শিরোনাম
এএফইডির প্রতিবেদন

বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রক্সি ভোট ও বহিরাগতদের প্রভাব বিস্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক
বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে প্রক্সি ভোট ও বহিরাগতদের প্রভাব বিস্তার

বগুড়া-৬ এবং শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচন সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে শেষ হয়েছে। তবে গতকাল শুক্রবার (৯ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি প্রক্সি ভোট, প্রতিবন্ধী ভোটারদের প্রবেশাধিকারে সীমাবদ্ধতা এবং কেন্দ্রগুলোতে বহিরাগতদের প্রভাব বিস্তারের মতো কিছু নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া এই দুই আসনের ১১ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে প্রক্সি ভোটের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই ব্যালট গণনা শুরুর ঘটনাও তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩০টি নাগরিক সংগঠনের জোট অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (এএফইডি) প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এএফইডি একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা।

শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এএফইডি এসব তথ্য তুলে ধরে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত এই পর্যবেক্ষণে সংস্থাটি মোট ৫৩ জন পর্যবেক্ষক নিয়োজিত করে। এর মধ্যে ৩০ জন বগুড়া-৬ এবং ২৩ জন শেরপুর-৩ আসনের ভোটের পরিবেশ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্রেসিওয়াচের চেয়ারপারসন ও এএফইডি বোর্ড সদস্য তালেয়া রহমান, রাইট যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, ডর্পের চেয়ারপারসন এ এইচ এম নোমান এবং এএফইডির সদস্যসচিব ও লাইট হাউজের প্রধান নির্বাহী মো. হারুন-অর-রশিদ।

ভোটের পরিবেশ ও শৃঙ্খলা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটগ্রহণের শুরুটা ছিল উৎসবমুখর এবং নিয়মতান্ত্রিক। ব্যালট বাক্স সিল করার আগে উপস্থিত সবার সামনে সেটি খালি কিনা, তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। বগুড়া ও শেরপুর উভয় আসনেই পর্যাপ্ত নির্বাচনী সামগ্রী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক।

তবে এএফইডির মুখপাত্র হারুন-অর-রশিদ জানান, ‘শান্তিপূর্ণ ভোট হলেও ১১ শতাংশ কেন্দ্রে প্রক্সি ভোটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ১২ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, প্রবেশাধিকার ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি পর্যবেক্ষণে উঠে আসা অন্যতম উদ্বেগের বিষয় ছিল ভোটকেন্দ্রের অবকাঠামো। ৩২ শতাংশ কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যাতায়াতের উপযোগী পরিবেশ ছিল না। যদিও গর্ভবতী নারী ও প্রবীণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সাধারণ প্রবণতা দেখা গেছে। তবে ৫টি কেন্দ্রে এই নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনাও এএফইডির নজরে এসেছে।

অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের চিত্র

নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী কেন্দ্রের আশেপাশে প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকলেও ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বাইরে প্রচারসামগ্রী দেখা গেছে। এ ছাড়া ১২টি কেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নন, এমন ব্যক্তিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে।

আরও উদ্বেগজনকভাবে, ৫০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের দলবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট যানবাহনে কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে, যা ভোটারদের স্বাধীন পছন্দকে প্রভাবিত করার ইঙ্গিত দেয়।

শেরপুর-৩ আসনে ভোট বর্জন

ভোট চলাকালে বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে শেরপুর-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাসুদুর রহমান ব্যাপক অনিয়ম ও তার এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। যদিও এই ঘোষণার ফলে মাঠ পর্যায়ের ভোটগ্রহণে বড় কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি।

ভোটার উপস্থিতি ও ডাকযোগে ভোট

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় এই উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। পর্যবেক্ষকদের মতে, উপস্থিতির হার সর্বোচ্চ ৬৪ শতাংশ থেকে সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে।

অন্যদিকে, ডাকযোগে ভোটের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও সচেতনতার অভাব স্পষ্ট ছিল। বগুড়া-৬ আসনে ইস্যু করা ৩ হাজার ৭৩৬টি ব্যালটের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৬৮টি ফেরত এসেছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই ভুলভাবে পূরণ করা ছিল বা প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত ছিল না।

এএফইডির সুপারিশ

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মানোন্নয়নে এএফইডি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে আরও জোর দেওয়া, প্রতিবন্ধীবান্ধব ভোটকেন্দ্র নিশ্চিত করা, নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ডাকযোগে ভোটের আওতা বাড়িয়ে পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা।

হারুন-অর-রশিদ জানিয়েছেন, এই উপনির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য আগামী মে মাসে প্রকাশিতব্য জাতীয় গণভোট ও সংসদীয় নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনারও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

/বিবি/