রক্তশূন্য ব্যাংক খাতের কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা

রক্তশূন্য ব্যাংক খাতের কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা
মরিয়ম সেঁজুতি

ব্যাংক খাতে তৈরি হয়েছে খেলাপি ঋণের ধূ ধূ বালুচর, আর যার তলানিতে জমেছে তারল্য সংকটের হাহাকার—সেই শুকিয়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের ওপরই এবার চাপতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের মহাসমুদ্র সেঁচার গুরুভার।
আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র টানাপোড়েন আর মূল্যস্ফীতির দাহে দগ্ধ সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা আশার আলো জাগালেও, তার পেছনেই ঘনীভূত হচ্ছে এক বিশাল ঘাটতির কালোমেঘ।
দেশের ব্যাংকিং খাত যখন ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক ও রক্তশূন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই সরকার নিজের ঘাটতি মেটাতে এই খাত থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার এক মহানির্দয় পরিকল্পনা আঁটছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব হলেও বর্তমানে সেই খাতেই বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। শুল্ক ও কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় ব্যয় মেটাতে বিকল্প উৎস হিসেবে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহে সরকারের ধারাবাহিক অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মনে এখন সংশয়— সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যাংক-নির্ভরতা কী দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে, যার নির্মম আঘাতে থমকে যাবে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চাকা?
মেগা বাজেটের আড়ালে বিশাল ঘাটতির খতিয়ান
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের প্রথম এই বাজেটের সম্ভাব্য অবয়ব ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল খরচের বিপরীতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে কেবল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেই (এনবিআর) আহরণ করতে হবে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বোঝা।
ফলে হিসাবের খাতায় আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি এসে দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ঘাটতির শেষ সীমানা পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
এই বিপজ্জনক ঘাটতির মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের চড়া নির্ভরশীলতার ভেলায় ভাসতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছর জুড়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি।
এছাড়া ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যার বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পেছনেই চলে যাবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। পুরো অর্থবছরের জন্য বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সরকারের ঋণ গ্রহণ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে।
ঋণের সুদের অনুৎপাদনশীল বোঝা ও নির্বাচনি ইশতেহার
বাজেটের ওপর সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল পাথর হয়ে চেপে বসেছে অতীতের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের দায়। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে শুধু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারের কোষাগার থেকে উবে যাবে রেকর্ড ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, এবারের বাজেটের ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের চার ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিতে—যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। শুধু নারীপ্রধান ৪১ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ দেওয়ার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ স্কিমেই প্রথম বছর প্রায় ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও ধরা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
কঙ্কালসার ব্যাংকিং খাত ও আস্থার সংকট
যে ব্যাংকিং খাতের জীর্ণ কাঁধে ভর করে সরকার এই অর্থনৈতিক বৈতরণি পার হতে চাইছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে তার ভেতরের কঙ্কালসার রূপটিই উন্মোচিত হয়েছে। পুনঃতফসিলসহ নানা নীতিগত ছাড়ের প্রলেপ দিয়েও লাগাম টানা যাচ্ছে না খেলাপি ঋণের ক্ষতের।
২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যার ফলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ ব্যাংকের বিতরণ করা প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকাই এখন খেলাপি বা ঝুঁকিপূর্ণ।
খেলাপি ঋণের এই সুনামীর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে। সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে।
বেশ কিছু ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতেই হিমশিম খাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতিদিন বিশেষ তারল্য সহায়তা (রেপো) নিয়ে কোনোমতে দৈনন্দিন লেনদেনের শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখছে। দেশের পুঁজিবাজারেও দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে বেশ কিছু ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের খরা ও কর্মসংস্থানের সংকট
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যখন বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে, তখন ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যবসায়ী বা বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কারণ সরকারি ঋণে কোনো ঝুঁকি থাকে না এবং সুদের হারও চড়া।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা আশঙ্কা করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে এমনিতেই ঋণের সুদের হার চড়া। তার ওপর এই তহবিলের অভাব যুক্ত হলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে।
