শিরোনাম

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: আটলান্টায় আজ ফকল্যান্ড যুদ্ধ

অমিত কুমার মন্ডল
অমিত কুমার মন্ডল
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: আটলান্টায় আজ ফকল্যান্ড যুদ্ধ
লিওনেল মেসি (বাঁয়ে) ও হ্যারি কেইন (ডানে)। কোলাজ: সিজেডএন টোয়েন্টিফোর

চলমান বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগের দিনই না ফেরার দেশে পাড়ি জমান দেশটির কিংবদন্তি ফুটবলার আন্তোনিও রাতিন, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ফুটবলীয় দ্বৈরথের সূচনালগ্ন। রাতিনের স্মরণে মিসর ম্যাচে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নেমে ছিল পুরো আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। সেদিন এ কিংবদন্তি ছিল মেসিদের বাহুতে, আজ তিনি থাকবেন তাদের হৃদয়ে। আজ যে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড আটলান্টায় আজ ফকল্যান্ড যুদ্ধ  (2)
আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার আন্তেনিও রাতিন

একটি ‘অপমানের’ প্রতিশোধ নিতেই সাবেক অধিনায়ককে স্মরণ করে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা, যেমনটি ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে নেমেছিল তারা। আজ ম্যারাডোনার ভূমিকায় থাকছেন লিওনেল মেসি। আর মেসি এবং তার বাহিনী ভালো করেই জানেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এ ম্যাচ শুধুই আরেকটি ফুটবল ম্যাচ বা শুধুই আরেকটি সেমিফাইনাল নয়। ত্রিফলার মতো এ ম্যাচে লুকিয়ে আছে ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং যুদ্ধের ক্ষত।

২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম এই দ্বৈরথের শেকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে।

সেই আসরে ইংল্যান্ডের মাঠে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয় এবং তৎকালীন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইনের সঙ্গে ভাষা সংক্রান্ত জটিলতায় এক হট্টগোল তৈরি হয়। রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকার করেন এবং ক্ষোভে রাজকীয় কার্পেট মাড়িয়ে মাঠ ত্যাগ করেন।

এর প্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডের ম্যানেজার আলফ রামসে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের ‘পশু’বলে সম্বোধন করেন এবং নিজ খেলোয়াড়দের জার্সি বিনিময় করতে নিষেধ করেন। এই ঘটনাটিই মূলত আধুনিক ফুটবল কার্ড (হলুদ ও লাল কার্ড) প্রবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য হয়।

তবে দুই দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক অবনতি ফুটবল মাঠকেও ছাড়িয়ে যায় ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের মাধ্যমে। দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জটি নিয়ে শুরু হওয়া সেই অঘোষিত যুদ্ধটি ছিল ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত। যেটি শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেন্টাইন সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল লিওপোল্ডো গালতিয়েরির নির্দেশে দ্বীপ দখলের মাধ্যমে।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড আটলান্টায় আজ ফকল্যান্ড যুদ্ধ  (3)
ফকল্যান্ড যুদ্ধে ইংল্যান্ডের সৈন্যরা

এর জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ৮ হাজার মাইল দূর থেকে এক বিশাল টাস্ক ফোর্স পাঠিয়ে দ্বীপ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন । সেই যুদ্ধে ২৮৫ জন ব্রিটিশ এবং ৬৫৯ জন আর্জেন্টাইন সৈন্য প্রাণ হারান এবং অবশেষে ১৪ জুন ১৯৮২ সালে আর্জেন্টাইন বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে । এ পরাজয় আর্জেন্টিনায় সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নতুন গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের স্মৃতি ফুটবল মাঠকে ‘প্রতীকী প্রতিশোধের’ এক উর্বর রণক্ষেত্রে পরিণত করে ।

যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকোর মাঠে যখন দুই দল মুখোমুখি হয়, তখন দিয়েগো ম্যারাডোনা বিতর্ক আর ফুটবল-জাদুর সমন্বয়ে গড়েন অভূতপূর্ব এক ইতিহাস। ম্যাচের ৫১ মিনিটে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল এবং তার মাত্র চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে করা ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ আর্জেন্টিনার কাছে ছিল এক ধরণের জাতীয় মুক্তি।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড আটলান্টায় আজ ফকল্যান্ড যুদ্ধ
ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক হ্যান্ড অব গড গোল

ম্যারাডোনা নিজেও পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, যদিও তারা যুদ্ধের কথা ভুলে খেলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু নিজেরা জানতেন যে তারা ফকল্যান্ডে নিহত সেই আর্জেন্টাইন ছেলেদের হয়েই লড়াই করছেন। এই জয় ছিল সেই যুদ্ধের এক ‘প্রতীকী প্রতিশোধ’। পরবর্তীকালে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড এবং ২০০২ বিশ্বকাপে তারই করা পেনাল্টি গোলের মাধ্যমে সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো এ দ্বৈরথকে আরও উত্তপ্ত ও মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছে।

২০২৬ সালের এই সেমিফাইনালকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আটলান্টা শহর এক উৎসবমুখর কিন্তু সর্বোচ্চ সতর্ক আবহে রয়েছে, যেখানে শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আটলান্টা পুলিশ বিভাগ, এফবিআই এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত কমান্ড গঠন করা হয়েছে। শহরের ট্রানজিট ও হোটেলগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং এআই-চালিত স্ক্রিনিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে বিপুল জনসমাগম সামলানো যায়।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড আটলান্টায় আজ ফকল্যান্ড যুদ্ধ  (4)
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের ছাদ বন্ধযোগ্য হওয়ায় খেলা নির্ধারিত সময়েই শুরু হবে এবং স্টেডিয়ামের ভেতরে তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ন্ত্রিত রাখা হবে। দর্শকদের জন্য স্টেডিয়ামের আশেপাশে রিভার্ব বাই হার্ড রক বা সিগনিয়া বাই হিলটনের মতো পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা থাকলেও ভিড়ের কারণে নিরাপত্তামূলক সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আজকের এই মহারণে সবার নজর থাকবে আধুনিক ফুটবলের মহানায়ক লিওনেল মেসির ওপর। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তিনি। ইতিহাসের পুরোনো স্মৃতি, যুদ্ধের দীর্ঘশ্বাস আর বর্তমানের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই- সব মিলিয়ে আটলান্টার সবুজ গালিচা আজ কার ঘামে নতুন ইতিহাস লেখে, তা দেখতে উন্মুখ বিশ্বজোড়া ফুটবল রোমান্টিকরা।

/এমএকে/