ক্ষমতার আড়ালে বেনজীরের পাহাড়সম দুর্নীতির খতিয়ান

ক্ষমতার আড়ালে বেনজীরের পাহাড়সম দুর্নীতির খতিয়ান
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

আইনের জালে ধরা পড়লেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুই মামলায় আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি রবিবার (১৪ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদক দায়ের করা পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় গত বছর রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সংস্থাটির ইতিহাসে রেড নোটিশের মাধ্যমে কোনো আসামি গ্রেপ্তারের ঘটনা এটিই প্রথম।
রবিবার বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বেনজীর আহমেদের আটক বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
আকতারুল ইসলাম বলেন, দুবাইয়ে আটক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহায়তায় সরকার দেশে ফিরিয়ে আনবে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলকে চিঠি দেয় দুদক। চিঠিটিতে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলা দেখানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারপোল। এর এক বছর পর গত ১২ জুন বেনজীরকে আটকের কথা সরকারকে জানায় দুবাই কর্তৃপক্ষ।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অত্যন্ত প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বেনজীর আহমেদ। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগে ৬টি মামলা করে দুদক। এর একটি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বেনজীরের বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলায় বলা হয়, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরিচয় গোপন করে ‘নীল’ বা ‘লাল’ পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগেই দেশ ছাড়েন দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ থাকা সাবেক এই আইজিপি। ২০২৫ সালে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা মামলায় ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেনজীর আহমেদের বিপুল স্থাবর সম্পদের খোঁজ মেলে। তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা রয়েছে। দেশে থাকা এসব সম্পদ আদালতের নির্দেশে এরইমধ্যে জব্দ করেছে দুদক।
এর আগে বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক এই আইজিপির গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এসময় সংসদ অধিবেশন চলছিল।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেনজীর আহমেদের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি দেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেন।
আদালতের আদেশের পর ওই বছরের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়। তবে কৌশলগত কারণে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় তার ছবি ও তথ্য হাইড (লুকিয়ে) করে রাখা হয়েছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যে ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছিল, বেনজীর আহমেদ ছিলেন তাদেরই একজন। তবে অন্য সবার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলেও বেনজীরের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির।
ক্ষমতার আড়ালে সম্পদের পাহাড়
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্য উদঘাটন করেছে দুদক।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক ৪টি মামলা করা হয়। মামলায় এই পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে তাদের পরিবারের প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অকাট্য প্রমাণ মেলে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেনজীর ও তার পরিবারের নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। শুধু দেশেই নয়, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশেও পাচার করেছেন তিনি। দুবাইয়ে তার পরিবারের মালিকানাধীন ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশও দিয়েছিলেন দেশের আদালত।
উল্লেখ্য, দুর্নীতির এই অভিযোগ উন্মোচনের আগেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। আদালতে এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে দুর্নীতি ও অর্থপাচারবিরোধী আইনের আওতায় সাবেক এই আইজিপিকে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

আইনের জালে ধরা পড়লেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুই মামলায় আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি রবিবার (১৪ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদক দায়ের করা পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় গত বছর রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সংস্থাটির ইতিহাসে রেড নোটিশের মাধ্যমে কোনো আসামি গ্রেপ্তারের ঘটনা এটিই প্রথম।
রবিবার বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বেনজীর আহমেদের আটক বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
আকতারুল ইসলাম বলেন, দুবাইয়ে আটক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহায়তায় সরকার দেশে ফিরিয়ে আনবে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলকে চিঠি দেয় দুদক। চিঠিটিতে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলা দেখানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারপোল। এর এক বছর পর গত ১২ জুন বেনজীরকে আটকের কথা সরকারকে জানায় দুবাই কর্তৃপক্ষ।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অত্যন্ত প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বেনজীর আহমেদ। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগে ৬টি মামলা করে দুদক। এর একটি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বেনজীরের বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলায় বলা হয়, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরিচয় গোপন করে ‘নীল’ বা ‘লাল’ পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগেই দেশ ছাড়েন দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ থাকা সাবেক এই আইজিপি। ২০২৫ সালে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা মামলায় ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেনজীর আহমেদের বিপুল স্থাবর সম্পদের খোঁজ মেলে। তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা রয়েছে। দেশে থাকা এসব সম্পদ আদালতের নির্দেশে এরইমধ্যে জব্দ করেছে দুদক।
এর আগে বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক এই আইজিপির গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এসময় সংসদ অধিবেশন চলছিল।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেনজীর আহমেদের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি দেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেন।
আদালতের আদেশের পর ওই বছরের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়। তবে কৌশলগত কারণে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় তার ছবি ও তথ্য হাইড (লুকিয়ে) করে রাখা হয়েছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যে ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছিল, বেনজীর আহমেদ ছিলেন তাদেরই একজন। তবে অন্য সবার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলেও বেনজীরের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির।
ক্ষমতার আড়ালে সম্পদের পাহাড়
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্য উদঘাটন করেছে দুদক।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক ৪টি মামলা করা হয়। মামলায় এই পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে তাদের পরিবারের প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অকাট্য প্রমাণ মেলে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেনজীর ও তার পরিবারের নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। শুধু দেশেই নয়, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশেও পাচার করেছেন তিনি। দুবাইয়ে তার পরিবারের মালিকানাধীন ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশও দিয়েছিলেন দেশের আদালত।
উল্লেখ্য, দুর্নীতির এই অভিযোগ উন্মোচনের আগেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। আদালতে এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে দুর্নীতি ও অর্থপাচারবিরোধী আইনের আওতায় সাবেক এই আইজিপিকে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