নতুন বিনিয়োগ না হলে শিল্পায়নের গতি থমকে যাবে, বন্ধ হয়ে যেতে পারে বহু উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান। এর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসবে কর্মসংস্থানের ওপর। প্রতি বছর শ্রমবাজারে যে লাখ লাখ কর্মক্ষম তরুণ যুক্ত হচ্ছে, তাদের চাকরি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হবেন।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করলেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এই ঋণ সংকোচন এবং জ্বালানি সংকটের কারণে প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি হবে না।
উত্তরণের পথ: প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা সংস্থা সিপিডি ও পিআরআই-এর অর্থনীতিবিদরা সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, কর অব্যাহতি ও কর রেয়ত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট লবিং এবং বিভিন্ন ক্ষমতা কেন্দিক স্বার্থও ভূমিকা রাখে।
তিনি মনে করেন, বাজেট এমনভাবে তৈরি করা উচিত যা একদিকে চলমান অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। শুধু বাজেট বড় করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর বাস্তবায়ন সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ব্যাংক খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে সরকারের উচিত হবে কর আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সংস্কার আনা।
নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে কর ফাঁকি রোধ করা এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোই এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র টেকসই সমাধান। রক্তশূন্য ব্যাংকিং খাতকে ঢাল বানিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণের এই আত্মঘাতী নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকঋণের বিকল্প উৎস বাড়াতে সরকারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে এবং বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার মাধ্যমে সরকারের নিজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি কমাতে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংক খাতে তৈরি হয়েছে খেলাপি ঋণের ধূ ধূ বালুচর, আর যার তলানিতে জমেছে তারল্য সংকটের হাহাকার—সেই শুকিয়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের ওপরই এবার চাপতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের মহাসমুদ্র সেঁচার গুরুভার।
আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র টানাপোড়েন আর মূল্যস্ফীতির দাহে দগ্ধ সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা আশার আলো জাগালেও, তার পেছনেই ঘনীভূত হচ্ছে এক বিশাল ঘাটতির কালোমেঘ।
দেশের ব্যাংকিং খাত যখন ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক ও রক্তশূন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই সরকার নিজের ঘাটতি মেটাতে এই খাত থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার এক মহানির্দয় পরিকল্পনা আঁটছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব হলেও বর্তমানে সেই খাতেই বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। শুল্ক ও কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় ব্যয় মেটাতে বিকল্প উৎস হিসেবে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহে সরকারের ধারাবাহিক অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মনে এখন সংশয়— সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যাংক-নির্ভরতা কী দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে, যার নির্মম আঘাতে থমকে যাবে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চাকা?
মেগা বাজেটের আড়ালে বিশাল ঘাটতির খতিয়ান
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের প্রথম এই বাজেটের সম্ভাব্য অবয়ব ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল খরচের বিপরীতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে কেবল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেই (এনবিআর) আহরণ করতে হবে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বোঝা।
ফলে হিসাবের খাতায় আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি এসে দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ঘাটতির শেষ সীমানা পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
এই বিপজ্জনক ঘাটতির মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের চড়া নির্ভরশীলতার ভেলায় ভাসতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছর জুড়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি।
এছাড়া ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যার বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পেছনেই চলে যাবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। পুরো অর্থবছরের জন্য বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সরকারের ঋণ গ্রহণ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে।
ঋণের সুদের অনুৎপাদনশীল বোঝা ও নির্বাচনি ইশতেহার
বাজেটের ওপর সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল পাথর হয়ে চেপে বসেছে অতীতের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের দায়। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে শুধু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারের কোষাগার থেকে উবে যাবে রেকর্ড ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, এবারের বাজেটের ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের চার ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিতে—যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। শুধু নারীপ্রধান ৪১ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ দেওয়ার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ স্কিমেই প্রথম বছর প্রায় ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও ধরা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
