কেউ ভুল করলে রাসুল (সা.) যেভাবে সংশোধন করতেন

কেউ ভুল করলে রাসুল (সা.) যেভাবে সংশোধন করতেন
ধর্ম ডেস্ক

ভুল যেমন রয়েছে, তেমনি সংশোধনেরও সুযোগ রয়েছে। ইসলামে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। কেউ কেউ অন্যের ভুল দেখলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে সংশোধন করে দেওয়ার পরিবর্তে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন। খুব বড় কিংবা জঘন্য কোনো ভুল না, নিত্যনৈমিত্তিক সূচিত হওয়া ছোট ছোট ভুলের ক্ষেত্রেও অনেকে এমনটা করেন। তবে ভুল সংশোধনে প্রিয় নবীজির (সা.) আচরণ ছিল অত্যন্ত হিকমাহ ও আন্তরিকপূর্ণ।
ভুলের সমাধান করা
মহানবী (সা.) ভুলকে সমাধান ছাড়া রেখে দিতেন না। তিনি ব্যক্তির সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে কখনো গোপনে, কখনো সুবিধা মতো সময়ে ভুল সংশোধন করতেন। কখনো তার আচরণই সাহাবিদের বুঝিয়ে দিত কিছু ভুল হয়েছে। গুরুতর ভুলের ক্ষেত্রে জোর দিয়ে বারবার কথা বলতেন।
উসামা ইবন জায়েদ (রা.) একবার একজন শত্রু সৈনিককে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার পরও তার ওপর তরবারি চালিয়ে দেন। এটি শুনে নবীর মুখভঙ্গি বদলে যায়। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করলে, যখন সে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছিল?’ এই পুনরাবৃত্তির কারণে উসামা এতটাই অনুতপ্ত হন যে তিনি বলেন, তার মনে হয়, তিনি আজই মুসলিম হলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪,২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯৬)
সৌজন্য বজায় রাখা
নবীজি সাহাবিদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি ভুল সংশোধনের সময়ও সৌজন্যবোধ হারাতেন না। একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রথমবার প্রবেশ করেন। তিনি উচ্চস্বরে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে ও মুহাম্মদকে ক্ষমা করো, কিন্তু অন্য কাউকে ক্ষমা করো না।’ নবীজি (সা.) হাসেন ও সৌজন্যের সঙ্গে বলেন, ‘তুমি একটি বিশাল জিনিসকে সীমিত করছো।’
সেই লোকই বা অন্য কোনো লোক মসজিদের মেঝেতে প্রস্রাব করেন। নবীজি বিচলিত সাহাবিদের শান্ত করেন এবং লোকটিকে একা ছেড়ে দিতে বলেন। বেদুইন পরে বলেন, ‘আমার মা-বাবা তার জন্য উৎসর্গ হোক। তিনি আমাকে তিরস্কার বা অপমান করেননি।’ তিনি কেবল বলেছেন, ‘এই মসজিদে প্রস্রাব করা যায় না, এটি নামাজ ও আল্লাহর স্মরণের স্থান। তারপর তিনি এক বালতি পানি এনে মেঝেতে ঢেলে দিতে বলেন।’ (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ৫২৯)
কৌশলী হওয়া
নবীজি অগ্রাধিকার বিবেচনা করতেন, সমস্যার সমাধান দিতেন এবং জানতেন কখন কঠোর বা নরম হতে হবে। তিনি বুঝতেন, কখন কেউ ভুলের পরিণতি বহন করতে পারবে। মক্কা বিজয়ের পর আবু মাহজুরা নামের এক কিশোর ও তার বন্ধুরা বিলাল (রা.) এর আজানের সময় তার সঙ্গে ঠাট্টা করে। নবীজি তাকে ডেকে পাঠান। ভয়ে কাঁপতে থাকা কিশোরকে তিনি তিরস্কার করেননি। তিনি তার কণ্ঠ পরখ করেন, আজানের শব্দগুলো তাকে শেখান এবং তার বুকে হাত রেখে দোয়া করেন। আবু মাহজুরা পরে মক্কার মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পান। (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ৭১৫)
অযথা কঠোরতা প্রয়োগ না করা
কখনো কখনো কঠোরতা ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য জরুরি। তিনি জানতেন কখন কঠোর বা নরম হতে হবে। যখন দুজন সাহাবি পরনিন্দা করছিলেন, নবীজি কঠোর শব্দে বলেন, ‘তারা তাদের ভাইয়ের মাংস খেয়েছে, যা তাদের দাতের মাঝে দেখা যাচ্ছে। তারা নবীজির কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি বলেন, তাদের ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪,৮৮০)
