
একান্ত সাক্ষাৎকার: শামীমা পারভীন
এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন। তিনি এই জেলার প্রথম নারী এসপি। তিনি ঢাকা জেলার ৯৮তম এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সাইবার অপরাধ দমন, জুলাই আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা, পারিবারিক জীবনসহ নানা বিষয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে কথা বলেছেন শামীমা পারভীন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের বিশেষ প্রতিনিধি আয়নাল হোসেন।

এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না
আয়নাল হোসেন

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি জীবনে আপনার ভালো ও মন্দ লাগার বিষয়গুলো কী?
শামীমা পারভীন: বিসিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট চয়েস হিসেবে পুলিশ দিয়েছিলাম। মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিলাম। তবে বেসিক ট্রেনিং শেষ করে কাজে যোগ দিয়েই একটা ধাক্কা খেয়েছি। আমার স্বপ্নগুলো ওখানেই বলতে পারেন শেষ হয়ে গিয়েছে। পুলিশের চাকরিতে ২০ বছর শেষ করলাম এই ২১ আগস্ট। এর মধ্যে ১৮ বছরের অধিকাংশ সময় স্বপ্নগুলোকে একদম দমিয়ে আমি কাজগুলো করেছি। যেখানেই থেকেছি, পুলিশিং সরাসরি হয়তো করতে পারিনি, আমি ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে চাকরি করেছি। কিন্তু তারপরও আমার মনোবল খুবই ভালো ছিল। আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। আমি মনে করি কোনো সময় দুঃসময় না যদি আপনি সেই সময়টাকে ব্যবহার করতে জানেন। পুলিশের প্রশিক্ষণই একজন পুলিশকে তৈরি করে। বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ট্রেনিং দিয়েছি। যখন কেউ বলে 'স্যার, আমি আপনার ছাত্র'-এটা অনেক ভালো লাগার জায়গা। চাকরির ক্ষেত্রে বলি, পুলিশে অনেক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে। পলিসি লেভেলে সিদ্ধান্ত দিতে চাই। বাস্তবে এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, মানুষ যেভাবে আশা করে সেভাবে আস্থা, বিশ্বাস নিয়ে আইনি সেবা পেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি ঢাকা জেলার ৯৮তম এবং প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনকে আপনি কী ব্যক্তিগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে নারী পুলিশদের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। আমি বলব, একজন নারীকে আজ ঢাকা জেলার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দিয়েছে এই সরকার। এটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং জব। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর পার্টিসিপেশন প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদেরকে দেখে অন্য নারীরা আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আগে আমাদের 'ফোর্স' হিসেবে দেখা হতো। আপনারা জানেন, এখন আমরা 'সার্ভিস’ হিসেবে গণ্য করি। তো সার্ভিস ওরিয়েন্টেড পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটি থানায় যারা কাজ করে, তাদের কিন্তু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যে সাধারণ জনগণ ভিকটিম বলেন অথবা ভিকটিমের কোনো আত্মীয়-স্বজন বা যেই থানায় সেবা নিতে আসবে—সার্ভিসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় যেন না ঘটে। যারা আস্থার সঙ্গে পুলিশ স্টেশনে আসে তারা যেন সেই আস্থা এবং বিশ্বাস নিয়েই ফিরে যেতে পারে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়—এ বিষয়টা আমরা এনশিওর করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনার স্বামী জাতীয় সংসদের হুইপ ও সরকার দলীয় এমপি রকিবুল ইসলাম বকুল। এ কারণে সরকারি দলের প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব আসে কি না?
শামীমা পারভীন: আমি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেছি ২০০৬ সালে এবং আমার বিয়ে হয়েছে ২০১০ সালে। আমি চাকরিটাই কিন্তু আগে পেয়েছি। আমি মনে করি আমি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মচারী। কর্মচারী হিসাবে আমার রাষ্ট্রের প্রতি এবং জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্বটা পালন করতে আমি কখনোই পিছপা হই না। আমি মনে করি যে, অপরাধীদের আসলে কোনো দল থাকে না। যে অপরাধী, আমরা তার অপরাধটা দমন করার ক্ষেত্রে কাজ করি, আইন প্রয়োগ করি। আর পার্সোনালি (ব্যক্তিগতভাবে) আমার রাজনৈতিক কোনো আদর্শ মানসিকভাবে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে সেটা প্রয়োগের কোনো সুযোগই নাই।
সিজেডএন টোয়ন্টিফোর: ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাজে শৈথল্য এসেছে। পুলিশের আগে সেই শক্তি ফিরে পেতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
শামীমা পারভীন: জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আমাদের পুলিশের ওপর দিয়ে একটা ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু বিপথগামী সদস্যর কর্মকাণ্ডের জন্য আজকে আমাদের সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে খেসারত দিতে হচ্ছে। সেই কারণে পুলিশের মনোবলে ঘাটতি আছে। এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন বেসিক ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে কাজ করছি যাতে আমরা পুলিশের যে হারানো মনোবল, সেটা যেন বৃদ্ধি করতে পারি এবং আমরা সঠিকভাবে আমাদের সার্ভিসগুলো প্রোভাইড করতে পারি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: মাদক, কিশোর গ্যাং এবং সাইবার অপরাধ বর্তমানে বড় সামাজিক ব্যাধি। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় ঢাকা জেলা পুলিশ কী ধরনের কঠোর বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে?
শামীমা পারভীন: প্রত্যেকটি অপরাধ দমন করাই আমাদের অগ্রাধিকার। মাদক থেকেই কিন্তু অন্যান্য ক্রাইমগুলো হয়। শুরু হয় হয়তো মাদক দিয়েই। আমরা নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের আগামী প্রজন্ম বা ভবিষ্যৎ এই মাদকের ভয়াবহতায় হারিয়ে যাচ্ছে এবং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি রেখেছি মাদক কীভাবে নির্মূল করা যায় এবং এর সঙ্গে যেসব বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী জড়িত তাদের ধরার জন্য আমরা কাজ করছি। এছাড়া আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা লুট হওয়া অস্ত্র রিকভারি করতে বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট করছি। অস্ত্র উদ্ধারে তল্লাশি করা হচ্ছে। যারা সন্দেহভাজন আছে তাদেরও আমরা গ্রেপ্তার করছি। সেই সঙ্গে যারা মাদকসেবী অথবা মাদকের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—তাদেরও আমরা অ্যারেস্ট করছি। ইদানিং কিশোর গ্যাংও কিন্তু এই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু বারবার বলছি এটা পুলিশের একার কাজ না। আমাদের প্রত্যেক অভিভাবক, পিতা-মাতা, স্কুলের শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা আছেন বা সমাজে যারা নেতৃত্ব দেন সিভিল সোসাইটি—আমরা সেই কমিউনিটিকে আহ্বান জানাব। আমরা কমিউনিটি পুলিশিং কিন্তু নতুন করে শুরু করেছি। তো সবাইকে আপনাদের মাধ্যমে আমি আহ্বান জানাব-প্লিজ আপনারা সকলে আপনাদের সন্তান, আপনাদের পরিবারের সদস্যদের দিকে নজর রাখুন, তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে। এটা করতে পারলে আমরা কিন্তু এই কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কাজ করতে পারব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ঢাকা জেলার অধীনে বেশ কিছু শিল্পাঞ্চল রয়েছে, যেখানে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এসব শিল্প এলাকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী?
শামীমা পারভীন: আপনি জানেন আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জে বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব এলাকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশও কিন্তু কাজ করে। এখানে অনেক লোক আছে যারা আসলে দেখা যাচ্ছে যে হয়তোবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, কিন্তু গভর্মেন্টকে স্যাবোটেজ করার জন্য বা আনরেস্ট করার জন্য দেখা যাচ্ছে কাজ করে থাকে। এ ধরনের যারা শ্রমিক লিডার আছেন, তাদের অপতৎপরতাকে রুখে দেওয়ার জন্য আমরা তাদের সার্ভিলেন্সে রাখি। আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। মালিকপক্ষকেও আমরা জানাতে চাই যে, আপনাদের যারা শ্রমিক আছে, তাদের নির্ধারিত সময়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করুন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া থানায় এসে সেবা পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে আপনি কী ধরনের তদারকি করছেন?
শামীমা পারভীন: আমাদের থানা লেভেলে যখন কোনো ভিকটিম অথবা তাদের পরিবারের কোনো সদস্য বা যেকোনো সাধারণ জনগণ যখনই আসবে, প্রথমত তাকে (পুলিশ সদস্য) ভেরি ওয়েলকামিং হতে হবে। আমি নির্দেশনা দিয়েছি এবং সেই সঙ্গে আরেকটা বিষয় বারবারই বলি, যিনি থানায় আসবেন তার কোনো পরিচয় দেখার দরকার নেই। তিনি আমার কাছে সার্ভিস নিতে এসেছেন, আমি সেই লক্ষ্যে কাজ করব। কোনো ধরনের অন্যায়, অবৈধ বিষয় যেন সার্ভিসগ্রহীতাদের সঙ্গে কেউ প্রয়োগ না করে—আমি কঠোরভাবে তাদের মনিটরিং করি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (হাইতি) এবং আন্তর্জাতিক নারী পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনে (আইডব্লিউপিএ) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মাঠপর্যায়ে ঢাকা জেলা পুলিশ পরিচালনায় আপনাকে কীভাবে সাহায্য করছে?
শামীমা পারভীন: চাকরি জীবনে এটা আমার জন্য খুবই বড় একটা পাওয়া। আমি হাইতি মিশনে ১৬ মাস ১৪০ জন নারী সদস্যকে নিয়ে ছিলাম। স্থানীয় জনগণের যে দুর্দশা, আমরা তাদের জন্য কাজ করেছি। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যেভাবে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য আমরা কাজ করেছি। ৫০টিরও বেশি দেশ সেখানে কাজ করেছে। সেখানে থাকার ফলে আমি সব দেশের পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় পুলিশ ও জনগণের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। সেখান থেকে আসলে যে এক্সপেরিয়েন্স গ্যাদার করেছি—বলতে পারেন রেজিলিয়েন্স, নলেজ, কনফিডেন্স-সবকিছুই কিন্তু এখন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে প্রথম ক্রাইমে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেকটাই কাজে দিচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অতি সম্প্রতি আপনি এশিয়ান পুলিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের (এসপিএসসি) উপদেষ্টা মনোনীত হয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আপনি কতটুকু গুরুত্ব দেন?
শামীমা পারভীন: আমরা যদি খেলাধুলা করি, তাহলে কিন্তু আমাদের মেধার বিকাশ ঘটে, ফিজিক্যাল ফিটনেস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। আমাদের থাকার জায়গাটা খুব একটা সুন্দর না, আমাদের অনেক ধরনের প্রবলেম আছে। তো সেই প্রবলেমকে যদি মিনিমাইজ করতে চাই, নিজেকে সবল রাখতে চাই, মনোবল বাড়াতে চাই—সেক্ষেত্রে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। সারা বাংলাদেশে পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও ফিটনেসের জন্য কালচারাল প্রোগ্রাম ও স্পোর্টস সবসময় থাকতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পিআরবি মেনে কী থানার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে?
শামীমা পারভীন: পিআরবি-(পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) হচ্ছে পুলিশের প্রাণ। আমরা পিআরবি ফলো করেই কিন্তু পুলিশিং কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করি। পিআরবিসহ পেনাল কোড, সিআরপিসি, পুলিশ অ্যাক্ট বা অন্যান্য যেসব আইন আছে সেগুলোতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট আসছে। এসব ফলো করেই আমরা মূলত কাজ করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি ও সংসার দুটো বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কীভাবে আমার মা সবকিছু ম্যানেজ করতেন। আমরা চার ভাই-বোন। আমার মা এবং বাবা দুজনেই সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার বাবা আমাকে তৈরি করেছেন মানুষ হিসেবে, কোনো ছেলে বা মেয়ে হিসেবে আলাদা করে নয়। আমার দুটি সন্তান রয়েছে (বয়স ১৪ ও ১২ বছর)। আলহামদুলিল্লাহ, আমার সন্তানেরা কখনোই আমাকে কোনো কষ্ট দেয় না। পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ নিজেরা নিয়মিত করে। আমার স্বামী খুবই সাপোর্টিভ, তার কারণেই আজকে আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি। আমার শাশুড়ি এবং আমার মা আমার সঙ্গে থাকেন। মা, শাশুড়ি, স্বামী এবং সন্তানদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছাড়া এটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরিবারের সবাই দেশকে ও জনগণকে ভালোবাসেন বলেই আমাকে উৎসাহ দেন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অবসর সময় আপনি কি করেন?
শামীমা পারভীন: অবসর সময়ে বাচ্চাদের সময় দিই, স্বামীর সঙ্গে কফি খাই। আমি যখন গাড়িতে থাকি-রাস্তায় তো প্রচুর ট্রাফিক জ্যাম থাকে, সেই সময়ে আমি প্রচুর পড়াশোনা করি। পুলিশের বাইরের সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করি। বর্তমানে আমি পিএইচডি করছি। সত্যি বলতে আমার অবসর যদি বলেন, তবে গাড়িতে বসার সময়টাই আমার অবসর, আর সেই সময়টাকেই আমি কাজে লাগাই। আর বাকি সময় সন্তান এবং স্বামীকে দিই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শামীমা পারভীন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
একান্ত সাক্ষাৎকার: শামীমা পারভীন
এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন। তিনি এই জেলার প্রথম নারী এসপি। তিনি ঢাকা জেলার ৯৮তম এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সাইবার অপরাধ দমন, জুলাই আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা, পারিবারিক জীবনসহ নানা বিষয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে কথা বলেছেন শামীমা পারভীন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের বিশেষ প্রতিনিধি আয়নাল হোসেন।

এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না
আয়নাল হোসেন

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি জীবনে আপনার ভালো ও মন্দ লাগার বিষয়গুলো কী?
শামীমা পারভীন: বিসিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট চয়েস হিসেবে পুলিশ দিয়েছিলাম। মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিলাম। তবে বেসিক ট্রেনিং শেষ করে কাজে যোগ দিয়েই একটা ধাক্কা খেয়েছি। আমার স্বপ্নগুলো ওখানেই বলতে পারেন শেষ হয়ে গিয়েছে। পুলিশের চাকরিতে ২০ বছর শেষ করলাম এই ২১ আগস্ট। এর মধ্যে ১৮ বছরের অধিকাংশ সময় স্বপ্নগুলোকে একদম দমিয়ে আমি কাজগুলো করেছি। যেখানেই থেকেছি, পুলিশিং সরাসরি হয়তো করতে পারিনি, আমি ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে চাকরি করেছি। কিন্তু তারপরও আমার মনোবল খুবই ভালো ছিল। আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। আমি মনে করি কোনো সময় দুঃসময় না যদি আপনি সেই সময়টাকে ব্যবহার করতে জানেন। পুলিশের প্রশিক্ষণই একজন পুলিশকে তৈরি করে। বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ট্রেনিং দিয়েছি। যখন কেউ বলে 'স্যার, আমি আপনার ছাত্র'-এটা অনেক ভালো লাগার জায়গা। চাকরির ক্ষেত্রে বলি, পুলিশে অনেক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে। পলিসি লেভেলে সিদ্ধান্ত দিতে চাই। বাস্তবে এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, মানুষ যেভাবে আশা করে সেভাবে আস্থা, বিশ্বাস নিয়ে আইনি সেবা পেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি ঢাকা জেলার ৯৮তম এবং প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনকে আপনি কী ব্যক্তিগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে নারী পুলিশদের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। আমি বলব, একজন নারীকে আজ ঢাকা জেলার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দিয়েছে এই সরকার। এটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং জব। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর পার্টিসিপেশন প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদেরকে দেখে অন্য নারীরা আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আগে আমাদের 'ফোর্স' হিসেবে দেখা হতো। আপনারা জানেন, এখন আমরা 'সার্ভিস’ হিসেবে গণ্য করি। তো সার্ভিস ওরিয়েন্টেড পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটি থানায় যারা কাজ করে, তাদের কিন্তু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যে সাধারণ জনগণ ভিকটিম বলেন অথবা ভিকটিমের কোনো আত্মীয়-স্বজন বা যেই থানায় সেবা নিতে আসবে—সার্ভিসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় যেন না ঘটে। যারা আস্থার সঙ্গে পুলিশ স্টেশনে আসে তারা যেন সেই আস্থা এবং বিশ্বাস নিয়েই ফিরে যেতে পারে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়—এ বিষয়টা আমরা এনশিওর করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনার স্বামী জাতীয় সংসদের হুইপ ও সরকার দলীয় এমপি রকিবুল ইসলাম বকুল। এ কারণে সরকারি দলের প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব আসে কি না?
শামীমা পারভীন: আমি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেছি ২০০৬ সালে এবং আমার বিয়ে হয়েছে ২০১০ সালে। আমি চাকরিটাই কিন্তু আগে পেয়েছি। আমি মনে করি আমি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মচারী। কর্মচারী হিসাবে আমার রাষ্ট্রের প্রতি এবং জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্বটা পালন করতে আমি কখনোই পিছপা হই না। আমি মনে করি যে, অপরাধীদের আসলে কোনো দল থাকে না। যে অপরাধী, আমরা তার অপরাধটা দমন করার ক্ষেত্রে কাজ করি, আইন প্রয়োগ করি। আর পার্সোনালি (ব্যক্তিগতভাবে) আমার রাজনৈতিক কোনো আদর্শ মানসিকভাবে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে সেটা প্রয়োগের কোনো সুযোগই নাই।
সিজেডএন টোয়ন্টিফোর: ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাজে শৈথল্য এসেছে। পুলিশের আগে সেই শক্তি ফিরে পেতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
শামীমা পারভীন: জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আমাদের পুলিশের ওপর দিয়ে একটা ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু বিপথগামী সদস্যর কর্মকাণ্ডের জন্য আজকে আমাদের সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে খেসারত দিতে হচ্ছে। সেই কারণে পুলিশের মনোবলে ঘাটতি আছে। এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন বেসিক ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে কাজ করছি যাতে আমরা পুলিশের যে হারানো মনোবল, সেটা যেন বৃদ্ধি করতে পারি এবং আমরা সঠিকভাবে আমাদের সার্ভিসগুলো প্রোভাইড করতে পারি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: মাদক, কিশোর গ্যাং এবং সাইবার অপরাধ বর্তমানে বড় সামাজিক ব্যাধি। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় ঢাকা জেলা পুলিশ কী ধরনের কঠোর বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে?
শামীমা পারভীন: প্রত্যেকটি অপরাধ দমন করাই আমাদের অগ্রাধিকার। মাদক থেকেই কিন্তু অন্যান্য ক্রাইমগুলো হয়। শুরু হয় হয়তো মাদক দিয়েই। আমরা নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের আগামী প্রজন্ম বা ভবিষ্যৎ এই মাদকের ভয়াবহতায় হারিয়ে যাচ্ছে এবং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি রেখেছি মাদক কীভাবে নির্মূল করা যায় এবং এর সঙ্গে যেসব বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী জড়িত তাদের ধরার জন্য আমরা কাজ করছি। এছাড়া আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা লুট হওয়া অস্ত্র রিকভারি করতে বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট করছি। অস্ত্র উদ্ধারে তল্লাশি করা হচ্ছে। যারা সন্দেহভাজন আছে তাদেরও আমরা গ্রেপ্তার করছি। সেই সঙ্গে যারা মাদকসেবী অথবা মাদকের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—তাদেরও আমরা অ্যারেস্ট করছি। ইদানিং কিশোর গ্যাংও কিন্তু এই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু বারবার বলছি এটা পুলিশের একার কাজ না। আমাদের প্রত্যেক অভিভাবক, পিতা-মাতা, স্কুলের শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা আছেন বা সমাজে যারা নেতৃত্ব দেন সিভিল সোসাইটি—আমরা সেই কমিউনিটিকে আহ্বান জানাব। আমরা কমিউনিটি পুলিশিং কিন্তু নতুন করে শুরু করেছি। তো সবাইকে আপনাদের মাধ্যমে আমি আহ্বান জানাব-প্লিজ আপনারা সকলে আপনাদের সন্তান, আপনাদের পরিবারের সদস্যদের দিকে নজর রাখুন, তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে। এটা করতে পারলে আমরা কিন্তু এই কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কাজ করতে পারব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ঢাকা জেলার অধীনে বেশ কিছু শিল্পাঞ্চল রয়েছে, যেখানে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এসব শিল্প এলাকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী?
শামীমা পারভীন: আপনি জানেন আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জে বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব এলাকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশও কিন্তু কাজ করে। এখানে অনেক লোক আছে যারা আসলে দেখা যাচ্ছে যে হয়তোবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, কিন্তু গভর্মেন্টকে স্যাবোটেজ করার জন্য বা আনরেস্ট করার জন্য দেখা যাচ্ছে কাজ করে থাকে। এ ধরনের যারা শ্রমিক লিডার আছেন, তাদের অপতৎপরতাকে রুখে দেওয়ার জন্য আমরা তাদের সার্ভিলেন্সে রাখি। আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। মালিকপক্ষকেও আমরা জানাতে চাই যে, আপনাদের যারা শ্রমিক আছে, তাদের নির্ধারিত সময়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করুন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া থানায় এসে সেবা পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে আপনি কী ধরনের তদারকি করছেন?
শামীমা পারভীন: আমাদের থানা লেভেলে যখন কোনো ভিকটিম অথবা তাদের পরিবারের কোনো সদস্য বা যেকোনো সাধারণ জনগণ যখনই আসবে, প্রথমত তাকে (পুলিশ সদস্য) ভেরি ওয়েলকামিং হতে হবে। আমি নির্দেশনা দিয়েছি এবং সেই সঙ্গে আরেকটা বিষয় বারবারই বলি, যিনি থানায় আসবেন তার কোনো পরিচয় দেখার দরকার নেই। তিনি আমার কাছে সার্ভিস নিতে এসেছেন, আমি সেই লক্ষ্যে কাজ করব। কোনো ধরনের অন্যায়, অবৈধ বিষয় যেন সার্ভিসগ্রহীতাদের সঙ্গে কেউ প্রয়োগ না করে—আমি কঠোরভাবে তাদের মনিটরিং করি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (হাইতি) এবং আন্তর্জাতিক নারী পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনে (আইডব্লিউপিএ) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মাঠপর্যায়ে ঢাকা জেলা পুলিশ পরিচালনায় আপনাকে কীভাবে সাহায্য করছে?
শামীমা পারভীন: চাকরি জীবনে এটা আমার জন্য খুবই বড় একটা পাওয়া। আমি হাইতি মিশনে ১৬ মাস ১৪০ জন নারী সদস্যকে নিয়ে ছিলাম। স্থানীয় জনগণের যে দুর্দশা, আমরা তাদের জন্য কাজ করেছি। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যেভাবে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য আমরা কাজ করেছি। ৫০টিরও বেশি দেশ সেখানে কাজ করেছে। সেখানে থাকার ফলে আমি সব দেশের পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় পুলিশ ও জনগণের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। সেখান থেকে আসলে যে এক্সপেরিয়েন্স গ্যাদার করেছি—বলতে পারেন রেজিলিয়েন্স, নলেজ, কনফিডেন্স-সবকিছুই কিন্তু এখন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে প্রথম ক্রাইমে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেকটাই কাজে দিচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অতি সম্প্রতি আপনি এশিয়ান পুলিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের (এসপিএসসি) উপদেষ্টা মনোনীত হয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আপনি কতটুকু গুরুত্ব দেন?
শামীমা পারভীন: আমরা যদি খেলাধুলা করি, তাহলে কিন্তু আমাদের মেধার বিকাশ ঘটে, ফিজিক্যাল ফিটনেস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। আমাদের থাকার জায়গাটা খুব একটা সুন্দর না, আমাদের অনেক ধরনের প্রবলেম আছে। তো সেই প্রবলেমকে যদি মিনিমাইজ করতে চাই, নিজেকে সবল রাখতে চাই, মনোবল বাড়াতে চাই—সেক্ষেত্রে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। সারা বাংলাদেশে পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও ফিটনেসের জন্য কালচারাল প্রোগ্রাম ও স্পোর্টস সবসময় থাকতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পিআরবি মেনে কী থানার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে?
শামীমা পারভীন: পিআরবি-(পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) হচ্ছে পুলিশের প্রাণ। আমরা পিআরবি ফলো করেই কিন্তু পুলিশিং কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করি। পিআরবিসহ পেনাল কোড, সিআরপিসি, পুলিশ অ্যাক্ট বা অন্যান্য যেসব আইন আছে সেগুলোতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট আসছে। এসব ফলো করেই আমরা মূলত কাজ করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি ও সংসার দুটো বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কীভাবে আমার মা সবকিছু ম্যানেজ করতেন। আমরা চার ভাই-বোন। আমার মা এবং বাবা দুজনেই সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার বাবা আমাকে তৈরি করেছেন মানুষ হিসেবে, কোনো ছেলে বা মেয়ে হিসেবে আলাদা করে নয়। আমার দুটি সন্তান রয়েছে (বয়স ১৪ ও ১২ বছর)। আলহামদুলিল্লাহ, আমার সন্তানেরা কখনোই আমাকে কোনো কষ্ট দেয় না। পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ নিজেরা নিয়মিত করে। আমার স্বামী খুবই সাপোর্টিভ, তার কারণেই আজকে আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি। আমার শাশুড়ি এবং আমার মা আমার সঙ্গে থাকেন। মা, শাশুড়ি, স্বামী এবং সন্তানদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছাড়া এটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরিবারের সবাই দেশকে ও জনগণকে ভালোবাসেন বলেই আমাকে উৎসাহ দেন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অবসর সময় আপনি কি করেন?
শামীমা পারভীন: অবসর সময়ে বাচ্চাদের সময় দিই, স্বামীর সঙ্গে কফি খাই। আমি যখন গাড়িতে থাকি-রাস্তায় তো প্রচুর ট্রাফিক জ্যাম থাকে, সেই সময়ে আমি প্রচুর পড়াশোনা করি। পুলিশের বাইরের সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করি। বর্তমানে আমি পিএইচডি করছি। সত্যি বলতে আমার অবসর যদি বলেন, তবে গাড়িতে বসার সময়টাই আমার অবসর, আর সেই সময়টাকেই আমি কাজে লাগাই। আর বাকি সময় সন্তান এবং স্বামীকে দিই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শামীমা পারভীন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি জীবনে আপনার ভালো ও মন্দ লাগার বিষয়গুলো কী?
