
রাজউকে এখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই

রাজউকে এখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই
সেলিনা আক্তার

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সরকারি চাকরিতে আপনি একেবারেই নতুন। রাজউকের মতো একটি বড় সংস্থার দায়িত্ব আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: সরকারি চাকরিতে বা চেয়ারম্যান পদে আমি নতুন হতে পারি, তবে রাজউকে পাঁচ মাসের বেশি সময় সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা ও কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সরকার আমাকে চেয়ারম্যান করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি নিজেকে মাঠপর্যায়ের কর্মী মনে করি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি একটি রাজনৈতিক দল সমর্থিত পেশাজীবী সংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত। রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কি দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করছি। নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে বহু পরিচিত রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি এবং প্রয়োজন হলে সিলগালাও করেছি। কোনো তদবির গ্রহণ করিনি। সরকারও আমাকে আইন ও বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই কারও রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ বা অনিয়মই আমাদের বিবেচ্য বিষয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ভবনের নকশা (প্ল্যান) অনুমোদন নিয়ে শহরবাসীর ভোগান্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই ভোগান্তি দূর করতে আপনি কী কী সংস্কার এনেছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: বর্তমানে পুরো নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া অনলাইনে হচ্ছে। গ্রাহকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। অনলাইনে প্ল্যানিং পারমিট নেওয়ার পর নকশা জমা দেওয়া হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী ২৪ কর্মদিবসের মধ্যে ইমারত নির্মাণ (বিসি) কমিটি সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর ছয় কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো ত্রুটি থাকলে সেটিও অনলাইন আইডিতে জানিয়ে দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে একজন আবেদনকারী তার ফাইলের চূড়ান্ত অবস্থা জানতে পারেন। কেউ যদি দুর্নীতির অভিযোগ করেন, তাহলে নির্দিষ্ট তথ্য দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ এত বছরেও পুরোপুরি বসবাসযোগ্য হয়নি। এ নিয়ে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ আছে কি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: পূর্বাচল ১৯৯৫ সালের একটি প্রকল্প। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি, এত বড় প্রকল্পে জরুরি বহির্গমন পথের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও পরিকল্পনায় ছিল না। আবার প্রকল্পটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর- এই তিন জেলার মধ্যে হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়েরও সমস্যা রয়েছে।
রাজউকের কাজ অবকাঠামো নির্মাণ করে তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা। ইতোমধ্যে ১ থেকে ১৫ নম্বর সেক্টরে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। গ্যাস সংযোগ সরকারি নীতির কারণে নতুন করে দেওয়া হচ্ছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি সেক্টরের প্লট মালিকদের দ্রুত ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী প্লট বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে পূর্বাচলে স্কুল, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে বলে আশা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পূর্বাচলের ‘পঞ্চম সংশোধনী’ নিয়ে কেন বার বার কথা উঠছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আদালতের নির্দেশনার পর পঞ্চম সংশোধনী কার্যত আর নেই। বর্তমানে চতুর্থ সংশোধনীর আওতায় কাজ চলছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের প্রয়োজন হলে আদালতকে অবহিত করেই তা করা হবে। আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন জলাশয়, বনভূমি, খেলার মাঠ বা পরিবেশ নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন করা যাবে না। আমরা সেই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করছি। আবাসিক প্লট নিয়ে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: উচ্চ আদালতের এই রায়ের পর সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি কি কাউকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। একজন চেয়ারম্যান এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রতিটি ফাইল সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক ও সদস্যদের মাধ্যমে বোর্ডে আসে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া হয় না। বর্তমান বোর্ডে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, বুয়েটের প্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও সুশীল সমাজের সদস্যরা রয়েছেন। ফলে সব সিদ্ধান্ত জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। আমরা এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের মূল কাজ নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজউক মূল কাজ বাদ দিয়ে লাভজনক