কঙ্কালসার ব্যাংকিং খাত ও আস্থার সংকট
যে ব্যাংকিং খাতের জীর্ণ কাঁধে ভর করে সরকার এই অর্থনৈতিক বৈতরণি পার হতে চাইছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে তার ভেতরের কঙ্কালসার রূপটিই উন্মোচিত হয়েছে। পুনঃতফসিলসহ নানা নীতিগত ছাড়ের প্রলেপ দিয়েও লাগাম টানা যাচ্ছে না খেলাপি ঋণের ক্ষতের।
২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যার ফলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ ব্যাংকের বিতরণ করা প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকাই এখন খেলাপি বা ঝুঁকিপূর্ণ।
খেলাপি ঋণের এই সুনামীর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে। সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে।
বেশ কিছু ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতেই হিমশিম খাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতিদিন বিশেষ তারল্য সহায়তা (রেপো) নিয়ে কোনোমতে দৈনন্দিন লেনদেনের শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখছে। দেশের পুঁজিবাজারেও দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে বেশ কিছু ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের খরা ও কর্মসংস্থানের সংকট
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যখন বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে, তখন ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যবসায়ী বা বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কারণ সরকারি ঋণে কোনো ঝুঁকি থাকে না এবং সুদের হারও চড়া।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা আশঙ্কা করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে এমনিতেই ঋণের সুদের হার চড়া। তার ওপর এই তহবিলের অভাব যুক্ত হলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে।
নতুন বিনিয়োগ না হলে শিল্পায়নের গতি থমকে যাবে, বন্ধ হয়ে যেতে পারে বহু উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান। এর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসবে কর্মসংস্থানের ওপর। প্রতি বছর শ্রমবাজারে যে লাখ লাখ কর্মক্ষম তরুণ যুক্ত হচ্ছে, তাদের চাকরি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হবেন।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করলেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এই ঋণ সংকোচন এবং জ্বালানি সংকটের কারণে প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি হবে না।
উত্তরণের পথ: প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা সংস্থা সিপিডি ও পিআরআই-এর অর্থনীতিবিদরা সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, কর অব্যাহতি ও কর রেয়ত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট লবিং এবং বিভিন্ন ক্ষমতা কেন্দিক স্বার্থও ভূমিকা রাখে।
তিনি মনে করেন, বাজেট এমনভাবে তৈরি করা উচিত যা একদিকে চলমান অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। শুধু বাজেট বড় করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর বাস্তবায়ন সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ব্যাংক খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে সরকারের উচিত হবে কর আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সংস্কার আনা।
নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে কর ফাঁকি রোধ করা এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোই এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র টেকসই সমাধান। রক্তশূন্য ব্যাংকিং খাতকে ঢাল বানিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণের এই আত্মঘাতী নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকঋণের বিকল্প উৎস বাড়াতে সরকারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে এবং বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার মাধ্যমে সরকারের নিজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি কমাতে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রক্তশূন্য ব্যাংক খাতের কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা
মরিয়ম সেঁজুতি

ব্যাংক খাতে তৈরি হয়েছে খেলাপি ঋণের ধূ ধূ বালুচর, আর যার তলানিতে জমেছে তারল্য সংকটের হাহাকার—সেই শুকিয়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের ওপরই এবার চাপতে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের মহাসমুদ্র সেঁচার গুরুভার।
আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র টানাপোড়েন আর মূল্যস্ফীতির দাহে দগ্ধ সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা আশার আলো জাগালেও, তার পেছনেই ঘনীভূত হচ্ছে এক বিশাল ঘাটতির কালোমেঘ।
দেশের ব্যাংকিং খাত যখন ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক ও রক্তশূন্য অবস্থায় দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই সরকার নিজের ঘাটতি মেটাতে এই খাত থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার এক মহানির্দয় পরিকল্পনা আঁটছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব হলেও বর্তমানে সেই খাতেই বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। শুল্ক ও কর আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় ব্যয় মেটাতে বিকল্প উৎস হিসেবে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্বাহে সরকারের ধারাবাহিক অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মনে এখন সংশয়— সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যাংক-নির্ভরতা কী দেশের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে, যার নির্মম আঘাতে থমকে যাবে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চাকা?