শামীমা পারভীন: বিসিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট চয়েস হিসেবে পুলিশ দিয়েছিলাম। মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিলাম। তবে বেসিক ট্রেনিং শেষ করে কাজে যোগ দিয়েই একটা ধাক্কা খেয়েছি। আমার স্বপ্নগুলো ওখানেই বলতে পারেন শেষ হয়ে গিয়েছে। পুলিশের চাকরিতে ২০ বছর শেষ করলাম এই ২১ আগস্ট। এর মধ্যে ১৮ বছরের অধিকাংশ সময় স্বপ্নগুলোকে একদম দমিয়ে আমি কাজগুলো করেছি। যেখানেই থেকেছি, পুলিশিং সরাসরি হয়তো করতে পারিনি, আমি ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে চাকরি করেছি। কিন্তু তারপরও আমার মনোবল খুবই ভালো ছিল। আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। আমি মনে করি কোনো সময় দুঃসময় না যদি আপনি সেই সময়টাকে ব্যবহার করতে জানেন। পুলিশের প্রশিক্ষণই একজন পুলিশকে তৈরি করে। বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ট্রেনিং দিয়েছি। যখন কেউ বলে 'স্যার, আমি আপনার ছাত্র'-এটা অনেক ভালো লাগার জায়গা। চাকরির ক্ষেত্রে বলি, পুলিশে অনেক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে। পলিসি লেভেলে সিদ্ধান্ত দিতে চাই। বাস্তবে এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, মানুষ যেভাবে আশা করে সেভাবে আস্থা, বিশ্বাস নিয়ে আইনি সেবা পেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি ঢাকা জেলার ৯৮তম এবং প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনকে আপনি কী ব্যক্তিগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে নারী পুলিশদের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। আমি বলব, একজন নারীকে আজ ঢাকা জেলার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দিয়েছে এই সরকার। এটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং জব। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর পার্টিসিপেশন প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদেরকে দেখে অন্য নারীরা আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আগে আমাদের 'ফোর্স' হিসেবে দেখা হতো। আপনারা জানেন, এখন আমরা 'সার্ভিস’ হিসেবে গণ্য করি। তো সার্ভিস ওরিয়েন্টেড পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটি থানায় যারা কাজ করে, তাদের কিন্তু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যে সাধারণ জনগণ ভিকটিম বলেন অথবা ভিকটিমের কোনো আত্মীয়-স্বজন বা যেই থানায় সেবা নিতে আসবে—সার্ভিসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় যেন না ঘটে। যারা আস্থার সঙ্গে পুলিশ স্টেশনে আসে তারা যেন সেই আস্থা এবং বিশ্বাস নিয়েই ফিরে যেতে পারে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়—এ বিষয়টা আমরা এনশিওর করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনার স্বামী জাতীয় সংসদের হুইপ ও সরকার দলীয় এমপি রকিবুল ইসলাম বকুল। এ কারণে সরকারি দলের প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব আসে কি না?
শামীমা পারভীন: আমি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেছি ২০০৬ সালে এবং আমার বিয়ে হয়েছে ২০১০ সালে। আমি চাকরিটাই কিন্তু আগে পেয়েছি। আমি মনে করি আমি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মচারী। কর্মচারী হিসাবে আমার রাষ্ট্রের প্রতি এবং জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্বটা পালন করতে আমি কখনোই পিছপা হই না। আমি মনে করি যে, অপরাধীদের আসলে কোনো দল থাকে না। যে অপরাধী, আমরা তার অপরাধটা দমন করার ক্ষেত্রে কাজ করি, আইন প্রয়োগ করি। আর পার্সোনালি (ব্যক্তিগতভাবে) আমার রাজনৈতিক কোনো আদর্শ মানসিকভাবে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে সেটা প্রয়োগের কোনো সুযোগই নাই।
সিজেডএন টোয়ন্টিফোর: ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাজে শৈথল্য এসেছে। পুলিশের আগে সেই শক্তি ফিরে পেতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
শামীমা পারভীন: জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আমাদের পুলিশের ওপর দিয়ে একটা ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু বিপথগামী সদস্যর কর্মকাণ্ডের জন্য আজকে আমাদের সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে খেসারত দিতে হচ্ছে। সেই কারণে পুলিশের মনোবলে ঘাটতি আছে। এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন বেসিক ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে কাজ করছি যাতে আমরা পুলিশের যে হারানো মনোবল, সেটা যেন বৃদ্ধি করতে পারি এবং আমরা সঠিকভাবে আমাদের সার্ভিসগুলো প্রোভাইড করতে পারি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: মাদক, কিশোর গ্যাং এবং সাইবার অপরাধ বর্তমানে বড় সামাজিক ব্যাধি। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় ঢাকা জেলা পুলিশ কী ধরনের কঠোর বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে?
শামীমা পারভীন: প্রত্যেকটি অপরাধ দমন করাই আমাদের অগ্রাধিকার। মাদক থেকেই কিন্তু অন্যান্য ক্রাইমগুলো হয়। শুরু হয় হয়তো মাদক দিয়েই। আমরা নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের আগামী প্রজন্ম বা ভবিষ্যৎ এই মাদকের ভয়াবহতায় হারিয়ে যাচ্ছে এবং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি রেখেছি মাদক কীভাবে নির্মূল করা যায় এবং এর সঙ্গে যেসব বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী জড়িত তাদের ধরার জন্য আমরা কাজ করছি। এছাড়া আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা লুট হওয়া অস্ত্র রিকভারি করতে বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট করছি। অস্ত্র উদ্ধারে তল্লাশি করা হচ্ছে। যারা সন্দেহভাজন আছে তাদেরও আমরা গ্রেপ্তার করছি। সেই সঙ্গে যারা মাদকসেবী অথবা মাদকের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—তাদেরও আমরা অ্যারেস্ট করছি। ইদানিং কিশোর গ্যাংও কিন্তু এই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু বারবার বলছি এটা পুলিশের একার কাজ না। আমাদের প্রত্যেক অভিভাবক, পিতা-মাতা, স্কুলের শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা আছেন বা সমাজে যারা নেতৃত্ব দেন সিভিল সোসাইটি—আমরা সেই কমিউনিটিকে আহ্বান জানাব। আমরা কমিউনিটি পুলিশিং কিন্তু নতুন করে শুরু করেছি। তো সবাইকে আপনাদের মাধ্যমে আমি আহ্বান জানাব-প্লিজ আপনারা সকলে আপনাদের সন্তান, আপনাদের পরিবারের সদস্যদের দিকে নজর রাখুন, তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে। এটা করতে পারলে আমরা কিন্তু এই কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কাজ করতে পারব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ঢাকা জেলার অধীনে বেশ কিছু শিল্পাঞ্চল রয়েছে, যেখানে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এসব শিল্প এলাকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী?