ফ্ল্যাট ও প্লট ব্যবসায় বেশি ঝুঁকছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আমরা নতুন করে প্লট ব্যবসায় যাচ্ছি না। পূর্বাচল ও ঝিলমিলে যে সরকারি জমি রয়েছে, সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উত্তরায় কর্মজীবী নারী, রিকশাচালক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভাড়াভিত্তিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি লাভের জন্য নয়, প্রয়োজন হলে সরকারি ভর্তুকি দিয়েও স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: হাতিরঝিল লেকের রক্ষণাবেক্ষণে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। সরকারপ্রধান ক্ষোভ প্রকাশের পর আপনারা তড়িঘড়ি অভিযানে নামলেন, এর আগে কেন নামেননি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: হাতিরঝিলে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলে। তবে ঈদুল আজহার আগে-পরে ছুটির সময় কিছু গাফিলতির কারণে ময়লা জমে যায় এবং সেটিই সবার নজরে আসে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরার পর আমরা দ্রুত পুরো এলাকা পরিষ্কার করেছি। এই ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যর্থতা ছিল, সেটি আমি স্বীকার করছি।
তবে হাতিরঝিলের মূল সমস্যা পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং আশপাশের এলাকার পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি লেকে এসে পড়া। এই সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এখন একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে বর্জ্যের উৎসই বন্ধ করা যায়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: গুলশান, বনানী বা বারিধারার কিছু বিতর্কিত ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্লট বিভিন্ন মহলের কাছে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে, যা বিগত দুই যুগেও কেউ কব্জা করতে পারেনি। এই প্লটগুলো হঠাৎ ছাড়ার পেছনে কারণ কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: কোনো বিতর্কিত প্লট কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয়নি। আদালতের চূড়ান্ত রায় যাদের পক্ষে এসেছে, রাজউক কেবল সেই রায় বাস্তবায়ন করছে। জালিয়াতি ঠেকাতে আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করছি। একই নাম ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি দাবি করলে সিআইডির তদন্ত, প্রকৃত ওয়ারিশ যাচাই, এমনকি প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। সব সিদ্ধান্ত বোর্ডের মাধ্যমে এবং নথিপত্র যাচাই করেই নেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকে আসার পর আপনি করতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি, এমন কী কী কাজ আছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: ১৯৫৩ সালের আইনে রাজউক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য। গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, ঝিলমিলসহ পরিকল্পিত যেসব এলাকা রয়েছে, সেগুলো রাজউকের পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে। তাই প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা থাকলেও এর অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দায়িত্ব নিয়ে দেখেছি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। অতীতে বিভিন্নভাবে বিশেষ অবদানের নামে প্লট বরাদ্দ হয়েছে, সেগুলো এখন যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের কমিটিও কাজ করছে।
অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তারা জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ নেই; সমস্যা বেশি নিচের স্তরে। তাই সেখানেই সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বেপরোয়া কর্মকর্তাদের লাগাম টানতে আপনি কী কী করছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাচ্ছি, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে কাউকে জেল দেওয়ার ক্ষমতা চেয়ারম্যানের নেই, সেটি আদালতের বিষয়।
অনেক সময় অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে আসে না। আবার এমনও দেখা যায়, কেউ কেউ নিজেরাই কর্মকর্তাদের বকশিশ দেন। একজন পরিচিত ডেভেলপার আমাকে বলেছেন, এখন আগের তুলনায় অনেক কম টাকা দিতে হয়, কিন্তু ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তিনি নিজেই দিয়েছেন। আমি তাকে বলেছি, কেউ যদি স্বেচ্ছায় টাকা দেন, তাহলে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। দুর্নীতি প্রতিরোধে সেবাগ্রহীতাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ডেভেলপার নিজেরাই অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করেন। নকশা তারা নিজেরাই তৈরি করে অনুমোদন নেন, কিন্তু নির্মাণের সময় অতিরিক্ত জায়গা দখল বা অন্য অনিয়ম করেন। এরপর কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় যাতে তারা ব্যবস্থা না নেন। তাই দায় শুধু রাজউকের নয়; নিয়ম ভঙ্গকারী ডেভেলপার ও জমির মালিকদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। অতীতে এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে, এখন আমরা তা বন্ধ করার চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।
রাজউকে এখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই


রাজউকে এখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই
সেলিনা আক্তার

