চুরি ও এআইয়ের ব্যবহার, বাংলাদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার

চুরি ও এআইয়ের ব্যবহার, বাংলাদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা মানে নতুন কোনো বিষয়ে জানা, বোঝা ও জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ করা। অথচ সেই গবেষণাতেই অন্যের লেখা, তথ্য, ধারণা বা ফলাফল নিজের নামে ব্যবহার করার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কখনো শিক্ষক, কখনো শিক্ষার্থী, আবার কখনো গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে উঠছে প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ। চুরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ নানা অভিযোগে গত সাত বছরে বেশবিছু আন্তর্জাতিক জার্নাল বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে।
তবে আমাদের দেশে অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কোথাও আবার অভিযোগের মধ্যেই পদোন্নতি বা প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার খবরও এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে গবেষণা চুরির অভিযোগ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
গবেষণায় সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাদৃশ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধ প্রমাণ করে না। গবেষণার ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহার, যথাযথ উদ্ধৃতি না দেওয়া, নিজের আগের গবেষণা পুনর্ব্যবহার এবং পরিকল্পিতভাবে অন্যের গবেষণা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া-এসবকিছুর মাত্রা ও প্রেক্ষাপট আলাদা। তাই শুধু প্লেজিয়ারিজম সফটওয়্যারে পাওয়া ‘সামঞ্জস্যের হার’ দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, নথি যাচাই এবং ন্যায্য তদন্ত।
চৌর্যবৃত্তি বন্ধে ইউজিসির উদ্যোগ
তবে সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দেশে একটি অভিন্ন কাঠামোর ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের নির্বাহী সারাংশেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণায় প্লেজিয়ারিজম বাড়ার কথা উল্লেখ করে নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ইতোমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্বভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধ নীতিমালায় নির্দিষ্ট মাত্রার সামঞ্জস্যকে গ্রহণযোগ্য ধরে তার বেশি হলে জরিমানা, পদাবনতি, ডিগ্রি বাতিল এমনকি চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণাপত্রের মৌলিকত্ব যাচাইয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে।
কিন্তু নীতিমালা থাকাই শেষ কথা নয়। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কে করবে, কত দিনের মধ্যে করবে, তদন্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব থাকবে কি না, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর বক্তব্য কীভাবে নেওয়া হবে এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করা হবে কি না এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি কার্যকর না হলে নীতিমালার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। আবার ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও পেশাগত ক্ষতি হলে সেটিও গুরুতর অন্যায়।
যেসব কারণে গবেষণাপত্র চুরি
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ১০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল বা সাময়িকী থেকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমানের নামও রয়েছে। এছাড়া অধ্যাপক ড. সাদেক আলী, অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা কামাল, ড. মো. সজিব আলীসহ একাধিক গবেষকের নাম পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন গবেষক দাবি করেছেন, প্রত্যাহার হওয়া গবেষণায় তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না বা জার্নালের পিয়ার রিভিউ ও মান নিয়ন্ত্রণের ত্রুটির কারণে তাদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এতে স্পষ্ট গবেষণা চুরি এখন শুধু কপি-পেস্টের সমস্যা নয়। ভুয়া তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অন্যের গবেষণার মালিকানা দাবি, ভুলভাবে লেখক তালিকাভুক্ত করা এবং ভুয়া পিয়ার রিভিউ গবেষণা জগতের অনিয়মের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধেও গবেষণা চুরির অভিযোগ উঠে। ২০২১ সালের ৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানায়। অভিযোগে সাদেকা হালিমের ‘পার্টিসিপেশন অফ উইমেন ইন অ্যাকুয়াকালচার ইন থ্রি কোস্টাল ডিস্ট্রিক্টস অফ বাংলাদেশ: অ্যাপ্রোচেস টুওয়ার্ডস সাসটেইনেবল লাইভলিহোড’ শীর্ষক গবেষণা নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি যাচাই করে ৮৮ শতাংশ অন্য গবেষণার সঙ্গে মিল পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। তবে সাদেকা হালিম তখন অভিযোগের বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছিলেন। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ৩০ জুলাই সাদেকা হালিমকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ইউজিসির অভিন্ন অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজম নীতিমালার উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নীতিমালা কাগজে থাকলেই হবে না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গবেষণায় একটি চুরি শুধু একজন গবেষকের অনৈতিকতা নয়। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। গবেষণার নামে যদি পুরোনো জ্ঞানই কেবল নতুন মোড়কে ফিরে আসে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র না হয়ে কাগজ তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির এক সদস্য (গবেষণা) বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজম নীতিমালা থাকলেও সেগুলো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইউজিসির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নৈতিকতা ও প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধে অভিন্ন নির্দেশনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা এটা নিয়ে কাজও করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে।’