শামীমা পারভীন: আপনি জানেন আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জে বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব এলাকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশও কিন্তু কাজ করে। এখানে অনেক লোক আছে যারা আসলে দেখা যাচ্ছে যে হয়তোবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, কিন্তু গভর্মেন্টকে স্যাবোটেজ করার জন্য বা আনরেস্ট করার জন্য দেখা যাচ্ছে কাজ করে থাকে। এ ধরনের যারা শ্রমিক লিডার আছেন, তাদের অপতৎপরতাকে রুখে দেওয়ার জন্য আমরা তাদের সার্ভিলেন্সে রাখি। আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। মালিকপক্ষকেও আমরা জানাতে চাই যে, আপনাদের যারা শ্রমিক আছে, তাদের নির্ধারিত সময়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করুন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া থানায় এসে সেবা পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে আপনি কী ধরনের তদারকি করছেন?
শামীমা পারভীন: আমাদের থানা লেভেলে যখন কোনো ভিকটিম অথবা তাদের পরিবারের কোনো সদস্য বা যেকোনো সাধারণ জনগণ যখনই আসবে, প্রথমত তাকে (পুলিশ সদস্য) ভেরি ওয়েলকামিং হতে হবে। আমি নির্দেশনা দিয়েছি এবং সেই সঙ্গে আরেকটা বিষয় বারবারই বলি, যিনি থানায় আসবেন তার কোনো পরিচয় দেখার দরকার নেই। তিনি আমার কাছে সার্ভিস নিতে এসেছেন, আমি সেই লক্ষ্যে কাজ করব। কোনো ধরনের অন্যায়, অবৈধ বিষয় যেন সার্ভিসগ্রহীতাদের সঙ্গে কেউ প্রয়োগ না করে—আমি কঠোরভাবে তাদের মনিটরিং করি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (হাইতি) এবং আন্তর্জাতিক নারী পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনে (আইডব্লিউপিএ) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মাঠপর্যায়ে ঢাকা জেলা পুলিশ পরিচালনায় আপনাকে কীভাবে সাহায্য করছে?
শামীমা পারভীন: চাকরি জীবনে এটা আমার জন্য খুবই বড় একটা পাওয়া। আমি হাইতি মিশনে ১৬ মাস ১৪০ জন নারী সদস্যকে নিয়ে ছিলাম। স্থানীয় জনগণের যে দুর্দশা, আমরা তাদের জন্য কাজ করেছি। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যেভাবে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য আমরা কাজ করেছি। ৫০টিরও বেশি দেশ সেখানে কাজ করেছে। সেখানে থাকার ফলে আমি সব দেশের পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় পুলিশ ও জনগণের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। সেখান থেকে আসলে যে এক্সপেরিয়েন্স গ্যাদার করেছি—বলতে পারেন রেজিলিয়েন্স, নলেজ, কনফিডেন্স-সবকিছুই কিন্তু এখন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে প্রথম ক্রাইমে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেকটাই কাজে দিচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অতি সম্প্রতি আপনি এশিয়ান পুলিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের (এসপিএসসি) উপদেষ্টা মনোনীত হয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আপনি কতটুকু গুরুত্ব দেন?
শামীমা পারভীন: আমরা যদি খেলাধুলা করি, তাহলে কিন্তু আমাদের মেধার বিকাশ ঘটে, ফিজিক্যাল ফিটনেস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। আমাদের থাকার জায়গাটা খুব একটা সুন্দর না, আমাদের অনেক ধরনের প্রবলেম আছে। তো সেই প্রবলেমকে যদি মিনিমাইজ করতে চাই, নিজেকে সবল রাখতে চাই, মনোবল বাড়াতে চাই—সেক্ষেত্রে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। সারা বাংলাদেশে পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও ফিটনেসের জন্য কালচারাল প্রোগ্রাম ও স্পোর্টস সবসময় থাকতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পিআরবি মেনে কী থানার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে?
শামীমা পারভীন: পিআরবি-(পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) হচ্ছে পুলিশের প্রাণ। আমরা পিআরবি ফলো করেই কিন্তু পুলিশিং কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করি। পিআরবিসহ পেনাল কোড, সিআরপিসি, পুলিশ অ্যাক্ট বা অন্যান্য যেসব আইন আছে সেগুলোতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট আসছে। এসব ফলো করেই আমরা মূলত কাজ করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি ও সংসার দুটো বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কীভাবে আমার মা সবকিছু ম্যানেজ করতেন। আমরা চার ভাই-বোন। আমার মা এবং বাবা দুজনেই সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার বাবা আমাকে তৈরি করেছেন মানুষ হিসেবে, কোনো ছেলে বা মেয়ে হিসেবে আলাদা করে নয়। আমার দুটি সন্তান রয়েছে (বয়স ১৪ ও ১২ বছর)। আলহামদুলিল্লাহ, আমার সন্তানেরা কখনোই আমাকে কোনো কষ্ট দেয় না। পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ নিজেরা নিয়মিত করে। আমার স্বামী খুবই সাপোর্টিভ, তার কারণেই আজকে আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি। আমার শাশুড়ি এবং আমার মা আমার সঙ্গে থাকেন। মা, শাশুড়ি, স্বামী এবং সন্তানদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছাড়া এটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরিবারের সবাই দেশকে ও জনগণকে ভালোবাসেন বলেই আমাকে উৎসাহ দেন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অবসর সময় আপনি কি করেন?
শামীমা পারভীন: অবসর সময়ে বাচ্চাদের সময় দিই, স্বামীর সঙ্গে কফি খাই। আমি যখন গাড়িতে থাকি-রাস্তায় তো প্রচুর ট্রাফিক জ্যাম থাকে, সেই সময়ে আমি প্রচুর পড়াশোনা করি। পুলিশের বাইরের সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করি। বর্তমানে আমি পিএইচডি করছি। সত্যি বলতে আমার অবসর যদি বলেন, তবে গাড়িতে বসার সময়টাই আমার অবসর, আর সেই সময়টাকেই আমি কাজে লাগাই। আর বাকি সময় সন্তান এবং স্বামীকে দিই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শামীমা পারভীন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না
আয়নাল হোসেন

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি জীবনে আপনার ভালো ও মন্দ লাগার বিষয়গুলো কী?
