শিরোনাম

বাজেট নিয়ে ঢাবি ছাত্রনেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ঢাবি সংবাদদাতা
ঢাবি সংবাদদাতা
বাজেট নিয়ে ঢাবি ছাত্রনেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
(উপরের বাম পাশ থেকে) মনোয়ার হোসেন প্রান্ত, সাজ্জাদ হোসাইন খান, মাজহারুল ইসলাম, মুহাম্মদ মোস্তাকিম, মো: হারুন অর রশীদ, মেফতাহুল হোসেন আল মারুফ ও আব্দুল্লাহ আল মাসুম

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রনেতা ও প্রতিনিধিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ করায় অনেকেই একে ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে গবেষণায় অপ্রতুল বরাদ্দ, বাজেটের সিংহভাগ বেতন-ভাতা ও ভৌত অবকাঠামোতে ব্যয় হওয়া, দলীয়করণ এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন নিয়ে তারা বেশ কিছু উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

মাস্টারদা’ সূর্যসেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত এই বাজেটকে সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রণীত এই বাজেটে জনকল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ক্রয়ক্ষমতার নাগালে রেখে দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্ব দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করাসহ বিদেশে উচ্চশিক্ষায় সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ সৃষ্টি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দকে আশাব্যঞ্জক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি নিয়ে এই বরাদ্দ অবশ্যই আশাজাগানিয়া। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার শিক্ষা খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল, সেখান থেকে বর্তমান সরকার পরবর্তী বাজেটে এই বরাদ্দ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার, যার প্রতিশ্রুতি বর্তমান সরকারের রয়েছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে উন্নীত হওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, এটিকে তিনি এখনো পর্যাপ্ত মনে করেন না। তিনি বলেন, শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, এটি মানবসম্পদ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সক্ষমতায় বিনিয়োগ। তাই শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে এই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে তা নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণা খাতেও হতাশা প্রকাশ করে তিনি জানান, বর্তমান বিশ্বে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমিয়ে ৯৪৯ কোটি টাকা নির্ধারণের বিষয়টি উদ্বেগের সঙ্গে দেখে তিনি বলেন, এতে দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন সংকট নিরসন ও গবেষণা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মোস্তাকিম জাতীয় বাজেটের কিছু দিকের প্রশংসা করে বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে জিডিপির বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়াটা ইতিবাচক, তবে তা প্রত্যাশার তুলনায় পুরোপুরি পর্যাপ্ত নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশ কিছু জিনিসের ওপর ভ্যাট কমানো এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে কর আদায়ের নতুন পরিকল্পনাকে তিনি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। তবে সরকার ঠিক কতখানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বা বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেটি নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সম্পর্কে তিনি জানান, বাজেটের সিংহভাগই চলে যায় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও বড় প্রজেক্টে এবং গবেষণায় বরাদ্দ মাত্র ১ শতাংশের কাছাকাছি। তাই গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ডাকসুর ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শিক্ষা খাতের বাজেট বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। ২ শতাংশ বরাদ্দকে একটি ইতিবাচক সূচনা বললেও তিনি মনে করেন, বাজেটের একটি বিরাট অংশ ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন, বোনাস এবং নতুন ভবন নির্মাণের মতো ঠিকাদারি প্রকল্পে। ফলে বিশ্বমানের ল্যাব স্থাপন বা শিক্ষা সামগ্রীর মতো গুণগত মানোন্নয়নের জন্য অর্থ থাকে নামমাত্র। তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক বরাদ্দের মান জিডিপির ৫ শতাংশ হলেও আমাদের দেশে মেগা প্রজেক্টের খরচকে ‘গবেষণা ও প্রযুক্তি’ বাজেট হিসেবে দেখিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হয়। এছাড়া বাজেটে ‘ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশন’ বা উদ্ভাবনী স্টার্টআপের জন্য কোনো তহবিল না থাকাটা হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েটের বেকারত্বের কারণ হতে পারে বলে তিনি জানান। আমলারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবলই ‘ব্যয় খাত’ হিসেবে দেখেন, যা অত্যন্ত নেতিবাচক ও হতাশার দিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রস্তাবিত এই বাজেটকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং হল সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক মো: হারুন অর রশীদ। তার মতে, এটি জনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং ভবিষ্যৎমুখী বাজেট, যেখানে চাণক্যের অর্থনৈতিক দর্শনের মিল পাওয়া যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সবুজ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতির মতো খাতগুলোকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সীমিত সম্পদ ও উচ্চ ঋণ চাপের মধ্যেও সরকার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে বলে তিনি সাধুবাদ জানান। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ব্লু-ইকোনমি উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা এবং উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বিদেশি বৃত্তির জন্য ২৩৮ কোটি টাকার প্রস্তাবনা সরকারের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মেফতাহুল হোসেন আল মারুফ প্রস্তাবিত এই বাজেটকে অবাস্তব ও জনআকাঙ্ক্ষা বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অকল্পনীয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্সের বোঝা এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেবে। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা এবং বিগত সরকারের সময়ে পাচারকৃত ও ব্যাংকিং খাত থেকে লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় তিনি এর কড়া সমালোচনা করেন। শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তিনি মনে করেন, দলীয়করণের কারণে এর সুফল পাওয়া যাবে না। যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনিক পদে না বসিয়ে দলীয় বিবেচনায় অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং দলীয়করণের এই বেহাল দশা পুরো খাতের সম্ভাবনাকে ম্লান করে দেবে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (ঢাবি)-এর কর্মী আব্দুল্লাহ আল মাসুম বাজেটকে ‘জনকল্যাণমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বাজেটে দেশীয় পণ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকের জন্য সর্বোচ্চ উপকারী। তবে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে তার মত হলো, পূর্বের চেয়ে বাজেট বাড়ানো হলেও এটি পর্যাপ্ত নয়। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে ২ শতাংশ বা তার কম বরাদ্দ দিয়ে ‘মেধাভিত্তিক’ বা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা। তার মতে, বরাদ্দ সামান্য বাড়লেও তা মূলত অবকাঠামো আর বেতন-ভাতাতেই চলে যায়, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে নয়।

সার্বিকভাবে, ঢাবির ছাত্রনেতারা শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধিকে সাধুবাদ জানালেও তাদের মূল দাবি হলো, বরাদ্দের টাকা যেন কেবল অবকাঠামো বা বেতনেই আটকে না থাকে। বরং তা যেন সরাসরি শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন, মৌলিক গবেষণা এবং যুগোপযোগী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দিকেও তারা জোর দিয়েছেন।

/এমআর/