শিরোনাম
সাক্ষাৎকার

ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ বাজেটের ভালো দিক

ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ বাজেটের ভালো দিক
ড. গোলাম রসুল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি একজন লেখক ও গবেষক। এবারের বাজেট নিয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের বিশেষ আয়োজন ‘বাজেট ২০২৬-২৭, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা’ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন । এই অনুষ্ঠানে তিনি বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকিসহ নানাদিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য দুই পর্বে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমগ্ন সৌর।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: এবারের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা আসলে কতটা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আপনি মনে করছেন?

ড. গোলাম রসুল: এই বছর জিডিপির গ্রোথ খুবই কম ৪ শতাংশের মতো। এই গ্রোথ ৬/৭ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। সরকার এই টার্গেট করেই জিডিপি গ্রোথের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বর্তমান বাস্তবতায় মনে হচ্ছে, এটা একটু কঠিন হবে। কারণ আমাদের প্রাইভেট সেক্টর একটু স্থবির হয়ে আছে। সেক্ষেত্রে এই টার্গেটটা একটু অ্যামবিশাস মনে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে আমাদের ইকোনমিক গ্রোথ একসময় ছয়, সাত এমনকি ৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। সেই কোভিডের সময় থেকে গ্রোথটা কমতে থাকে। আমরা যদি আমাদের প্রোডাক্টিভ যে সেক্টরগুলো আছে বিশেষ করে বিজনেস সেক্টর, বেসরকারি খাত-এসব চাঙা করতে পারি তাহলে এই গ্রোথটা এচিভ করা সম্ভব।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: এই বাজেটে আর কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে?

ড. গোলাম রসুল: এই বাজেটে সোশ্যাল সেক্টরগুলোকে বেশ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এটা আমাদের দরকার ছিল। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে কিন্তু এই ব্যয় আরও বেশি। গত কয়েক বছরে আমাদের দেশের দারিদ্র্যের হারটা একটু বেড়েছে। প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি লোক এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। তাদেরকে যদি আপনি সামাজিক সুরক্ষা দিতে না পারেন, তবে এটা শুধু বর্তমান না ভবিষ্যতের জন্যও একটা রিস্ক তৈরি করবে। সেজন্য সরকার এবার সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে হাইয়েস্ট বাজেট দিয়েছে।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী যারা আছেন তাদের দিকেও কিন্তু এই বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. গোলাম রসুল: এটা ভালো। কিন্তু উদ্যোগটা এখনো খুবই ছোট। আমাদের দেশে বয়স্কদের জন্য একটা নতুন পলিসি দরকার। আমাদের ডেমোগ্রাফি কিন্তু চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। একসময় মানুষের গড় আয়ু অনেক কম ছিল। এখন গড় আয়ু ৭৩ হয়ে গেছে, আরও বাড়ছে। গড় আয়ু বাড়ার কারণে আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাচ্ছে। কাজেই ভবিষ্যতে সরকার হয়তো এদিকে আরও বেশি নজর দেবে। তবে এই বাজেটে অল্প অল্প কিছু করছে। যেমন একটি উদাহরণ দিই, ৬৫ বছরের বেশি সিনিয়র সিটিজেনদের ট্রেনে সম্পূর্ণ ফ্রি এবং মেট্রোলের টিকেট ২৫ শতাংশ কম করা হয়েছে। তারপরে যারা বয়স্ক তাদের চিকিৎসার কিছু সামগ্রীর আমদানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স কমানো হয়েছে। যদিও ইটস এ ভেরি স্মল বিগিনিং বাট ইটস এ গুড বিগিনিং। বয়স্কদের জন্য আমাদের ভবিষ্যতে আরো বেশি চিন্তা করতে হবে।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন ছিল তখন আমাদের দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারে স্থবির হয়েছিল, অনেকটা বন্ধ বলা চলে। এই বাজেটে বর্তমান সরকার ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো সুবিধা বা সহজীকরণের ব্যবস্থা করছে কি না?

ড. গোলাম রসুল: আপনি খুব ভালো প্রশ্ন করেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে খুব খারাপ সময় গেছে। প্রাইভেট সেক্টর একেবারে মুখথুবড়ে পড়েছিল। এক্ষেত্রে আমি দেখলাম এই বাজেটে একটা চমৎকার জিনিস হচ্ছে। ব্যবসাকে সহজীকরণ করার জন্য একটা স্পেশাল সেকশন রাখা হয়েছে। আগে রেগুলেট বা কন্ট্রোল করা হতো। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবেনা। কিন্তু বেশি রেগুলেশন করলে খরচটা অনেক বেড়ে যায়। কস্ট অফ ডুইং বিজনেসটা অনেক বেড়ে যায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা আইএমএফ-এর অনেকগুলো স্টাডিতে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশের কস্ট অফ ডুইং বিজনেস অনেকবেশি এবং এটাকে সহজ করতে হবে। এবার বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পেশাল কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কী কী করা হয়েছে?