শামীমা পারভীন: বিসিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট চয়েস হিসেবে পুলিশ দিয়েছিলাম। মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিলাম। তবে বেসিক ট্রেনিং শেষ করে কাজে যোগ দিয়েই একটা ধাক্কা খেয়েছি। আমার স্বপ্নগুলো ওখানেই বলতে পারেন শেষ হয়ে গিয়েছে। পুলিশের চাকরিতে ২০ বছর শেষ করলাম এই ২১ আগস্ট। এর মধ্যে ১৮ বছরের অধিকাংশ সময় স্বপ্নগুলোকে একদম দমিয়ে আমি কাজগুলো করেছি। যেখানেই থেকেছি, পুলিশিং সরাসরি হয়তো করতে পারিনি, আমি ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে চাকরি করেছি। কিন্তু তারপরও আমার মনোবল খুবই ভালো ছিল। আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। আমি মনে করি কোনো সময় দুঃসময় না যদি আপনি সেই সময়টাকে ব্যবহার করতে জানেন। পুলিশের প্রশিক্ষণই একজন পুলিশকে তৈরি করে। বিসিএস ক্যাডার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ট্রেনিং দিয়েছি। যখন কেউ বলে 'স্যার, আমি আপনার ছাত্র'-এটা অনেক ভালো লাগার জায়গা। চাকরির ক্ষেত্রে বলি, পুলিশে অনেক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে। পলিসি লেভেলে সিদ্ধান্ত দিতে চাই। বাস্তবে এমন একটি পুলিশ বাহিনী দেখতে চাই, যেখানে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না, মানুষ যেভাবে আশা করে সেভাবে আস্থা, বিশ্বাস নিয়ে আইনি সেবা পেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি ঢাকা জেলার ৯৮তম এবং প্রথম নারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এই ঐতিহাসিক অর্জনকে আপনি কী ব্যক্তিগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে নারী পুলিশদের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। আমি বলব, একজন নারীকে আজ ঢাকা জেলার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব দিয়েছে এই সরকার। এটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং জব। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর পার্টিসিপেশন প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আমাদেরকে দেখে অন্য নারীরা আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। আগে আমাদের 'ফোর্স' হিসেবে দেখা হতো। আপনারা জানেন, এখন আমরা 'সার্ভিস’ হিসেবে গণ্য করি। তো সার্ভিস ওরিয়েন্টেড পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটি থানায় যারা কাজ করে, তাদের কিন্তু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যে সাধারণ জনগণ ভিকটিম বলেন অথবা ভিকটিমের কোনো আত্মীয়-স্বজন বা যেই থানায় সেবা নিতে আসবে—সার্ভিসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় যেন না ঘটে। যারা আস্থার সঙ্গে পুলিশ স্টেশনে আসে তারা যেন সেই আস্থা এবং বিশ্বাস নিয়েই ফিরে যেতে পারে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়—এ বিষয়টা আমরা এনশিওর করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনার স্বামী জাতীয় সংসদের হুইপ ও সরকার দলীয় এমপি রকিবুল ইসলাম বকুল। এ কারণে সরকারি দলের প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব আসে কি না?
শামীমা পারভীন: আমি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেছি ২০০৬ সালে এবং আমার বিয়ে হয়েছে ২০১০ সালে। আমি চাকরিটাই কিন্তু আগে পেয়েছি। আমি মনে করি আমি বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মচারী। কর্মচারী হিসাবে আমার রাষ্ট্রের প্রতি এবং জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, সেই দায়িত্বটা পালন করতে আমি কখনোই পিছপা হই না। আমি মনে করি যে, অপরাধীদের আসলে কোনো দল থাকে না। যে অপরাধী, আমরা তার অপরাধটা দমন করার ক্ষেত্রে কাজ করি, আইন প্রয়োগ করি। আর পার্সোনালি (ব্যক্তিগতভাবে) আমার রাজনৈতিক কোনো আদর্শ মানসিকভাবে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে সেটা প্রয়োগের কোনো সুযোগই নাই।
সিজেডএন টোয়ন্টিফোর: ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের কাজে শৈথল্য এসেছে। পুলিশের আগে সেই শক্তি ফিরে পেতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
শামীমা পারভীন: জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আমাদের পুলিশের ওপর দিয়ে একটা ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটেছে। সেই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু বিপথগামী সদস্যর কর্মকাণ্ডের জন্য আজকে আমাদের সমস্ত পুলিশ বাহিনীকে খেসারত দিতে হচ্ছে। সেই কারণে পুলিশের মনোবলে ঘাটতি আছে। এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন বেসিক ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে কাজ করছি যাতে আমরা পুলিশের যে হারানো মনোবল, সেটা যেন বৃদ্ধি করতে পারি এবং আমরা সঠিকভাবে আমাদের সার্ভিসগুলো প্রোভাইড করতে পারি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: মাদক, কিশোর গ্যাং এবং সাইবার অপরাধ বর্তমানে বড় সামাজিক ব্যাধি। তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় ঢাকা জেলা পুলিশ কী ধরনের কঠোর বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে?
শামীমা পারভীন: প্রত্যেকটি অপরাধ দমন করাই আমাদের অগ্রাধিকার। মাদক থেকেই কিন্তু অন্যান্য ক্রাইমগুলো হয়। শুরু হয় হয়তো মাদক দিয়েই। আমরা নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের আগামী প্রজন্ম বা ভবিষ্যৎ এই মাদকের ভয়াবহতায় হারিয়ে যাচ্ছে এবং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমি আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি রেখেছি মাদক কীভাবে নির্মূল করা যায় এবং এর সঙ্গে যেসব বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী জড়িত তাদের ধরার জন্য আমরা কাজ করছি। এছাড়া আমাদের হারিয়ে যাওয়া বা লুট হওয়া অস্ত্র রিকভারি করতে বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট করছি। অস্ত্র উদ্ধারে তল্লাশি করা হচ্ছে। যারা সন্দেহভাজন আছে তাদেরও আমরা গ্রেপ্তার করছি। সেই সঙ্গে যারা মাদকসেবী অথবা মাদকের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—তাদেরও আমরা অ্যারেস্ট করছি। ইদানিং কিশোর গ্যাংও কিন্তু এই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু বারবার বলছি এটা পুলিশের একার কাজ না। আমাদের প্রত্যেক অভিভাবক, পিতা-মাতা, স্কুলের শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা আছেন বা সমাজে যারা নেতৃত্ব দেন সিভিল সোসাইটি—আমরা সেই কমিউনিটিকে আহ্বান জানাব। আমরা কমিউনিটি পুলিশিং কিন্তু নতুন করে শুরু করেছি। তো সবাইকে আপনাদের মাধ্যমে আমি আহ্বান জানাব-প্লিজ আপনারা সকলে আপনাদের সন্তান, আপনাদের পরিবারের সদস্যদের দিকে নজর রাখুন, তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে। এটা করতে পারলে আমরা কিন্তু এই কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কাজ করতে পারব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ঢাকা জেলার অধীনে বেশ কিছু শিল্পাঞ্চল রয়েছে, যেখানে প্রায়ই শ্রমিক অসন্তোষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এসব শিল্প এলাকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আপনার বিশেষ পরিকল্পনা কী?
