যুদ্ধ নেই, তবুও দুর্বিষহ জীবন তেহরানবাসীর
সিটিজেন ডেস্ক

যুদ্ধ নেই, তবুও দুর্বিষহ জীবন তেহরানবাসীর
সিটিজেন ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬: ০০

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ধ্বংসস্তুপ ভবন। ছবি: সংগৃহীত
তেহরানে এখন আর প্রতিদিন বোমার শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ স্বস্তিতে আছে। যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে—এই ভয় আর স্থায়ী শান্তির ক্ষীণ আশা, এই দুইয়ের মাঝে আটকে পড়ে তেহরানের মানুষ প্রতিদিন এক ধরনের অদৃশ্য চাপ নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের জীবন এক অদ্ভুত বাস্তবতায়—না পুরোপুরি যুদ্ধ, না পুরোপুরি শান্তি।
পূর্ব তেহরানের এক এলাকায় বাবার পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কুড়ি বছরের তরুণ সাজ্জাদকে। তাদের সেই বাড়ি এখন ভাঙা লোহা, গুঁড়িয়ে যাওয়া কংক্রিট আর ধ্বংসস্তূপ। বোমা হামলার পর থেকে জায়গাটি সেভাবেই পড়ে আছে। কেউ হাত দেয়নি।
চোখে হতাশা নিয়ে সাজ্জাদ বলে, ‘এগুলো আবার কে গড়ে তুলবে?’
এই প্রশ্ন শুধু তার নিজের নয়—পুরো শহরের অনেক মানুষের মনের কথা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আপাতত আকাশপথের হামলা থামিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে, সেই কূটনীতির অংশ হিসাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদ, মাস্কাট ও মস্কো সফর করছেন। তবুও তেহরানের রাস্তায় যে নীরবতা, তা শান্তির নয়, বরং ঝড়ের আগের বিরতি বলেই মনে হয়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে থমকে থাকা সময়
শহরের একেক জায়গায় একেক রকম দৃশ্য। কোথাও শ্রমিকরা ভাঙা জানালা মেরামত করছে, দেয়ালের ফাটল সারাচ্ছে। আবার কোথাও পুরো এলাকা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে আছে, কেউ আর সেখানে ফেরার সাহস পায় না।
৩৯ বছর বয়সী স্থপতি মোহাম্মদ বলেন, এখন একটি বাড়ি বানানোর খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে নৌ-অবরোধের কারণে দেশের মুদ্রার মান কমে গেছে। ইস্পাতসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগেই নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি দুর্বল ছিল, এখন পরিস্থিতি আরও কঠিন।
অনেকের হাতে কিছু টাকা থাকলেও তারা নতুন করে বাড়ি বানাতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়? তাহলে সবকিছু আবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
সাজ্জাদেরও একই কথা, ‘আজ যদি কিছু তৈরি করি, কাল আবার সেটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’
৫২ বছর বয়সী মরিয়মের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কাছে তার বাড়ি প্রথম দফার হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। শুরুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি হোটেলে আশ্রয় পেলেও এখন তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে। সরকারি ঋণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা তার প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
মরিয়মের হতাশাগ্রস্থ কণ্ঠে, ‘যে ছোট অ্যাপার্টমেন্টের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের স্মৃতি নেই, আর আমাদের চাহিদাও পূরণ হবে না। কীভাবে মানিয়ে নেব, বুঝতে পারছি না।’
বাজারে ভিড়, কিন্তু নিশ্চিন্ততা নেই
পশ্চিম তেহরানের নাভভাব সাফাভি এলাকায় এখন বেশ ভিড়। মানুষ বাজারে যাচ্ছে, কেনাকাটা করছে—যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অস্থিরতা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মী আশকবুস বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণের কারণে বড় ধরনের খাদ্য সংকট এখনো দেখা যায়নি। কিন্তু অন্য জিনিসের দাম প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, মাংস, ওষুধ ও নির্মাণসামগ্রী। এতে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে অবরোধের কারণে পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে গেছে। এই সমস্যা এড়াতে ইরান বিভিন্ন বিকল্প পথ ব্যবহার করছে, যেমন স্থলপথ বা গোপন নৌপথ। কিন্তু তাতেও পুরো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
৭১ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ফেরেদুন বলেন, পণ্য আনতে এখন অনেক সময় লাগে, খরচও অনেক বেড়েছে। ফলে গ্রাহকেরা কম দামের, কিন্তু নিম্নমানের জিনিস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে নতুন পণ্য আনব, যদি না-ই জানি কাল কী হবে? যুদ্ধ শুরু হবে, নাকি নৌ-অবরোধ আরও বাড়বে?’
