শিরোনাম

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বেড়াজালে ঝুঁকিতে অর্থনীতি

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বেড়াজালে ঝুঁকিতে অর্থনীতি
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি হয়। তবে এটিকে অসম, অন্যায্য, অযৌক্তিক আখ্যা দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তিকে দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক লেনদেনের একটি দলিল মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে নীতিগত পরাধীনতা এবং একতরফা বাধ্যবাধকতার এমন সব শর্ত, যা বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। চুক্তির অধিকাংশ ধারায় বাংলাদেশের জন্য যেখানে পাহাড়সম শর্তের বোঝা চাপানো হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দেওয়া হয়েছে বিপুল ছাড়।

এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদেরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৩২ পাতার এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি । এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ১৩১টি শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে মাত্র ৬টি শর্ত মানতে হবে। এই চুক্তি নিয়ে দেশে নানা ধরনের সমালোচনা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদেরাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলেছেন। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি। তবে এরই মধ্যে এআরটি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তির বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

এই চুক্তির সবচেয়ে নেতিকবাচক দিক হচ্ছে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা। এতে ১৭৯ বার ‘শ্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করে বাধ্যতামূলক শর্ত আরোপ করা হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এর মধ্যে ১৩১ বারই বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশ শ্যাল’, অর্থাৎ বাংলাদেশকে এই শর্তগুলো মানতেই হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা মাত্র ৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কোনো সমান অংশীদারিত্বের চুক্তি নয়, বরং একপক্ষের ওপর অন্যপক্ষের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।

বাংলাদেশ চাইলে ৯ মের মধ্যে এই চুক্তি বাতিলের জন্য রিভিউ করার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী সিটিজেন জার্নালকে বলেন, সরকার চাইলেই ৯ মের মধ্যে এই চুক্তি রিভিউ করতে পারবে। তাই কালক্ষেপণ না করে বাংলাদেশের সেটাই করা উচিত।

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাজার ধরে রাখা জরুরি বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা অন্যদের সঙ্গে যেভাবে চুক্তি করি, সেভাবে পারস্পরিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করবো।’

চুক্তিতে আমদানির নামে বিশাল খরচের বোঝা

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি এবং বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কেনা বাংলাদেশের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমদানির এই বিশাল অংক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ তৈরি করবে, বিশেষ করে যখন দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে মার্কিন পণ্যের বাজার নিশ্চিত করাই এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হুমকির মুখে সার্বভৌমত্ব

এই চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নীতিতে সরাসরি মার্কিন হস্তক্ষেপের সুযোগ। চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তবে বাংলাদেশকেও সেই দেশের বিরুদ্ধে একই ধরনের অবস্থান নিতে হবে। এ ছাড়া এই চুক্তির কারণে রাশিয়ার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতে সংকটে পড়তে পারে। কারণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করবে, সেই দেশের কাছ থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা জ্বালানি কেনা যাবে না। এটি সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

মান নিয়ন্ত্রণে অন্ধ আনুগত্য

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অধিকার কার্যত হারিয়েছে। এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বা কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) কোনো পণ্যের ছাড়পত্র দিলে বাংলাদেশের পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান (বিএসটিআই) বা ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তা পুনরায় পরীক্ষা ছাড়াই গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। এমনকি মার্কিন গাড়ি বা যন্ত্রাংশ আমদানিতেও বাড়তি কোনো শর্ত আরোপ করা যাবে না। এর ফলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হলেও বাংলাদেশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না।

শ্রম আইন ও ইপিজেড: নতুন চ্যালেঞ্জ

চুক্তি কার্যকর হওয়ার দুই বছরের মধ্যে দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোকে (ইপিজেড) সাধারণ শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে। শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অবাধ স্বাধীনতা এবং ধর্মঘটের ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ইতিবাচক হলেও বাংলাদেশের শিল্প পরিবেশ এবং উৎপাদন ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে, তা নিয়ে পোশাক খাতের মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্যের সার্বভৌমত্ব

এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসারও বেশকিছু শর্তের কারণে বাধাগ্রস্ত হবে। যেমন, মার্কিন কোম্পানিগুলোর ডেটা ব্যবহারের ওপর কর আরোপ করা যাবে না এবং তাদের সোর্স কোড বা প্রযুক্তিগত গোপন তথ্য দাবি করার অধিকার বাংলাদেশের থাকবে না। এর ফলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতি মূলত মার্কিন টেক জায়ান্টদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সমাধানের পথ কী

এই অসম চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চুক্তির ‘টার্মিনেশন ক্লজ’ বা বাতিলের শর্ত ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। ৬০ দিনের আগাম নোটিশ দিয়ে যেকোনো পক্ষ এই চুক্তি বাতিল করতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে এই চুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখা এখন সময়ের দাবি।

/বিবি/