আরেকবার তরুণ ফজল ইবন আল-আব্বাস (রা.) নবীজির সঙ্গে সওয়ার ছিলেন। এক সুন্দরী নারী প্রশ্ন করতে এলে ফজল তাকিয়ে থাকেন। নবীজি তার চিবুক ধরে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬,২২৮)
মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা
নবীজি ভুলের সমালোচনা করতেন, ব্যক্তিকে নিন্দা করতেন না। একবার কিছু লোক মদ্যপানে মাতাল এক ব্যক্তিকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন। নবীজি বলেন, ‘তাকে অভিশাপ দিয়ো না। আমি জানি, সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬,৭৮০)
এক যুবক রাতে নামাজ পড়তে অবহেলা করছিলেন। নবীজি তাকে উৎসাহিত করে বলেন, ‘আবদুল্লাহ কত চমৎকার মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত’ এরপর আবদুল্লাহ কখনো রাতের নামাজ ত্যাগ করেননি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২,৪৭০)
দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা
আবু লুবাবা (রা.) বনু কুরাইজার কাছে দূত হিসেবে গিয়ে এমন ভঙ্গি করেন, যা মুসলিমদের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারত। তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন তিনি নবীর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তিনি মসজিদে গিয়ে নিজেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শপথ করেন, আল্লাহ তাকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত তিনি নড়বেন না। অবশেষে তার ক্ষমার আয়াত নাজিল হয়। নবীজি নিজ হাতে তাকে খুলে দেন। (তাফসির ইবন কাসির, সুরা তাওবা, আয়াত : ১০২)
বর্তমান সময়ে দেখা যায়, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস-আদালত ও দোকানের কর্মচারীর ভুলের কারণে মালিক অত্যন্ত কটুবাক্য ব্যবহার করেন এবং ধমক দেন।
এমনটা করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কাউকে সরাসরি আঘাত দিয়ে কথা বললে কিংবা ভুল সংশোধনের উদ্দেশে বললেও মাঝেমধ্যে তা হিতে বিপরীত ঘটে। বরং সংশোধনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে হিকমত ও কোমলতার পরিচয় দেওয়াই উত্তম।
তাই রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ভুলকে সংশোধন করার চেষ্টাতে রয়েছে সাফল্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বোঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ভুল যেমন রয়েছে, তেমনি সংশোধনেরও সুযোগ রয়েছে। ইসলামে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। কেউ কেউ অন্যের ভুল দেখলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে সংশোধন করে দেওয়ার পরিবর্তে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন। খুব বড় কিংবা জঘন্য কোনো ভুল না, নিত্যনৈমিত্তিক সূচিত হওয়া ছোট ছোট ভুলের ক্ষেত্রেও অনেকে এমনটা করেন। তবে ভুল সংশোধনে প্রিয় নবীজির (সা.) আচরণ ছিল অত্যন্ত হিকমাহ ও আন্তরিকপূর্ণ।
ভুলের সমাধান করা
মহানবী (সা.) ভুলকে সমাধান ছাড়া রেখে দিতেন না। তিনি ব্যক্তির সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে কখনো গোপনে, কখনো সুবিধা মতো সময়ে ভুল সংশোধন করতেন। কখনো তার আচরণই সাহাবিদের বুঝিয়ে দিত কিছু ভুল হয়েছে। গুরুতর ভুলের ক্ষেত্রে জোর দিয়ে বারবার কথা বলতেন।
