শিরোনাম

রাজধানীতে বন্ধ হয়নি চাঁদাবাজি, নেপথ্যে কারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে বন্ধ হয়নি চাঁদাবাজি, নেপথ্যে কারা

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য চাঁদা দেওয়া ব্যবসার অনিবার্য অংশ হয়ে আছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজি কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে এর ধরন ও আদায়কারীর পরিচয় বদলেছে বলে উঠে এসেছে পুলিশের একটি প্রতিবেদনে।

এতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় আধিপত্য এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আশ্রয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র।

কারওয়ান বাজারে দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভাঙারির ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী জানান, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচের পাশাপাশি প্রতি মাসে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।

তিনি জানান, চাঁদা না দিলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে যে পরিমাণ অর্থ দিতে হতো, এখন তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

একই ধরনের অভিযোগ করে ইস্কাটন এলাকার এক চা-দোকানি বলেন, প্রতিদিন নিয়ম করে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের চাঁদা দিতে হয়। পাশাপাশি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের নামে টাকা আদায় করা হয়।বিক্রি হোক বা না হোক প্রতিদিনই চাঁদা দিতে হয়। অন্যথায় দোকান সরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।

মার্চ ও এপ্রিল মাসে পুলিশের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীর ৪৫টি থানা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন সক্রিয় চাঁদাবাজকে শনাক্ত করা হয়েছে।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েনি, বরং কারা চাঁদা তুলবে এবং কত টাকা আদায় হবে, সেটিই পরিবর্তিত হয়েছে মাত্র।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিহ্নিত চাঁদাবাজদের মধ্যে ১৯৭ জনের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৮১ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় বিএনপির ৯৪ জন, যুবদলের ৪৪ জন এবং ছাত্রদলের ২৬ জন রয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ১৬ জনের নামও রয়েছে। তবে অধিকাংশ চিহ্নিত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এদের বড় অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী কিংবা তালিকাভুক্ত অপরাধীদের সহযোগী। পুলিশ আরও ৩২৯ জন আশ্রয়দাতা বা পৃষ্ঠপোষককে চিহ্নিত করেছে। তাদের মধ্যে ২৭১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। এদের অধিকাংশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজধানীর যেসব এলাকায় চাঁদাবাজির তৎপরতা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে খিলক্ষেত। এরপর রয়েছে কলাবাগান, হাতিরঝিল, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, আদাবর, ভাটারা, খিলগাঁও, উত্তরা পূর্ব ও পল্লবী। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত মোট চাঁদাবাজের প্রায় ৫৮ শতাংশ এই ১০টি এলাকাতেই সক্রিয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফুটপাতের ব্যবসা, পরিবহন স্ট্যান্ড ও নির্মাণ প্রকল্প বেশি থাকায় এসব এলাকায় চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে ৩৫টি ঘটনায় পুলিশের সম্পৃক্ততার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে ডিএমপির মিরপুর বিভাগে।

পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, পুরোনো অপরাধী চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং তারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে পোশাক কারখানা, আবাসন নির্মাতা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে পরিচালিত অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৭৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের কতজন আটক হয়েছেন, সে বিষয়ে পৃথক কোনো পরিসংখ্যান নেই।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই আগে প্রস্তুত করা তালিকায় ছিলেন না।

অন্যদিকে, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি।

দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করতেই একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে।

/এসবি/