শিরোনাম

শিক্ষাখাতে রেকর্ড বাজেট: যেভাবে দেখছেন কুবির ছাত্রনেতারা

কুবি সংবাদদাতা
কুবি সংবাদদাতা
শিক্ষাখাতে রেকর্ড বাজেট: যেভাবে দেখছেন কুবির ছাত্রনেতারা
(উপরের বাম পাশ থেকে) নাঈম ভুঁইয়া, মারুফ শেখ, আবছার উদ্দিন ইফতি, মো. হান্নান রহিম, মো. সাইফুল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমান শুভ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার, যা দেশের ইতিহাসে এ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পর বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ছাত্রনেতারা। কেউ একে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসাবে দেখছেন, আবার কেউ বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা, গবেষণা উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। এ বাজেটকে ঘিরে কুবির বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের মতামত তুলে ধরেছেন সিটিজেন জার্নালের কুবি প্রতিনিধি রাফি হোসেন।

কুবি ছাত্রশক্তির সংগঠক নাঈম ভুঁইয়া বলেন, ‘আজ সংসদে নতুন বাজেট পাস হয়েছে। এতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ শতাংশ, যা পূর্বের তুলনায় বেশি। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বেশি অর্থ বরাদ্দ মানেই ভালো শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। শিক্ষকের মানোন্নয়ন, পাঠ্যক্রম সংস্কার এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার এগুলো কতটুকু নিশ্চিত হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। আমরা আগেও দেখেছি, শিক্ষা খাতের বাজেট যথাযথভাবে ব্যবহার না করে অপচয় করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমস্যা আরও গভীর। আমাদের পাঠ্যক্রমের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এদিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনাবাসিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য কোনো আবাসন বৃত্তির ব্যবস্থা নেই। হল ও ক্যান্টিনে কোনো ভর্তুকিও নেই, যা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। আশা করি, এই বাজেটে সরকার শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে এই বাস্তব সমস্যাগুলোর দিকেও দৃষ্টি দেবে।’

কুবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফন্টের সংগঠক মারুফ শেখ বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই আমরা দাবি তুলি শিক্ষাখাতে ৫ ভাগ বরাদ্দ দেওয়ার। কিন্তু আফসোস, দিন বদলায়, সরকার বদলায় কিন্তু শিক্ষাখাতের যে বেহাল দশা তা আর বদলায় না। এবছরও যে বাজেট প্রকাশ হলো তা ফলাও করে বলে বেড়াচ্ছে সর্বোচ্চ বাজেট। এমন ফলাও করা শিরোনাম আমরা আওয়ামী আমলে দেখেছি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম বাজেট শিক্ষাখাতে দেয়, এই তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। আমাদের মৌলিক খাত শিক্ষাখাত, শিক্ষার করুণ পরিস্থিতি আমরা দেখবো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেও।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা গবেষণাগার নাই, পর্যাপ্ত বরাদ্দ নাই, ক্লাসরুম নাই, পর্যাপ্ত গবেষণার সরঞ্জাম নাই। সামান্য গবেষণা করার জন্য ন্যূনতম যতটুকু আয়োজন একটা ক্যাম্পাসে দরকার, ততটুকুই নাই। এ বরাদ্দের দিকে তাকালেই বুঝবো, বাজেটে সবচেয়ে অবহেলিত কোনো খাত থাকলে সেটা শিক্ষাখাত। এ কারণে এটাকে যেভাবে ফলাও করে বলা হচ্ছে যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, তা কেবলই আইওয়াশ এর বাইরে প্রশংসার দাবি রাখে বলে মনে করি না। এ দেশের অসংখ্য শিশু রয়েছে, যারা শিক্ষার সুযোগ পায় না। দিনকে দিন শিক্ষার সরকারীকরণ কমিয়ে বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে, নামে-বেনামে ফি নেওয়া হচ্ছে। নব্য উদারনীতিকরণের দাবি তুলে শিক্ষাকে পণ্যায়িত করা হচ্ছে। আর তাই খেয়াল করলে দেখবো, সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি শিক্ষাখাতে। তাই বরাদ্দ নিয়ে সন্তুষ্টির আলাপ আসে না বরং হতাশার কথা বলতেই হয়।’

কুবি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবছার উদ্দিন ইফতি বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সংকেত। বিদায়ি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার বৃদ্ধি এবং জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেশের ইতিহাসে শিক্ষাখাতে এটি সর্বোচ্চ বিনিয়োগ। তবে সংখ্যার বড়ত্বের পাশাপাশি কিছু প্রশ্নও থেকে যায়। ইউনেস্কো সুপারিশ করে শিক্ষায় জিডিপির কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ শতাংশ বিনিয়োগের কথা। সেই মানদণ্ডে আমরা এখনো পিছিয়ে। তবে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সাহসী পদক্ষেপ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, এই বিশাল বরাদ্দের সুফল পেতে হলে শুধু অর্থ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মোপযোগী শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। শিক্ষার মান উন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে এই বাজেট যদি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি যুগান্তকারী বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত হবে। সামগ্রিকভাবে এই বাজেটকে আমি শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার একটি সাহসী স্বীকৃতি হিসাবে দেখছি। এখন যে বরাদ্দ বাড়ানো হল, জবাবদিহিতা ও তদারকির মাধ্যমে তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শিক্ষার মানোন্নয়নে এ টাকা ব্যয় হয়।

কুবি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক মো. হান্নান রহিম বলেন, শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। তবে শুধু বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অনিয়মিত ক্রয়, অকার্যকর প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব বিপরীত ফল বয়ে আনবে। বড় বাজেট যেন পুকুর চুরি থেকে সাগর চুরির দিকে না নিয়ে যায়, চাই কার্যকর বাস্তবায়ন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত, বাজেট যেন সত্যিকার অর্থে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি শিক্ষিত, দক্ষ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বাস্তব অবদান রাখে।

কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে গত বছরের তুলনায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যা বাজেটের ১৪ শতাংশ এবং জিডিপির ২ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে এই বরাদ্দ ইতিবাচক হলেও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মানোন্নয়নে তা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও সরকার ২ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হিমশিম খাচ্ছে। শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো: বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক জবাবদিহিতা ও তদারকির মাধ্যমে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং ছাড় করা বিষয়ক বিভিন্ন জটিলতার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ অব্যয়িত থাকে। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সরকার যদি সঠিক পরিকল্পনা না করে প্রতিবছর শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই আন্তর্জাতিক মানের করা সম্ভব হবে না বরং এই বরাদ্দ দুর্নীতিবাজদের পকেট ভারি করবে। তাই বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক জবাবদিহিতা, তদারকি এবং যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।’

কুবি শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, ‘২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটকে আমরা শিক্ষাবান্ধব, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে দেখছি। শিক্ষাখাতে গত বছরের তুলনায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও যুগোপযোগী করে তুলবে। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সহায়ক হবে। এ বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর হ্রাস এবং স্বাস্থ্যখাতে ক্যান্সার প্রতিরোধ, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার উদ্যোগ জনকল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

/এমআর/