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সরকারি চাকরিতে আপনি একেবারেই নতুন। রাজউকের মতো একটি বড় সংস্থার দায়িত্ব আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: সরকারি চাকরিতে বা চেয়ারম্যান পদে আমি নতুন হতে পারি, তবে রাজউকে পাঁচ মাসের বেশি সময় সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা ও কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সরকার আমাকে চেয়ারম্যান করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি নিজেকে মাঠপর্যায়ের কর্মী মনে করি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি একটি রাজনৈতিক দল সমর্থিত পেশাজীবী সংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত। রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কি দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করছি। নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে বহু পরিচিত রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি এবং প্রয়োজন হলে সিলগালাও করেছি। কোনো তদবির গ্রহণ করিনি। সরকারও আমাকে আইন ও বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই কারও রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ বা অনিয়মই আমাদের বিবেচ্য বিষয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ভবনের নকশা (প্ল্যান) অনুমোদন নিয়ে শহরবাসীর ভোগান্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই ভোগান্তি দূর করতে আপনি কী কী সংস্কার এনেছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: বর্তমানে পুরো নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া অনলাইনে হচ্ছে। গ্রাহকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। অনলাইনে প্ল্যানিং পারমিট নেওয়ার পর নকশা জমা দেওয়া হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী ২৪ কর্মদিবসের মধ্যে ইমারত নির্মাণ (বিসি) কমিটি সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর ছয় কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো ত্রুটি থাকলে সেটিও অনলাইন আইডিতে জানিয়ে দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে একজন আবেদনকারী তার ফাইলের চূড়ান্ত অবস্থা জানতে পারেন। কেউ যদি দুর্নীতির অভিযোগ করেন, তাহলে নির্দিষ্ট তথ্য দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ এত বছরেও পুরোপুরি বসবাসযোগ্য হয়নি। এ নিয়ে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ আছে কি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: পূর্বাচল ১৯৯৫ সালের একটি প্রকল্প। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি, এত বড় প্রকল্পে জরুরি বহির্গমন পথের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও পরিকল্পনায় ছিল না। আবার প্রকল্পটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর- এই তিন জেলার মধ্যে হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়েরও সমস্যা রয়েছে।
রাজউকের কাজ অবকাঠামো নির্মাণ করে তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা। ইতোমধ্যে ১ থেকে ১৫ নম্বর সেক্টরে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। গ্যাস সংযোগ সরকারি নীতির কারণে নতুন করে দেওয়া হচ্ছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি সেক্টরের প্লট মালিকদের দ্রুত ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী প্লট বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে পূর্বাচলে স্কুল, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে বলে আশা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পূর্বাচলের ‘পঞ্চম সংশোধনী’ নিয়ে কেন বার বার কথা উঠছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আদালতের নির্দেশনার পর পঞ্চম সংশোধনী কার্যত আর নেই। বর্তমানে চতুর্থ সংশোধনীর আওতায় কাজ চলছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের প্রয়োজন হলে আদালতকে অবহিত করেই তা করা হবে। আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন জলাশয়, বনভূমি, খেলার মাঠ বা পরিবেশ নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন করা যাবে না। আমরা সেই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করছি। আবাসিক প্লট নিয়ে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: উচ্চ আদালতের এই রায়ের পর সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি কি কাউকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। একজন চেয়ারম্যান এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রতিটি ফাইল সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক ও সদস্যদের মাধ্যমে বোর্ডে আসে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া হয় না। বর্তমান বোর্ডে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, বুয়েটের প্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও সুশীল সমাজের সদস্যরা রয়েছেন। ফলে সব সিদ্ধান্ত জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। আমরা এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের মূল কাজ নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজউক মূল কাজ বাদ দিয়ে লাভজনক ফ্ল্যাট ও প্লট ব্যবসায় বেশি ঝুঁকছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আমরা নতুন করে প্লট ব্যবসায় যাচ্ছি না। পূর্বাচল ও ঝিলমিলে যে সরকারি জমি রয়েছে, সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উত্তরায় কর্মজীবী নারী, রিকশাচালক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভাড়াভিত্তিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি লাভের জন্য নয়, প্রয়োজন হলে সরকারি ভর্তুকি দিয়েও স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: হাতিরঝিল লেকের রক্ষণাবেক্ষণে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। সরকারপ্রধান ক্ষোভ প্রকাশের পর আপনারা তড়িঘড়ি অভিযানে নামলেন, এর আগে কেন নামেননি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: হাতিরঝিলে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলে। তবে ঈদুল আজহার আগে-পরে ছুটির সময় কিছু গাফিলতির কারণে ময়লা জমে যায় এবং সেটিই সবার নজরে আসে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরার পর আমরা দ্রুত পুরো এলাকা পরিষ্কার করেছি। এই ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যর্থতা ছিল, সেটি আমি স্বীকার করছি।
তবে হাতিরঝিলের মূল সমস্যা পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং আশপাশের এলাকার পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি লেকে এসে পড়া। এই সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এখন একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে বর্জ্যের উৎসই বন্ধ করা যায়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: গুলশান, বনানী বা বারিধারার কিছু বিতর্কিত ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্লট বিভিন্ন মহলের কাছে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে, যা বিগত দুই যুগেও কেউ কব্জা করতে পারেনি। এই প্লটগুলো হঠাৎ ছাড়ার পেছনে কারণ কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: কোনো বিতর্কিত প্লট কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয়নি। আদালতের চূড়ান্ত রায় যাদের পক্ষে এসেছে, রাজউক কেবল সেই রায় বাস্তবায়ন করছে। জালিয়াতি ঠেকাতে আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করছি। একই নাম ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি দাবি করলে সিআইডির তদন্ত, প্রকৃত ওয়ারিশ যাচাই, এমনকি প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। সব সিদ্ধান্ত বোর্ডের মাধ্যমে এবং নথিপত্র যাচাই করেই নেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকে আসার পর আপনি করতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি, এমন কী কী কাজ আছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: ১৯৫৩ সালের আইনে রাজউক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য। গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, ঝিলমিলসহ পরিকল্পিত যেসব এলাকা রয়েছে, সেগুলো রাজউকের পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে। তাই প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা থাকলেও এর অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দায়িত্ব নিয়ে দেখেছি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। অতীতে বিভিন্নভাবে বিশেষ অবদানের নামে প্লট বরাদ্দ হয়েছে, সেগুলো এখন যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের কমিটিও কাজ করছে।
অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তারা জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ নেই; সমস্যা বেশি নিচের স্তরে। তাই সেখানেই সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বেপরোয়া কর্মকর্তাদের লাগাম টানতে আপনি কী কী করছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাচ্ছি, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে কাউকে জেল দেওয়ার ক্ষমতা চেয়ারম্যানের নেই, সেটি আদালতের বিষয়।
অনেক সময় অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে আসে না। আবার এমনও দেখা যায়, কেউ কেউ নিজেরাই কর্মকর্তাদের বকশিশ দেন। একজন পরিচিত ডেভেলপার আমাকে বলেছেন, এখন আগের তুলনায় অনেক কম টাকা দিতে হয়, কিন্তু ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তিনি নিজেই দিয়েছেন। আমি তাকে বলেছি, কেউ যদি স্বেচ্ছায় টাকা দেন, তাহলে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। দুর্নীতি প্রতিরোধে সেবাগ্রহীতাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ডেভেলপার নিজেরাই অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করেন। নকশা তারা নিজেরাই তৈরি করে অনুমোদন নেন, কিন্তু নির্মাণের সময় অতিরিক্ত জায়গা দখল বা অন্য অনিয়ম করেন। এরপর কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় যাতে তারা ব্যবস্থা না নেন। তাই দায় শুধু রাজউকের নয়; নিয়ম ভঙ্গকারী ডেভেলপার ও জমির মালিকদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। অতীতে এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে, এখন আমরা তা বন্ধ করার চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সরকারি চাকরিতে আপনি একেবারেই নতুন। রাজউকের মতো একটি বড় সংস্থার দায়িত্ব আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: সরকারি চাকরিতে বা চেয়ারম্যান পদে আমি নতুন হতে পারি, তবে রাজউকে পাঁচ মাসের বেশি সময় সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা ও কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সরকার আমাকে চেয়ারম্যান করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি নিজেকে মাঠপর্যায়ের কর্মী মনে করি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি একটি রাজনৈতিক দল সমর্থিত পেশাজীবী সংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত। রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কি দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করছি। নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে বহু পরিচিত রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি এবং প্রয়োজন হলে সিলগালাও করেছি। কোনো তদবির গ্রহণ করিনি। সরকারও আমাকে আইন ও বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই কারও রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ বা অনিয়মই আমাদের বিবেচ্য বিষয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ভবনের নকশা (প্ল্যান) অনুমোদন নিয়ে শহরবাসীর ভোগান্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই ভোগান্তি দূর করতে আপনি কী কী সংস্কার এনেছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: বর্তমানে পুরো নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া অনলাইনে হচ্ছে। গ্রাহকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। অনলাইনে প্ল্যানিং পারমিট নেওয়ার পর নকশা জমা দেওয়া হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী ২৪ কর্মদিবসের মধ্যে ইমারত নির্মাণ (বিসি) কমিটি সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর ছয় কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো ত্রুটি থাকলে সেটিও অনলাইন আইডিতে জানিয়ে দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে একজন আবেদনকারী তার ফাইলের চূড়ান্ত অবস্থা জানতে পারেন। কেউ যদি দুর্নীতির অভিযোগ করেন, তাহলে নির্দিষ্ট তথ্য দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ এত বছরেও পুরোপুরি বসবাসযোগ্য হয়নি। এ নিয়ে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ আছে কি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: পূর্বাচল ১৯৯৫ সালের একটি প্রকল্প। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি, এত বড় প্রকল্পে জরুরি বহির্গমন পথের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও পরিকল্পনায় ছিল না। আবার প্রকল্পটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর- এই তিন জেলার মধ্যে হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়েরও সমস্যা রয়েছে।
রাজউকের কাজ অবকাঠামো নির্মাণ করে তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা। ইতোমধ্যে ১ থেকে ১৫ নম্বর সেক্টরে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। গ্যাস সংযোগ সরকারি নীতির কারণে নতুন করে দেওয়া হচ্ছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি সেক্টরের প্লট মালিকদের দ্রুত ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী প্লট বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে পূর্বাচলে স্কুল, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে বলে আশা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পূর্বাচলের ‘পঞ্চম সংশোধনী’ নিয়ে কেন বার বার কথা উঠছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আদালতের নির্দেশনার পর পঞ্চম সংশোধনী কার্যত আর নেই। বর্তমানে চতুর্থ সংশোধনীর আওতায় কাজ চলছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের প্রয়োজন হলে আদালতকে অবহিত করেই তা করা হবে। আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন জলাশয়, বনভূমি, খেলার মাঠ বা পরিবেশ নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন করা যাবে না। আমরা সেই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করছি। আবাসিক প্লট নিয়ে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: উচ্চ আদালতের এই রায়ের পর সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি কি কাউকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। একজন চেয়ারম্যান এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রতিটি ফাইল সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক ও সদস্যদের মাধ্যমে বোর্ডে আসে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া হয় না। বর্তমান বোর্ডে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, বুয়েটের প্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও সুশীল সমাজের সদস্যরা রয়েছেন। ফলে সব সিদ্ধান্ত জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। আমরা এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের মূল কাজ নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজউক মূল কাজ বাদ দিয়ে লাভজনক ফ্ল্যাট ও প্লট ব্যবসায় বেশি ঝুঁকছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আমরা নতুন করে প্লট ব্যবসায় যাচ্ছি না। পূর্বাচল ও ঝিলমিলে যে সরকারি জমি রয়েছে, সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উত্তরায় কর্মজীবী নারী, রিকশাচালক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভাড়াভিত্তিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি লাভের জন্য নয়, প্রয়োজন হলে সরকারি ভর্তুকি দিয়েও স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: হাতিরঝিল লেকের রক্ষণাবেক্ষণে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। সরকারপ্রধান ক্ষোভ প্রকাশের পর আপনারা তড়িঘড়ি অভিযানে নামলেন, এর আগে কেন নামেননি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: হাতিরঝিলে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলে। তবে ঈদুল আজহার আগে-পরে ছুটির সময় কিছু গাফিলতির কারণে ময়লা জমে যায় এবং সেটিই সবার নজরে আসে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরার পর আমরা দ্রুত পুরো এলাকা পরিষ্কার করেছি। এই ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যর্থতা ছিল, সেটি আমি স্বীকার করছি।