মেগা বাজেটের আড়ালে বিশাল ঘাটতির খতিয়ান
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের প্রথম এই বাজেটের সম্ভাব্য অবয়ব ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল খরচের বিপরীতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে কেবল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেই (এনবিআর) আহরণ করতে হবে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বোঝা।
ফলে হিসাবের খাতায় আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি এসে দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ঘাটতির শেষ সীমানা পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
এই বিপজ্জনক ঘাটতির মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের চড়া নির্ভরশীলতার ভেলায় ভাসতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছর জুড়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি।
এছাড়া ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যার বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পেছনেই চলে যাবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। পুরো অর্থবছরের জন্য বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সরকারের ঋণ গ্রহণ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে।
ঋণের সুদের অনুৎপাদনশীল বোঝা ও নির্বাচনি ইশতেহার
বাজেটের ওপর সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল পাথর হয়ে চেপে বসেছে অতীতের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের দায়। অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে শুধু অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারের কোষাগার থেকে উবে যাবে রেকর্ড ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, এবারের বাজেটের ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের চার ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিতে—যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। শুধু নারীপ্রধান ৪১ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ দেওয়ার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ স্কিমেই প্রথম বছর প্রায় ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও ধরা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
কঙ্কালসার ব্যাংকিং খাত ও আস্থার সংকট
যে ব্যাংকিং খাতের জীর্ণ কাঁধে ভর করে সরকার এই অর্থনৈতিক বৈতরণি পার হতে চাইছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে তার ভেতরের কঙ্কালসার রূপটিই উন্মোচিত হয়েছে। পুনঃতফসিলসহ নানা নীতিগত ছাড়ের প্রলেপ দিয়েও লাগাম টানা যাচ্ছে না খেলাপি ঋণের ক্ষতের।
২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, যার ফলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ— অর্থাৎ ব্যাংকের বিতরণ করা প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকাই এখন খেলাপি বা ঝুঁকিপূর্ণ।
খেলাপি ঋণের এই সুনামীর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে। সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে।
বেশ কিছু ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতেই হিমশিম খাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতিদিন বিশেষ তারল্য সহায়তা (রেপো) নিয়ে কোনোমতে দৈনন্দিন লেনদেনের শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখছে। দেশের পুঁজিবাজারেও দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে বেশ কিছু ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের খরা ও কর্মসংস্থানের সংকট
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যখন বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা ধার করে, তখন ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যবসায়ী বা বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কারণ সরকারি ঋণে কোনো ঝুঁকি থাকে না এবং সুদের হারও চড়া।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা আশঙ্কা করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে এমনিতেই ঋণের সুদের হার চড়া। তার ওপর এই তহবিলের অভাব যুক্ত হলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে।
নতুন বিনিয়োগ না হলে শিল্পায়নের গতি থমকে যাবে, বন্ধ হয়ে যেতে পারে বহু উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান। এর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসবে কর্মসংস্থানের ওপর। প্রতি বছর শ্রমবাজারে যে লাখ লাখ কর্মক্ষম তরুণ যুক্ত হচ্ছে, তাদের চাকরি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতের ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হবেন।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করলেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এই ঋণ সংকোচন এবং জ্বালানি সংকটের কারণে প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি হবে না।
উত্তরণের পথ: প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা সংস্থা সিপিডি ও পিআরআই-এর অর্থনীতিবিদরা সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, কর অব্যাহতি ও কর রেয়ত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট লবিং এবং বিভিন্ন ক্ষমতা কেন্দিক স্বার্থও ভূমিকা রাখে।
তিনি মনে করেন, বাজেট এমনভাবে তৈরি করা উচিত যা একদিকে চলমান অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। শুধু বাজেট বড় করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর বাস্তবায়ন সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ব্যাংক খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে সরকারের উচিত হবে কর আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সংস্কার আনা।
নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে কর ফাঁকি রোধ করা এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোই এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র টেকসই সমাধান। রক্তশূন্য ব্যাংকিং খাতকে ঢাল বানিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণের এই আত্মঘাতী নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকঋণের বিকল্প উৎস বাড়াতে সরকারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এতে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমবে এবং বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সুযোগ পাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার মাধ্যমে সরকারের নিজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তার মতে, একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি কমাতে সুশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।