তার মতে, এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যেই তাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
দুই দিকের টানাপোড়েনে মানুষ
তেহরানের ৪৭ বছর বয়সী বাসিন্দা ইউসরা এই পরিস্থিতিকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি যেন দুই দেয়ালের মাঝে আটকে আছি।’
একদিকে যুদ্ধের ভয়, অন্যদিকে স্থায়ী শান্তির আশা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তেহরানের মানুষ।
তাদের প্রতিদিনের জীবন চলছে, কিন্তু বুকের ভেতর হারানোর বেদনা।
এই সময়টা তাই এক অদ্ভুত বাস্তবতা—যেখানে বোমা নেই, কিন্তু ভয় আছে; জীবন চলছে, কিন্তু স্থিরতা নেই।
এটি না যুদ্ধ, না শান্তি। বরং এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ের সময়।
সূত্র: আল জাজিরা

তেহরানে এখন আর প্রতিদিন বোমার শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ স্বস্তিতে আছে। যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে—এই ভয় আর স্থায়ী শান্তির ক্ষীণ আশা, এই দুইয়ের মাঝে আটকে পড়ে তেহরানের মানুষ প্রতিদিন এক ধরনের অদৃশ্য চাপ নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের জীবন এক অদ্ভুত বাস্তবতায়—না পুরোপুরি যুদ্ধ, না পুরোপুরি শান্তি।
পূর্ব তেহরানের এক এলাকায় বাবার পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কুড়ি বছরের তরুণ সাজ্জাদকে। তাদের সেই বাড়ি এখন ভাঙা লোহা, গুঁড়িয়ে যাওয়া কংক্রিট আর ধ্বংসস্তূপ। বোমা হামলার পর থেকে জায়গাটি সেভাবেই পড়ে আছে। কেউ হাত দেয়নি।
চোখে হতাশা নিয়ে সাজ্জাদ বলে, ‘এগুলো আবার কে গড়ে তুলবে?’
এই প্রশ্ন শুধু তার নিজের নয়—পুরো শহরের অনেক মানুষের মনের কথা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আপাতত আকাশপথের হামলা থামিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে, সেই কূটনীতির অংশ হিসাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদ, মাস্কাট ও মস্কো সফর করছেন। তবুও তেহরানের রাস্তায় যে নীরবতা, তা শান্তির নয়, বরং ঝড়ের আগের বিরতি বলেই মনে হয়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে থমকে থাকা সময়
শহরের একেক জায়গায় একেক রকম দৃশ্য। কোথাও শ্রমিকরা ভাঙা জানালা মেরামত করছে, দেয়ালের ফাটল সারাচ্ছে। আবার কোথাও পুরো এলাকা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে আছে, কেউ আর সেখানে ফেরার সাহস পায় না।
৩৯ বছর বয়সী স্থপতি মোহাম্মদ বলেন, এখন একটি বাড়ি বানানোর খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে নৌ-অবরোধের কারণে দেশের মুদ্রার মান কমে গেছে। ইস্পাতসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগেই নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি দুর্বল ছিল, এখন পরিস্থিতি আরও কঠিন।
অনেকের হাতে কিছু টাকা থাকলেও তারা নতুন করে বাড়ি বানাতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়? তাহলে সবকিছু আবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
সাজ্জাদেরও একই কথা, ‘আজ যদি কিছু তৈরি করি, কাল আবার সেটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’
৫২ বছর বয়সী মরিয়মের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কাছে তার বাড়ি প্রথম দফার হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। শুরুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি হোটেলে আশ্রয় পেলেও এখন তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে। সরকারি ঋণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা তার প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