ড. গোলাম রসুল: আমরা সবসময় চাচ্ছি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ুক এবং আমাদের যে কতগুলো স্পেশাল ইকোনমিক জোন করা হচ্ছে, এগুলোর টার্গেট বিদেশি বিনিয়োগ। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ তেমন বাড়ছে না।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিলো। বিশাল সম্মেলন করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হয়নি। এবার কী হতে পারে?

ড. গোলাম রসুল: আপনি ঠিকই বলেছেন যে, বিশাল আন্তর্জাতিক সম্মেলন করা হয়েছিল বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য। কিন্তু দরকার ছিল বিনিয়োগের এনভারনমেন্ট ক্রিয়েট করা। সেইদিকে মনোযোগ না দিয়ে খালি বিদেশিদের ঢাকঢোল পিটিয়ে আনা হয়েছিল। তারা এখানে ব্যবসা করলে সেফটি দেখবে। বিনিয়োগের এনভারনমেন্ট কেমন সেটা দেখবে। প্রফিট করলে তা দেশে নিতে পারবে কিনা বা বিজনেসটা এখানে ভালোভাবে করতে পারবে কিনা, কোনো প্রতিবন্ধকতা ফেস করবে কিনা এসব দেখবে। তো এইসব জায়গা ঠিক না করে শুধু বড় বড় সম্মেলন করলে তো হবে না। নিজের দেশের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা সহজ না করে বাইরের দেশের মানুষের জন্য সহজ করে আসলে কতটুকু লাভবান হবো? বাইরের বিনিয়োগকারী কিন্তু দেশীয় একজনের সঙ্গে পার্টনার হয়েই আসে। কাজেই দেশে বিনিয়োগের এনভায়রনমেন্ট আগে ভালো করতে হবে। তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমার মনে হয় এবারের বাজেটে ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো কিছু না কিছু টাচ করা হয়েছে। আশা করি বিষয়টি ব্যবসার সহজীকরণের জন্য কিছুটা হলেও হেল্প হবে।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আরেকটা বিষয় করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে। এটি আসলে সাধারণ মানুষের কতটা উপকার করবে?

ড. গোলাম রসুল: এটা তেমন কোন প্রভাব ফেলবে না। এটা আমি বলব আরও অনেক বাড়ানো দরকার। করমুক্ত আয় ২৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে আমাদের ইনফ্লেশন কত হয়েছে? এখন ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করমুক্ত আয়কে আমি যদি ১২ দিয়ে ভাগ দিই তাহলে প্রতি মাসে ৩১ হাজার টাকা আমার ইনকাম। আপনি মাসে ৩১ হাজার টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে কোথাও থাকতে পারবেন? বসবাস করতে পারবেন? বাসা ভাড়া দিয়ে ও কোনোভাবে বাসে চড়েওতো সংসার চলবে না। আমাদের এমন একটা করমুক্ত আয় দরকার যেটা দিয়ে একজন মানুষের ডিসেন্ট লিভিং হবে। কাজেই আমার মতে, এই করমুক্ত আয়টা আরও বাড়ানো উচিত।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জনপ্রিয় টার্ম কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের কদর অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং ভালো আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছে। সরকার এই বাজেটে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ড. গোলাম রসুল: আমি বিষয়টিকে খুব পজিটিভলি দেখছি। আমাদের তো জনবহুল দেশ। জনগণকে সম্পদে পরিণত করতে হবে, এদেরকে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের যারা শিক্ষিত শ্রেণি এ সমস্ত কাজে জড়িত হচ্ছে, বিভিন্ন রকম কন্টেন্ট ক্রিয়েট করছে এবং এগুলো থেকে আর্ন করছে, তাদের ওপর যদি আমরা ট্যাক্স চাপিয়ে দিই তাহলে ইনিশিয়াল স্টেজে গ্রোথ নষ্ট হবে। তাদেরকে এখন সাপোর্ট দিতে হবে। কারণ আলটিমেটলি আমাদের ইকোনমিটাকে কিন্তু নলেজ ইকোনমিতে ট্রান্সফার করতে হবে। আমাদের জিডিপিতে এই সেক্টরটা আরও কন্ট্রিবিউট করতে পারে। আমার মনে হয় ইটস এ গুড ডিসিশন।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. গোলাম রসুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

/বিবি/