শিরোনাম

চাকরির ফাঁদে কম্বোডিয়ায়, শেষে সাইবার দাসত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
চাকরির ফাঁদে কম্বোডিয়ায়, শেষে সাইবার দাসত্ব
প্রতীকী ছবি

উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হচ্ছে তরুণদের। কিন্তু চাকরির পরিবর্তে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে। যেখানে পাসপোর্ট জব্দ করে জোরপূর্বক তাদের যুক্ত করা হচ্ছে অনলাইন প্রতারণায়। নির্যাতন, ভয়ভীতি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মানবেতর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে অনেকেই মাসের পর মাস কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ খরচে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

সম্প্রতি কম্বোডিয়ার বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া শত শত বাংলাদেশির অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে একই ধরনের ভয়াবহ চিত্র। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এমন একাধিক স্ক্যাম সেন্টারের অস্তিত্বের তথ্য প্রকাশ করেছে।

সিরাজগঞ্জের তোফায়েল আহমেদ (২৬) স্নাতক শেষ করে একটি ওষুধ কোম্পানিতে কাজের পাশাপাশি ইনস্যুরেন্সের পলিসি বিক্রির কাজ করতেন। কিন্তু আয় পর্যাপ্ত না হওয়ায় তিনি বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি জানান, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় তিনি বিদেশে কাজের সিদ্ধান্ত নেন। ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর মাধ্যমে দালাল চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়। কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে ভিসা ও কাগজপত্রের ব্যবস্থা করা হলেও কম্বোডিয়ায় পৌঁছে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে নির্মাণশ্রমিক পরিচয়ে পাঠানো হয়েছে।

তোফায়েল আহমেদ জানান, নমপেনে পৌঁছানোর পর কয়েক দিন একটি হোটেলে রাখার পর তাকে কথিত ইন্টারভিউয়ের অজুহাতে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকার স্ক্যাম সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তার পাসপোর্ট ও নগদ অর্থ কেড়ে নেওয়া হয়। পরে জানানো হয়, তাকে কয়েক হাজার ডলারের বিনিময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার কাজ ছিল ভুয়া পরিচয়ে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে অনলাইনে সম্পর্ক তৈরি করে বিভিন্ন বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলা। কাজে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক নির্যাতন, বৈদ্যুতিক শক, খাবার বন্ধ এবং মারধরের মতো শাস্তিও দেওয়া হতো। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হলেও প্রতিশ্রুত বেতন নিয়মিত দেওয়া হয়নি।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন দেশে ফেরা বাংলাদেশি।

তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে দালালরা কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি বা অফিস সহকারীর চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় করে। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর দেখা যায়, ভিসার ধরনও প্রতিশ্রুত চাকরির সঙ্গে মিলছে না। এরপর বিমানবন্দর থেকেই দালাল চক্র তাদের বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, এসব স্ক্যাম সেন্টারে প্রতারণার কাজ ধাপে ধাপে পরিচালিত হয়। একদল বিদেশি নাগরিকদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে, আরেক দল ভুয়া পরিচয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে আরেকটি দল ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহ করে, যা ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিও কলে বিশ্বাস অর্জনের জন্য নারীদেরও ব্যবহার করা হয়।

তারা জানান, এসব সেন্টার কার্যত একটি বদ্ধ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে পরিচালিত হয়। কর্মীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। একই ভবনে থাকার ব্যবস্থা, খাবার, দোকানপাটসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু থাকায় পালানোর পথও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাস থেকে এ পর্যন্ত ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন।

অন্যদিকে, বিএমইটির তথ্য বলছে, গত দেড় বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। ফলে কতজন একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, এই ঘটনাকে শুধু মানবপাচার নয়,সাইবার দাসত্বও। ভুক্তভোগীদের অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবপাচারের নতুন ও উদ্বেগজনক রূপ।

সিআইডির মানবপাচার ইউনিট এক কর্মকর্তা জানান, কম্বোডিয়া থেকে অনেক বাংলাদেশি ফিরে এলেও অভিযোগ দায়েরের সংখ্যা খুবই কম। অনেক ভুক্তভোগী মামলা না করে দালালদের সঙ্গে আপসের মাধ্যমে টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারের নজরদারি বাড়ার পর পাচারকারীরা নতুন কৌশল নিয়েছে। এখন জাল বিএমইটি কার্ড ব্যবহার, কিংবা প্রথমে থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে সেখান থেকে কম্বোডিয়ায় প্রবেশ করানোর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চাকরির নামে এই সংঘবদ্ধ প্রতারণা ঠেকাতে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভিসা যাচাই, রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় উচ্চ আয়ের স্বপ্নে আরও অনেক বাংলাদেশি একই ধরনের সাইবার দাসত্বের ফাঁদে পড়তে পারেন।

/এসবি/