মরিয়মের হতাশাগ্রস্থ কণ্ঠে, ‘যে ছোট অ্যাপার্টমেন্টের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের স্মৃতি নেই, আর আমাদের চাহিদাও পূরণ হবে না। কীভাবে মানিয়ে নেব, বুঝতে পারছি না।’
বাজারে ভিড়, কিন্তু নিশ্চিন্ততা নেই
পশ্চিম তেহরানের নাভভাব সাফাভি এলাকায় এখন বেশ ভিড়। মানুষ বাজারে যাচ্ছে, কেনাকাটা করছে—যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অস্থিরতা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মী আশকবুস বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণের কারণে বড় ধরনের খাদ্য সংকট এখনো দেখা যায়নি। কিন্তু অন্য জিনিসের দাম প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, মাংস, ওষুধ ও নির্মাণসামগ্রী। এতে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে অবরোধের কারণে পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে গেছে। এই সমস্যা এড়াতে ইরান বিভিন্ন বিকল্প পথ ব্যবহার করছে, যেমন স্থলপথ বা গোপন নৌপথ। কিন্তু তাতেও পুরো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
৭১ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ফেরেদুন বলেন, পণ্য আনতে এখন অনেক সময় লাগে, খরচও অনেক বেড়েছে। ফলে গ্রাহকেরা কম দামের, কিন্তু নিম্নমানের জিনিস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে নতুন পণ্য আনব, যদি না-ই জানি কাল কী হবে? যুদ্ধ শুরু হবে, নাকি নৌ-অবরোধ আরও বাড়বে?’
তার মতে, এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যেই তাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
দুই দিকের টানাপোড়েনে মানুষ
তেহরানের ৪৭ বছর বয়সী বাসিন্দা ইউসরা এই পরিস্থিতিকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি যেন দুই দেয়ালের মাঝে আটকে আছি।’
একদিকে যুদ্ধের ভয়, অন্যদিকে স্থায়ী শান্তির আশা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তেহরানের মানুষ।
তাদের প্রতিদিনের জীবন চলছে, কিন্তু বুকের ভেতর হারানোর বেদনা।
এই সময়টা তাই এক অদ্ভুত বাস্তবতা—যেখানে বোমা নেই, কিন্তু ভয় আছে; জীবন চলছে, কিন্তু স্থিরতা নেই।
এটি না যুদ্ধ, না শান্তি। বরং এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ের সময়।
সূত্র: আল জাজিরা

যুদ্ধ নেই, তবুও দুর্বিষহ জীবন তেহরানবাসীর
সিটিজেন ডেস্ক
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬: ০০

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ধ্বংসস্তুপ ভবন। ছবি: সংগৃহীত
তেহরানে এখন আর প্রতিদিন বোমার শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ স্বস্তিতে আছে। যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে—এই ভয় আর স্থায়ী শান্তির ক্ষীণ আশা, এই দুইয়ের মাঝে আটকে পড়ে তেহরানের মানুষ প্রতিদিন এক ধরনের অদৃশ্য চাপ নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের জীবন এক অদ্ভুত বাস্তবতায়—না পুরোপুরি যুদ্ধ, না পুরোপুরি শান্তি।
পূর্ব তেহরানের এক এলাকায় বাবার পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কুড়ি বছরের তরুণ সাজ্জাদকে। তাদের সেই বাড়ি এখন ভাঙা লোহা, গুঁড়িয়ে যাওয়া কংক্রিট আর ধ্বংসস্তূপ। বোমা হামলার পর থেকে জায়গাটি সেভাবেই পড়ে আছে। কেউ হাত দেয়নি।
চোখে হতাশা নিয়ে সাজ্জাদ বলে, ‘এগুলো আবার কে গড়ে তুলবে?’