উসামা ইবন জায়েদ (রা.) একবার একজন শত্রু সৈনিককে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার পরও তার ওপর তরবারি চালিয়ে দেন। এটি শুনে নবীর মুখভঙ্গি বদলে যায়। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করলে, যখন সে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছিল?’ এই পুনরাবৃত্তির কারণে উসামা এতটাই অনুতপ্ত হন যে তিনি বলেন, তার মনে হয়, তিনি আজই মুসলিম হলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪,২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯৬)
সৌজন্য বজায় রাখা
নবীজি সাহাবিদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি ভুল সংশোধনের সময়ও সৌজন্যবোধ হারাতেন না। একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রথমবার প্রবেশ করেন। তিনি উচ্চস্বরে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে ও মুহাম্মদকে ক্ষমা করো, কিন্তু অন্য কাউকে ক্ষমা করো না।’ নবীজি (সা.) হাসেন ও সৌজন্যের সঙ্গে বলেন, ‘তুমি একটি বিশাল জিনিসকে সীমিত করছো।’
সেই লোকই বা অন্য কোনো লোক মসজিদের মেঝেতে প্রস্রাব করেন। নবীজি বিচলিত সাহাবিদের শান্ত করেন এবং লোকটিকে একা ছেড়ে দিতে বলেন। বেদুইন পরে বলেন, ‘আমার মা-বাবা তার জন্য উৎসর্গ হোক। তিনি আমাকে তিরস্কার বা অপমান করেননি।’ তিনি কেবল বলেছেন, ‘এই মসজিদে প্রস্রাব করা যায় না, এটি নামাজ ও আল্লাহর স্মরণের স্থান। তারপর তিনি এক বালতি পানি এনে মেঝেতে ঢেলে দিতে বলেন।’ (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ৫২৯)
কৌশলী হওয়া
নবীজি অগ্রাধিকার বিবেচনা করতেন, সমস্যার সমাধান দিতেন এবং জানতেন কখন কঠোর বা নরম হতে হবে। তিনি বুঝতেন, কখন কেউ ভুলের পরিণতি বহন করতে পারবে। মক্কা বিজয়ের পর আবু মাহজুরা নামের এক কিশোর ও তার বন্ধুরা বিলাল (রা.) এর আজানের সময় তার সঙ্গে ঠাট্টা করে। নবীজি তাকে ডেকে পাঠান। ভয়ে কাঁপতে থাকা কিশোরকে তিনি তিরস্কার করেননি। তিনি তার কণ্ঠ পরখ করেন, আজানের শব্দগুলো তাকে শেখান এবং তার বুকে হাত রেখে দোয়া করেন। আবু মাহজুরা পরে মক্কার মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পান। (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ৭১৫)
অযথা কঠোরতা প্রয়োগ না করা
কখনো কখনো কঠোরতা ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য জরুরি। তিনি জানতেন কখন কঠোর বা নরম হতে হবে। যখন দুজন সাহাবি পরনিন্দা করছিলেন, নবীজি কঠোর শব্দে বলেন, ‘তারা তাদের ভাইয়ের মাংস খেয়েছে, যা তাদের দাতের মাঝে দেখা যাচ্ছে। তারা নবীজির কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি বলেন, তাদের ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪,৮৮০)
আরেকবার তরুণ ফজল ইবন আল-আব্বাস (রা.) নবীজির সঙ্গে সওয়ার ছিলেন। এক সুন্দরী নারী প্রশ্ন করতে এলে ফজল তাকিয়ে থাকেন। নবীজি তার চিবুক ধরে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬,২২৮)
মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা
নবীজি ভুলের সমালোচনা করতেন, ব্যক্তিকে নিন্দা করতেন না। একবার কিছু লোক মদ্যপানে মাতাল এক ব্যক্তিকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন। নবীজি বলেন, ‘তাকে অভিশাপ দিয়ো না। আমি জানি, সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬,৭৮০)
এক যুবক রাতে নামাজ পড়তে অবহেলা করছিলেন। নবীজি তাকে উৎসাহিত করে বলেন, ‘আবদুল্লাহ কত চমৎকার মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত’ এরপর আবদুল্লাহ কখনো রাতের নামাজ ত্যাগ করেননি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২,৪৭০)
দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা
আবু লুবাবা (রা.) বনু কুরাইজার কাছে দূত হিসেবে গিয়ে এমন ভঙ্গি করেন, যা মুসলিমদের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারত। তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন তিনি নবীর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তিনি মসজিদে গিয়ে নিজেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শপথ করেন, আল্লাহ তাকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত তিনি নড়বেন না। অবশেষে তার ক্ষমার আয়াত নাজিল হয়। নবীজি নিজ হাতে তাকে খুলে দেন। (তাফসির ইবন কাসির, সুরা তাওবা, আয়াত : ১০২)
বর্তমান সময়ে দেখা যায়, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস-আদালত ও দোকানের কর্মচারীর ভুলের কারণে মালিক অত্যন্ত কটুবাক্য ব্যবহার করেন এবং ধমক দেন।
এমনটা করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কাউকে সরাসরি আঘাত দিয়ে কথা বললে কিংবা ভুল সংশোধনের উদ্দেশে বললেও মাঝেমধ্যে তা হিতে বিপরীত ঘটে। বরং সংশোধনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে হিকমত ও কোমলতার পরিচয় দেওয়াই উত্তম।
তাই রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ভুলকে সংশোধন করার চেষ্টাতে রয়েছে সাফল্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বোঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কেউ ভুল করলে রাসুল (সা.) যেভাবে সংশোধন করতেন
ধর্ম ডেস্ক

ভুল যেমন রয়েছে, তেমনি সংশোধনেরও সুযোগ রয়েছে। ইসলামে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে। কেউ কেউ অন্যের ভুল দেখলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে সংশোধন করে দেওয়ার পরিবর্তে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন। খুব বড় কিংবা জঘন্য কোনো ভুল না, নিত্যনৈমিত্তিক সূচিত হওয়া ছোট ছোট ভুলের ক্ষেত্রেও অনেকে এমনটা করেন। তবে ভুল সংশোধনে প্রিয় নবীজির (সা.) আচরণ ছিল অত্যন্ত হিকমাহ ও আন্তরিকপূর্ণ।
ভুলের সমাধান করা
মহানবী (সা.) ভুলকে সমাধান ছাড়া রেখে দিতেন না। তিনি ব্যক্তির সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে কখনো গোপনে, কখনো সুবিধা মতো সময়ে ভুল সংশোধন করতেন। কখনো তার আচরণই সাহাবিদের বুঝিয়ে দিত কিছু ভুল হয়েছে। গুরুতর ভুলের ক্ষেত্রে জোর দিয়ে বারবার কথা বলতেন।
উসামা ইবন জায়েদ (রা.) একবার একজন শত্রু সৈনিককে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার পরও তার ওপর তরবারি চালিয়ে দেন। এটি শুনে নবীর মুখভঙ্গি বদলে যায়। তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘তুমি তাকে কীভাবে হত্যা করলে, যখন সে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছিল?’ এই পুনরাবৃত্তির কারণে উসামা এতটাই অনুতপ্ত হন যে তিনি বলেন, তার মনে হয়, তিনি আজই মুসলিম হলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪,২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯৬)
সৌজন্য বজায় রাখা
নবীজি সাহাবিদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি ভুল সংশোধনের সময়ও সৌজন্যবোধ হারাতেন না। একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রথমবার প্রবেশ করেন। তিনি উচ্চস্বরে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে ও মুহাম্মদকে ক্ষমা করো, কিন্তু অন্য কাউকে ক্ষমা করো না।’ নবীজি (সা.) হাসেন ও সৌজন্যের সঙ্গে বলেন, ‘তুমি একটি বিশাল জিনিসকে সীমিত করছো।’
সেই লোকই বা অন্য কোনো লোক মসজিদের মেঝেতে প্রস্রাব করেন। নবীজি বিচলিত সাহাবিদের শান্ত করেন এবং লোকটিকে একা ছেড়ে দিতে বলেন। বেদুইন পরে বলেন, ‘আমার মা-বাবা তার জন্য উৎসর্গ হোক। তিনি আমাকে তিরস্কার বা অপমান করেননি।’ তিনি কেবল বলেছেন, ‘এই মসজিদে প্রস্রাব করা যায় না, এটি নামাজ ও আল্লাহর স্মরণের স্থান। তারপর তিনি এক বালতি পানি এনে মেঝেতে ঢেলে দিতে বলেন।’ (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ৫২৯)