ক্ষমতার আড়ালে বেনজীরের পাহাড়সম দুর্নীতির খতিয়ান
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

আইনের জালে ধরা পড়লেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুই মামলায় আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি রবিবার (১৪ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদক দায়ের করা পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় গত বছর রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সংস্থাটির ইতিহাসে রেড নোটিশের মাধ্যমে কোনো আসামি গ্রেপ্তারের ঘটনা এটিই প্রথম।
রবিবার বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বেনজীর আহমেদের আটক বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
আকতারুল ইসলাম বলেন, দুবাইয়ে আটক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহায়তায় সরকার দেশে ফিরিয়ে আনবে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলকে চিঠি দেয় দুদক। চিঠিটিতে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলা দেখানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারপোল। এর এক বছর পর গত ১২ জুন বেনজীরকে আটকের কথা সরকারকে জানায় দুবাই কর্তৃপক্ষ।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অত্যন্ত প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন বেনজীর আহমেদ। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগে ৬টি মামলা করে দুদক। এর একটি পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বেনজীরের বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলায় বলা হয়, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরিচয় গোপন করে ‘নীল’ বা ‘লাল’ পাসপোর্ট গ্রহণ করেননি। বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরি করেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগেই দেশ ছাড়েন দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ থাকা সাবেক এই আইজিপি। ২০২৫ সালে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা মামলায় ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেনজীর আহমেদের বিপুল স্থাবর সম্পদের খোঁজ মেলে। তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা রয়েছে। দেশে থাকা এসব সম্পদ আদালতের নির্দেশে এরইমধ্যে জব্দ করেছে দুদক।
এর আগে বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক এই আইজিপির গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এসময় সংসদ অধিবেশন চলছিল।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেনজীর আহমেদের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি দেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেন।
আদালতের আদেশের পর ওই বছরের এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়। তবে কৌশলগত কারণে ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় তার ছবি ও তথ্য হাইড (লুকিয়ে) করে রাখা হয়েছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ যে ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছিল, বেনজীর আহমেদ ছিলেন তাদেরই একজন। তবে অন্য সবার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলেও বেনজীরের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির।
ক্ষমতার আড়ালে সম্পদের পাহাড়
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের পুলিশ প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্য উদঘাটন করেছে দুদক।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক ৪টি মামলা করা হয়। মামলায় এই পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগ আনা হয়। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে তাদের পরিবারের প্রায় ৪৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের অকাট্য প্রমাণ মেলে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেনজীর ও তার পরিবারের নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। শুধু দেশেই নয়, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশেও পাচার করেছেন তিনি। দুবাইয়ে তার পরিবারের মালিকানাধীন ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশও দিয়েছিলেন দেশের আদালত।
উল্লেখ্য, দুর্নীতির এই অভিযোগ উন্মোচনের আগেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। আদালতে এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে দুর্নীতি ও অর্থপাচারবিরোধী আইনের আওতায় সাবেক এই আইজিপিকে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার