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে এ ধরনের নীতিমালা করা গেলে বিশেষ করে নবীন গবেষকরা উপকৃত হবেন। সাইটেশন, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি এবং গবেষণার নৈতিকতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার মাধ্যমে এটি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কমানোর পাশাপাশি গবেষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফ সাদেক বলেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইউজিসির উদ্যোগে একক ও অভিন্ন প্লেজিয়ারিজম নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্লেজিয়ারিজমের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ও নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও ২০ শতাংশ, আবার কোথাও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্লেজিয়ারিজম গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও নেই। অভিন্ন নীতিমালা চালু হলে গবেষণা মূল্যায়নে শৃঙ্খলা আসার পাশাপাশি সব গবেষকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
আশরাফ সাদেক আরও বলেন, গবেষণার মানোন্নয়ন ও নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নৈতিক ও ইতিবাচক ব্যবহারকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে তথ্য বিকৃতি বা গবেষণায় অসদুপায় অবলম্বনের জন্য এআইয়ের অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই জাতীয় গবেষণা নীতিমালায় এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা মানে নতুন কোনো বিষয়ে জানা, বোঝা ও জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ করা। অথচ সেই গবেষণাতেই অন্যের লেখা, তথ্য, ধারণা বা ফলাফল নিজের নামে ব্যবহার করার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কখনো শিক্ষক, কখনো শিক্ষার্থী, আবার কখনো গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে উঠছে প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ। চুরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ নানা অভিযোগে গত সাত বছরে বেশবিছু আন্তর্জাতিক জার্নাল বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে।
তবে আমাদের দেশে অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কোথাও আবার অভিযোগের মধ্যেই পদোন্নতি বা প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার খবরও এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে গবেষণা চুরির অভিযোগ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
গবেষণায় সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাদৃশ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধ প্রমাণ করে না। গবেষণার ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহার, যথাযথ উদ্ধৃতি না দেওয়া, নিজের আগের গবেষণা পুনর্ব্যবহার এবং পরিকল্পিতভাবে অন্যের গবেষণা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া-এসবকিছুর মাত্রা ও প্রেক্ষাপট আলাদা। তাই শুধু প্লেজিয়ারিজম সফটওয়্যারে পাওয়া ‘সামঞ্জস্যের হার’ দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, নথি যাচাই এবং ন্যায্য তদন্ত।
চৌর্যবৃত্তি বন্ধে ইউজিসির উদ্যোগ
তবে সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দেশে একটি অভিন্ন কাঠামোর ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের নির্বাহী সারাংশেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণায় প্লেজিয়ারিজম বাড়ার কথা উল্লেখ করে নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ইতোমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্বভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধ নীতিমালায় নির্দিষ্ট মাত্রার সামঞ্জস্যকে গ্রহণযোগ্য ধরে তার বেশি হলে জরিমানা, পদাবনতি, ডিগ্রি বাতিল এমনকি চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণাপত্রের মৌলিকত্ব যাচাইয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে।
কিন্তু নীতিমালা থাকাই শেষ কথা নয়। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কে করবে, কত দিনের মধ্যে করবে, তদন্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব থাকবে কি না, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর বক্তব্য কীভাবে নেওয়া হবে এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করা হবে কি না এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি কার্যকর না হলে নীতিমালার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। আবার ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও পেশাগত ক্ষতি হলে সেটিও গুরুতর অন্যায়।
যেসব কারণে গবেষণাপত্র চুরি