কৌশলী হওয়া
নবীজি অগ্রাধিকার বিবেচনা করতেন, সমস্যার সমাধান দিতেন এবং জানতেন কখন কঠোর বা নরম হতে হবে। তিনি বুঝতেন, কখন কেউ ভুলের পরিণতি বহন করতে পারবে। মক্কা বিজয়ের পর আবু মাহজুরা নামের এক কিশোর ও তার বন্ধুরা বিলাল (রা.) এর আজানের সময় তার সঙ্গে ঠাট্টা করে। নবীজি তাকে ডেকে পাঠান। ভয়ে কাঁপতে থাকা কিশোরকে তিনি তিরস্কার করেননি। তিনি তার কণ্ঠ পরখ করেন, আজানের শব্দগুলো তাকে শেখান এবং তার বুকে হাত রেখে দোয়া করেন। আবু মাহজুরা পরে মক্কার মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পান। (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ৭১৫)
অযথা কঠোরতা প্রয়োগ না করা
কখনো কখনো কঠোরতা ব্যক্তিগত সংশোধনের জন্য জরুরি। তিনি জানতেন কখন কঠোর বা নরম হতে হবে। যখন দুজন সাহাবি পরনিন্দা করছিলেন, নবীজি কঠোর শব্দে বলেন, ‘তারা তাদের ভাইয়ের মাংস খেয়েছে, যা তাদের দাতের মাঝে দেখা যাচ্ছে। তারা নবীজির কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি বলেন, তাদের ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪,৮৮০)
আরেকবার তরুণ ফজল ইবন আল-আব্বাস (রা.) নবীজির সঙ্গে সওয়ার ছিলেন। এক সুন্দরী নারী প্রশ্ন করতে এলে ফজল তাকিয়ে থাকেন। নবীজি তার চিবুক ধরে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬,২২৮)
মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা
নবীজি ভুলের সমালোচনা করতেন, ব্যক্তিকে নিন্দা করতেন না। একবার কিছু লোক মদ্যপানে মাতাল এক ব্যক্তিকে অভিশাপ দিচ্ছিলেন। নবীজি বলেন, ‘তাকে অভিশাপ দিয়ো না। আমি জানি, সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬,৭৮০)
এক যুবক রাতে নামাজ পড়তে অবহেলা করছিলেন। নবীজি তাকে উৎসাহিত করে বলেন, ‘আবদুল্লাহ কত চমৎকার মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত’ এরপর আবদুল্লাহ কখনো রাতের নামাজ ত্যাগ করেননি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২,৪৭০)
দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা
আবু লুবাবা (রা.) বনু কুরাইজার কাছে দূত হিসেবে গিয়ে এমন ভঙ্গি করেন, যা মুসলিমদের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারত। তিনি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন তিনি নবীর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তিনি মসজিদে গিয়ে নিজেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শপথ করেন, আল্লাহ তাকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত তিনি নড়বেন না। অবশেষে তার ক্ষমার আয়াত নাজিল হয়। নবীজি নিজ হাতে তাকে খুলে দেন। (তাফসির ইবন কাসির, সুরা তাওবা, আয়াত : ১০২)
বর্তমান সময়ে দেখা যায়, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস-আদালত ও দোকানের কর্মচারীর ভুলের কারণে মালিক অত্যন্ত কটুবাক্য ব্যবহার করেন এবং ধমক দেন।
এমনটা করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কাউকে সরাসরি আঘাত দিয়ে কথা বললে কিংবা ভুল সংশোধনের উদ্দেশে বললেও মাঝেমধ্যে তা হিতে বিপরীত ঘটে। বরং সংশোধনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে হিকমত ও কোমলতার পরিচয় দেওয়াই উত্তম।
তাই রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ভুলকে সংশোধন করার চেষ্টাতে রয়েছে সাফল্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বোঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।