শামীমা পারভীন: আপনি জানেন আশুলিয়া, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জে বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব এলাকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশও কিন্তু কাজ করে। এখানে অনেক লোক আছে যারা আসলে দেখা যাচ্ছে যে হয়তোবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, কিন্তু গভর্মেন্টকে স্যাবোটেজ করার জন্য বা আনরেস্ট করার জন্য দেখা যাচ্ছে কাজ করে থাকে। এ ধরনের যারা শ্রমিক লিডার আছেন, তাদের অপতৎপরতাকে রুখে দেওয়ার জন্য আমরা তাদের সার্ভিলেন্সে রাখি। আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। মালিকপক্ষকেও আমরা জানাতে চাই যে, আপনাদের যারা শ্রমিক আছে, তাদের নির্ধারিত সময়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করুন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া থানায় এসে সেবা পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে আপনি কী ধরনের তদারকি করছেন?
শামীমা পারভীন: আমাদের থানা লেভেলে যখন কোনো ভিকটিম অথবা তাদের পরিবারের কোনো সদস্য বা যেকোনো সাধারণ জনগণ যখনই আসবে, প্রথমত তাকে (পুলিশ সদস্য) ভেরি ওয়েলকামিং হতে হবে। আমি নির্দেশনা দিয়েছি এবং সেই সঙ্গে আরেকটা বিষয় বারবারই বলি, যিনি থানায় আসবেন তার কোনো পরিচয় দেখার দরকার নেই। তিনি আমার কাছে সার্ভিস নিতে এসেছেন, আমি সেই লক্ষ্যে কাজ করব। কোনো ধরনের অন্যায়, অবৈধ বিষয় যেন সার্ভিসগ্রহীতাদের সঙ্গে কেউ প্রয়োগ না করে—আমি কঠোরভাবে তাদের মনিটরিং করি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (হাইতি) এবং আন্তর্জাতিক নারী পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনে (আইডব্লিউপিএ) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা মাঠপর্যায়ে ঢাকা জেলা পুলিশ পরিচালনায় আপনাকে কীভাবে সাহায্য করছে?
শামীমা পারভীন: চাকরি জীবনে এটা আমার জন্য খুবই বড় একটা পাওয়া। আমি হাইতি মিশনে ১৬ মাস ১৪০ জন নারী সদস্যকে নিয়ে ছিলাম। স্থানীয় জনগণের যে দুর্দশা, আমরা তাদের জন্য কাজ করেছি। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা যেভাবে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স বা জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য আমরা কাজ করেছি। ৫০টিরও বেশি দেশ সেখানে কাজ করেছে। সেখানে থাকার ফলে আমি সব দেশের পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় পুলিশ ও জনগণের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। সেখান থেকে আসলে যে এক্সপেরিয়েন্স গ্যাদার করেছি—বলতে পারেন রেজিলিয়েন্স, নলেজ, কনফিডেন্স-সবকিছুই কিন্তু এখন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে প্রথম ক্রাইমে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেকটাই কাজে দিচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অতি সম্প্রতি আপনি এশিয়ান পুলিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের (এসপিএসসি) উপদেষ্টা মনোনীত হয়েছেন। পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব ও মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আপনি কতটুকু গুরুত্ব দেন?
শামীমা পারভীন: আমরা যদি খেলাধুলা করি, তাহলে কিন্তু আমাদের মেধার বিকাশ ঘটে, ফিজিক্যাল ফিটনেস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। আমাদের থাকার জায়গাটা খুব একটা সুন্দর না, আমাদের অনেক ধরনের প্রবলেম আছে। তো সেই প্রবলেমকে যদি মিনিমাইজ করতে চাই, নিজেকে সবল রাখতে চাই, মনোবল বাড়াতে চাই—সেক্ষেত্রে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। সারা বাংলাদেশে পুলিশের মনোবল বৃদ্ধি ও ফিটনেসের জন্য কালচারাল প্রোগ্রাম ও স্পোর্টস সবসময় থাকতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পিআরবি মেনে কী থানার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে?
শামীমা পারভীন: পিআরবি-(পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল) হচ্ছে পুলিশের প্রাণ। আমরা পিআরবি ফলো করেই কিন্তু পুলিশিং কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করি। পিআরবিসহ পেনাল কোড, সিআরপিসি, পুলিশ অ্যাক্ট বা অন্যান্য যেসব আইন আছে সেগুলোতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনী বা অ্যামেন্ডমেন্ট আসছে। এসব ফলো করেই আমরা মূলত কাজ করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: চাকরি ও সংসার দুটো বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?
শামীমা পারভীন: আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কীভাবে আমার মা সবকিছু ম্যানেজ করতেন। আমরা চার ভাই-বোন। আমার মা এবং বাবা দুজনেই সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার বাবা আমাকে তৈরি করেছেন মানুষ হিসেবে, কোনো ছেলে বা মেয়ে হিসেবে আলাদা করে নয়। আমার দুটি সন্তান রয়েছে (বয়স ১৪ ও ১২ বছর)। আলহামদুলিল্লাহ, আমার সন্তানেরা কখনোই আমাকে কোনো কষ্ট দেয় না। পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ নিজেরা নিয়মিত করে। আমার স্বামী খুবই সাপোর্টিভ, তার কারণেই আজকে আমি এই জায়গায় আসতে পেরেছি। আমার শাশুড়ি এবং আমার মা আমার সঙ্গে থাকেন। মা, শাশুড়ি, স্বামী এবং সন্তানদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছাড়া এটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। পরিবারের সবাই দেশকে ও জনগণকে ভালোবাসেন বলেই আমাকে উৎসাহ দেন।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অবসর সময় আপনি কি করেন?
শামীমা পারভীন: অবসর সময়ে বাচ্চাদের সময় দিই, স্বামীর সঙ্গে কফি খাই। আমি যখন গাড়িতে থাকি-রাস্তায় তো প্রচুর ট্রাফিক জ্যাম থাকে, সেই সময়ে আমি প্রচুর পড়াশোনা করি। পুলিশের বাইরের সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করি। বর্তমানে আমি পিএইচডি করছি। সত্যি বলতে আমার অবসর যদি বলেন, তবে গাড়িতে বসার সময়টাই আমার অবসর, আর সেই সময়টাকেই আমি কাজে লাগাই। আর বাকি সময় সন্তান এবং স্বামীকে দিই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শামীমা পারভীন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।









