শিরোনাম

যক্ষ্মার উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ

যক্ষ্মার উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ
গ্রাফিক্স: সিটিজেন জার্নাল

যক্ষ্মার উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। কারণ দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এই রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে। এ ছাড়া তহবিল সংকটের কারণে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই রোগের প্রকোপ আছে বিশ্বের এমন ৩০টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অবস্থান সপ্তম। এসব বিষয়কে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০২২ সালে দেশে দুই লাখ ৬১ হাজার ৯৫৭ জন, ২০২৩ সালে তিন লাখ দুই হাজার ৮১৩ জন, ২০২৪ সালে তিন লাখ ১৪ হাজার ১৮০ জন এবং ২০২৫ সালে তিন লাখ ২২ হাজার ৩১৪ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা (অপারেশনাল প্ল্যান) বাস্তবায়নে ১৬৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব খাত থেকে ৪৫৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনার (ডিপিপি) অধীনে দুই হাজার ১০৮ কোটি ২০ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষার প্রকোপ ৯০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৬৪৯টি সরকারি হাসপাতালে যক্ষা রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

যক্ষ্মার চিকিৎসায় চ্যালেঞ্জ

দেশে যক্ষ্মা চিকিৎসায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে রোগ নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় জনবল সংকট, কর্মপরিকল্পনা বন্ধ থাকা, দাতাদের অর্থায়নে নিয়োগ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি জনবলকাঠামোতে যুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া এবং জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনায় ৪০ শতাংশ অর্থের ঘাটতি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যক্ষ্মা নির্মূলের কৌশল অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ এবং ২০৩৫ সালের এই রোগের প্রকোপ ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে বেশকিছু উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে দ্রুত রোগ নির্ণয় পরীক্ষার পরিধি আরও বাড়ানো, যক্ষ্মা প্রতিরোধের চিকিৎসা বা যক্ষ্মা সংক্রমণের চিকিৎসা জোরদার এবং যক্ষ্মা আক্রান্ত পরিবারগুলোতে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন সিটিজেন জার্নালকে বলেন, দেশে অত্যাধুনিক রোগনির্ণয় মেশিন থাকায় যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী সহজে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা জনবল ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বাজেট বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো শিশুদের শনাক্তকরণের নিম্নমুখী হার। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে শনাক্ত হওয়া মোট রোগীর মাত্র ৬ শতাংশ ছিল শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মায় আক্রান্ত শিশুদের শনাক্ত করা এমনিতেই কঠিন। এ কারণে যক্ষ্মায় আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া যায় না।

যক্ষ্মারোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যক্ষ্মা রোগের মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে। ২০১৫ সালে খোনে প্রতি লাখে ৫৪ জন লোক মারা গিয়েছিল সেখানে ২০২৪ সালে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি লাখে কমে দাঁড়ায় ২৪ জনে।

বাংলাদেশের যক্ষ্মা আক্রান্ত পরিবারগুলো উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। পুষ্টিহীনতা, ধূমপান, ডায়াবেটিস এবং অ্যালকোহল সেবন যক্ষ্মার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এগুলোর মধ্যে পুষ্টিহীনতার কারণে মানুষ সবচেয়ে বেশি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়।

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রনে যুক্ত ইউএসএআইডি, আইসিডিডিআরবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ৩১ শতাংশ যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী চিকিৎসা না পাওয়ায় তারা যেমন নিজেরা ঝুঁকিতে আছেন, তেমনি তাদের মাধ্যমে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. কামরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, যক্ষা নির্মূলে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে । এখন অধ্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় হচ্ছে। এ কারণে শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে।

/বিবি/