিটি করপোরেশনকে মাসিক নির্ধারিত ফি দিতে আগ্রহী।’

শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে সড়কের পাশে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা দোকানের জায়গা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে সড়কের পাশে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা দোকানের জায়গা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

তবে রাস্তার মাঝখানে ও ফুটপাতে দাগ দিয়ে দোকানের স্থান নির্ধারণের বিষয়ে রিয়াজ বলেন, মানুষের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন এবং রাস্তার মাঝখানে দোকানের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা পুরোপুরি ঠিক হয়নি।

পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় সমাধান

ফুটপাত ও প্রধান সড়কে হকারদের দোকান নিয়ে নিয়ে বসার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল, অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরব্যবস্থাপনা এবং জনসাধারণের হাঁটার অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে মনে করছেন নগরপরিকল্পনাবিদেরা। তাদের মতে, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে হকার পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিলতা ও সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

নগরপরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যদি সিটি করপোরেশন কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে সব হকারকে ফুটপাতে ব্যবসা করার সুযোগ দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আর ফুটপাতে হাঁটতেই পারবে না। এ সমস্যার সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ডিএসসিসির বক্তব্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, হকারদের একসঙ্গে নয়, ধীরে ধীরে নিয়মের আওতায় আনা হবে। কোথায় ও কোন সময়ে হকার বসবে, তা এলাকা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করতে প্রশস্ত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে হকারদের বসানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনে এই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হবে। এখন পর্যন্ত ৪০০-এর বেশি হকার কার্ডের জন্য নিবন্ধন করেছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ জনকে কার্ড দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের নীতিমালা অনুযায়ী হকার ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে হকাররা যেসব ভ্যান ব্যবহার করছে, ভবিষ্যতে সেগুলো পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট নকশার চার চাকার ভ্যান চালু করা হবে।

শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে সড়কের পাশে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা দোকানের জায়গা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউয়ে সড়কের পাশে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা দোকানের জায়গা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ফুটপাত দখল ও পথচারীদের চলাচল নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, যেখানে জায়গা তুলনামূলক প্রশস্ত সেখানেই পরীক্ষামূলকভাবে হকার বসানো হচ্ছে। মাঝখানে মানুষের চলাচলের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে শৃঙ্খলা আনতে একটু সময় লাগবে।

মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশের সহায়তায় অতিরিক্ত বা অনিয়মিত বসা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। হকারদের কাছ থেকে ফি নেওয়ার বিষয়টিও স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে।

তিনি আরও জানান, কোন এলাকায় কোন সময়ে হকার বসবে তা স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। কোথাও সন্ধ্যাকালীন, কোথাও দিনভিত্তিক, আবার কোথাও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সব এলাকায় একই সময়সূচি থাকবে না।

আপাতত আতঙ্ক তৈরি করতে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে না। তবে যারা সিস্টেমের বাইরে থাকবে, তাদের সরিয়ে দেওয়া বা অন্যত্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি হকারদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার বিষয়টিও ভবিষ্যতে তাদের বিবেচনায় রয়েছে। মো. জহিরুল ইসলাম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

নিয়ম না মেনে বসা হকারদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আপাতত আতঙ্ক তৈরি করতে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে না। তবে যারা সিস্টেমের বাইরে থাকবে, তাদের সরিয়ে দেওয়া বা অন্যত্র স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি হকারদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার বিষয়টিও ভবিষ্যতে তাদের বিবেচনায় রয়েছে।‘

/বিবি/