এই প্রশ্ন শুধু তার নিজের নয়—পুরো শহরের অনেক মানুষের মনের কথা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আপাতত আকাশপথের হামলা থামিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে, সেই কূটনীতির অংশ হিসাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদ, মাস্কাট ও মস্কো সফর করছেন। তবুও তেহরানের রাস্তায় যে নীরবতা, তা শান্তির নয়, বরং ঝড়ের আগের বিরতি বলেই মনে হয়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে থমকে থাকা সময়
শহরের একেক জায়গায় একেক রকম দৃশ্য। কোথাও শ্রমিকরা ভাঙা জানালা মেরামত করছে, দেয়ালের ফাটল সারাচ্ছে। আবার কোথাও পুরো এলাকা এমনভাবে ধ্বংস হয়ে আছে, কেউ আর সেখানে ফেরার সাহস পায় না।
৩৯ বছর বয়সী স্থপতি মোহাম্মদ বলেন, এখন একটি বাড়ি বানানোর খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে নৌ-অবরোধের কারণে দেশের মুদ্রার মান কমে গেছে। ইস্পাতসহ নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে। যুদ্ধের আগেই নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি দুর্বল ছিল, এখন পরিস্থিতি আরও কঠিন।
অনেকের হাতে কিছু টাকা থাকলেও তারা নতুন করে বাড়ি বানাতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়? তাহলে সবকিছু আবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
সাজ্জাদেরও একই কথা, ‘আজ যদি কিছু তৈরি করি, কাল আবার সেটা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’
৫২ বছর বয়সী মরিয়মের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কাছে তার বাড়ি প্রথম দফার হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। শুরুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি হোটেলে আশ্রয় পেলেও এখন তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছে। সরকারি ঋণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা তার প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
মরিয়মের হতাশাগ্রস্থ কণ্ঠে, ‘যে ছোট অ্যাপার্টমেন্টের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের স্মৃতি নেই, আর আমাদের চাহিদাও পূরণ হবে না। কীভাবে মানিয়ে নেব, বুঝতে পারছি না।’
বাজারে ভিড়, কিন্তু নিশ্চিন্ততা নেই
পশ্চিম তেহরানের নাভভাব সাফাভি এলাকায় এখন বেশ ভিড়। মানুষ বাজারে যাচ্ছে, কেনাকাটা করছে—যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।
কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অস্থিরতা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মী আশকবুস বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণের কারণে বড় ধরনের খাদ্য সংকট এখনো দেখা যায়নি। কিন্তু অন্য জিনিসের দাম প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, মাংস, ওষুধ ও নির্মাণসামগ্রী। এতে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে অবরোধের কারণে পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে গেছে। এই সমস্যা এড়াতে ইরান বিভিন্ন বিকল্প পথ ব্যবহার করছে, যেমন স্থলপথ বা গোপন নৌপথ। কিন্তু তাতেও পুরো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
৭১ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ফেরেদুন বলেন, পণ্য আনতে এখন অনেক সময় লাগে, খরচও অনেক বেড়েছে। ফলে গ্রাহকেরা কম দামের, কিন্তু নিম্নমানের জিনিস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কীভাবে নতুন পণ্য আনব, যদি না-ই জানি কাল কী হবে? যুদ্ধ শুরু হবে, নাকি নৌ-অবরোধ আরও বাড়বে?’
তার মতে, এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যেই তাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
দুই দিকের টানাপোড়েনে মানুষ
তেহরানের ৪৭ বছর বয়সী বাসিন্দা ইউসরা এই পরিস্থিতিকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমি যেন দুই দেয়ালের মাঝে আটকে আছি।’
একদিকে যুদ্ধের ভয়, অন্যদিকে স্থায়ী শান্তির আশা—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তেহরানের মানুষ।
তাদের প্রতিদিনের জীবন চলছে, কিন্তু বুকের ভেতর হারানোর বেদনা।
এই সময়টা তাই এক অদ্ভুত বাস্তবতা—যেখানে বোমা নেই, কিন্তু ভয় আছে; জীবন চলছে, কিন্তু স্থিরতা নেই।
এটি না যুদ্ধ, না শান্তি। বরং এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ের সময়।
সূত্র: আল জাজিরা
/এমআর/