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ১০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল বা সাময়িকী থেকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমানের নামও রয়েছে। এছাড়া অধ্যাপক ড. সাদেক আলী, অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা কামাল, ড. মো. সজিব আলীসহ একাধিক গবেষকের নাম পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন গবেষক দাবি করেছেন, প্রত্যাহার হওয়া গবেষণায় তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না বা জার্নালের পিয়ার রিভিউ ও মান নিয়ন্ত্রণের ত্রুটির কারণে তাদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এতে স্পষ্ট গবেষণা চুরি এখন শুধু কপি-পেস্টের সমস্যা নয়। ভুয়া তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অন্যের গবেষণার মালিকানা দাবি, ভুলভাবে লেখক তালিকাভুক্ত করা এবং ভুয়া পিয়ার রিভিউ গবেষণা জগতের অনিয়মের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধেও গবেষণা চুরির অভিযোগ উঠে। ২০২১ সালের ৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানায়। অভিযোগে সাদেকা হালিমের ‘পার্টিসিপেশন অফ উইমেন ইন অ্যাকুয়াকালচার ইন থ্রি কোস্টাল ডিস্ট্রিক্টস অফ বাংলাদেশ: অ্যাপ্রোচেস টুওয়ার্ডস সাসটেইনেবল লাইভলিহোড’ শীর্ষক গবেষণা নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি যাচাই করে ৮৮ শতাংশ অন্য গবেষণার সঙ্গে মিল পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। তবে সাদেকা হালিম তখন অভিযোগের বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছিলেন। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ৩০ জুলাই সাদেকা হালিমকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ইউজিসির অভিন্ন অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজম নীতিমালার উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নীতিমালা কাগজে থাকলেই হবে না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গবেষণায় একটি চুরি শুধু একজন গবেষকের অনৈতিকতা নয়। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। গবেষণার নামে যদি পুরোনো জ্ঞানই কেবল নতুন মোড়কে ফিরে আসে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র না হয়ে কাগজ তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির এক সদস্য (গবেষণা) বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজম নীতিমালা থাকলেও সেগুলো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইউজিসির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নৈতিকতা ও প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধে অভিন্ন নির্দেশনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা এটা নিয়ে কাজও করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে।’
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে এ ধরনের নীতিমালা করা গেলে বিশেষ করে নবীন গবেষকরা উপকৃত হবেন। সাইটেশন, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি এবং গবেষণার নৈতিকতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার মাধ্যমে এটি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কমানোর পাশাপাশি গবেষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফ সাদেক বলেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইউজিসির উদ্যোগে একক ও অভিন্ন প্লেজিয়ারিজম নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্লেজিয়ারিজমের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ও নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও ২০ শতাংশ, আবার কোথাও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্লেজিয়ারিজম গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও নেই। অভিন্ন নীতিমালা চালু হলে গবেষণা মূল্যায়নে শৃঙ্খলা আসার পাশাপাশি সব গবেষকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
আশরাফ সাদেক আরও বলেন, গবেষণার মানোন্নয়ন ও নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নৈতিক ও ইতিবাচক ব্যবহারকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে তথ্য বিকৃতি বা গবেষণায় অসদুপায় অবলম্বনের জন্য এআইয়ের অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই জাতীয় গবেষণা নীতিমালায় এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

চুরি ও এআইয়ের ব্যবহার, বাংলাদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার
শেখ শাহরিয়ার হোসেন

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা মানে নতুন কোনো বিষয়ে জানা, বোঝা ও জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ করা। অথচ সেই গবেষণাতেই অন্যের লেখা, তথ্য, ধারণা বা ফলাফল নিজের নামে ব্যবহার করার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। কখনো শিক্ষক, কখনো শিক্ষার্থী, আবার কখনো গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে উঠছে প্লেজিয়ারিজম বা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ। চুরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসহ নানা অভিযোগে গত সাত বছরে বেশবিছু আন্তর্জাতিক জার্নাল বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছে।
তবে আমাদের দেশে অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কোথাও আবার অভিযোগের মধ্যেই পদোন্নতি বা প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার খবরও এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে গবেষণা চুরির অভিযোগ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
গবেষণায় সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কঠোর না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শতাংশ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাদৃশ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধ প্রমাণ করে না। গবেষণার ক্ষেত্রে একই ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহার, যথাযথ উদ্ধৃতি না দেওয়া, নিজের আগের গবেষণা পুনর্ব্যবহার এবং পরিকল্পিতভাবে অন্যের গবেষণা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া-এসবকিছুর মাত্রা ও প্রেক্ষাপট আলাদা। তাই শুধু প্লেজিয়ারিজম সফটওয়্যারে পাওয়া ‘সামঞ্জস্যের হার’ দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, নথি যাচাই এবং ন্যায্য তদন্ত।
চৌর্যবৃত্তি বন্ধে ইউজিসির উদ্যোগ
তবে সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দেশে একটি অভিন্ন কাঠামোর ঘাটতি ছিল। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের নির্বাহী সারাংশেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণায় প্লেজিয়ারিজম বাড়ার কথা উল্লেখ করে নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ইতোমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্বভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধ নীতিমালায় নির্দিষ্ট মাত্রার সামঞ্জস্যকে গ্রহণযোগ্য ধরে তার বেশি হলে জরিমানা, পদাবনতি, ডিগ্রি বাতিল এমনকি চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণাপত্রের মৌলিকত্ব যাচাইয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তকারী সফটওয়্যার ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে।
কিন্তু নীতিমালা থাকাই শেষ কথা নয়। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কে করবে, কত দিনের মধ্যে করবে, তদন্ত কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব থাকবে কি না, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর বক্তব্য কীভাবে নেওয়া হবে এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করা হবে কি না এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি কার্যকর না হলে নীতিমালার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। আবার ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও পেশাগত ক্ষতি হলে সেটিও গুরুতর অন্যায়।
যেসব কারণে গবেষণাপত্র চুরি
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা পরিস্থিতির নেতিবাচক দিক সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ১০টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল বা সাময়িকী থেকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমানের নামও রয়েছে। এছাড়া অধ্যাপক ড. সাদেক আলী, অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা কামাল, ড. মো. সজিব আলীসহ একাধিক গবেষকের নাম পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন গবেষক দাবি করেছেন, প্রত্যাহার হওয়া গবেষণায় তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না বা জার্নালের পিয়ার রিভিউ ও মান নিয়ন্ত্রণের ত্রুটির কারণে তাদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এতে স্পষ্ট গবেষণা চুরি এখন শুধু কপি-পেস্টের সমস্যা নয়। ভুয়া তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অন্যের গবেষণার মালিকানা দাবি, ভুলভাবে লেখক তালিকাভুক্ত করা এবং ভুয়া পিয়ার রিভিউ গবেষণা জগতের অনিয়মের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বিরুদ্ধেও গবেষণা চুরির অভিযোগ উঠে। ২০২১ সালের ৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানায়। অভিযোগে সাদেকা হালিমের ‘পার্টিসিপেশন অফ উইমেন ইন অ্যাকুয়াকালচার ইন থ্রি কোস্টাল ডিস্ট্রিক্টস অফ বাংলাদেশ: অ্যাপ্রোচেস টুওয়ার্ডস সাসটেইনেবল লাইভলিহোড’ শীর্ষক গবেষণা নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি যাচাই করে ৮৮ শতাংশ অন্য গবেষণার সঙ্গে মিল পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। তবে সাদেকা হালিম তখন অভিযোগের বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছিলেন। নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ৩০ জুলাই সাদেকা হালিমকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ইউজিসির অভিন্ন অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজম নীতিমালার উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নীতিমালা কাগজে থাকলেই হবে না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গবেষণায় একটি চুরি শুধু একজন গবেষকের অনৈতিকতা নয়। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। গবেষণার নামে যদি পুরোনো জ্ঞানই কেবল নতুন মোড়কে ফিরে আসে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র না হয়ে কাগজ তৈরির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির এক সদস্য (গবেষণা) বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যান্টি-প্লেজিয়ারিজম নীতিমালা থাকলেও সেগুলো নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইউজিসির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার নৈতিকতা ও প্লেজিয়ারিজম প্রতিরোধে অভিন্ন নির্দেশনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা এটা নিয়ে কাজও করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে।’
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে এ ধরনের নীতিমালা করা গেলে বিশেষ করে নবীন গবেষকরা উপকৃত হবেন। সাইটেশন, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি এবং গবেষণার নৈতিকতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার মাধ্যমে এটি গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি কমানোর পাশাপাশি গবেষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফ সাদেক বলেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইউজিসির উদ্যোগে একক ও অভিন্ন প্লেজিয়ারিজম নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্লেজিয়ারিজমের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ও নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও ২০ শতাংশ, আবার কোথাও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্লেজিয়ারিজম গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেজিয়ারিজম শনাক্তের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও নেই। অভিন্ন নীতিমালা চালু হলে গবেষণা মূল্যায়নে শৃঙ্খলা আসার পাশাপাশি সব গবেষকের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
আশরাফ সাদেক আরও বলেন, গবেষণার মানোন্নয়ন ও নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নৈতিক ও ইতিবাচক ব্যবহারকে স্বাগত জানানো উচিত। তবে তথ্য বিকৃতি বা গবেষণায় অসদুপায় অবলম্বনের জন্য এআইয়ের অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই জাতীয় গবেষণা নীতিমালায় এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।