তবে হাতিরঝিলের মূল সমস্যা পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং আশপাশের এলাকার পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি লেকে এসে পড়া। এই সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এখন একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে বর্জ্যের উৎসই বন্ধ করা যায়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: গুলশান, বনানী বা বারিধারার কিছু বিতর্কিত ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্লট বিভিন্ন মহলের কাছে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে, যা বিগত দুই যুগেও কেউ কব্জা করতে পারেনি। এই প্লটগুলো হঠাৎ ছাড়ার পেছনে কারণ কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: কোনো বিতর্কিত প্লট কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয়নি। আদালতের চূড়ান্ত রায় যাদের পক্ষে এসেছে, রাজউক কেবল সেই রায় বাস্তবায়ন করছে। জালিয়াতি ঠেকাতে আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করছি। একই নাম ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি দাবি করলে সিআইডির তদন্ত, প্রকৃত ওয়ারিশ যাচাই, এমনকি প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। সব সিদ্ধান্ত বোর্ডের মাধ্যমে এবং নথিপত্র যাচাই করেই নেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকে আসার পর আপনি করতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি, এমন কী কী কাজ আছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: ১৯৫৩ সালের আইনে রাজউক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য। গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, ঝিলমিলসহ পরিকল্পিত যেসব এলাকা রয়েছে, সেগুলো রাজউকের পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে। তাই প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা থাকলেও এর অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দায়িত্ব নিয়ে দেখেছি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। অতীতে বিভিন্নভাবে বিশেষ অবদানের নামে প্লট বরাদ্দ হয়েছে, সেগুলো এখন যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের কমিটিও কাজ করছে।
অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তারা জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ নেই; সমস্যা বেশি নিচের স্তরে। তাই সেখানেই সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বেপরোয়া কর্মকর্তাদের লাগাম টানতে আপনি কী কী করছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাচ্ছি, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে কাউকে জেল দেওয়ার ক্ষমতা চেয়ারম্যানের নেই, সেটি আদালতের বিষয়।
অনেক সময় অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে আসে না। আবার এমনও দেখা যায়, কেউ কেউ নিজেরাই কর্মকর্তাদের বকশিশ দেন। একজন পরিচিত ডেভেলপার আমাকে বলেছেন, এখন আগের তুলনায় অনেক কম টাকা দিতে হয়, কিন্তু ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তিনি নিজেই দিয়েছেন। আমি তাকে বলেছি, কেউ যদি স্বেচ্ছায় টাকা দেন, তাহলে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। দুর্নীতি প্রতিরোধে সেবাগ্রহীতাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ডেভেলপার নিজেরাই অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করেন। নকশা তারা নিজেরাই তৈরি করে অনুমোদন নেন, কিন্তু নির্মাণের সময় অতিরিক্ত জায়গা দখল বা অন্য অনিয়ম করেন। এরপর কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় যাতে তারা ব্যবস্থা না নেন। তাই দায় শুধু রাজউকের নয়; নিয়ম ভঙ্গকারী ডেভেলপার ও জমির মালিকদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। অতীতে এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে, এখন আমরা তা বন্ধ করার চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

রাজউকে এখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই
সেলিনা আক্তার

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সরকারি চাকরিতে আপনি একেবারেই নতুন। রাজউকের মতো একটি বড় সংস্থার দায়িত্ব আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: সরকারি চাকরিতে বা চেয়ারম্যান পদে আমি নতুন হতে পারি, তবে রাজউকে পাঁচ মাসের বেশি সময় সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা ও কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সরকার আমাকে চেয়ারম্যান করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছি। আমি নিজেকে মাঠপর্যায়ের কর্মী মনে করি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আপনি একটি রাজনৈতিক দল সমর্থিত পেশাজীবী সংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত। রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কি দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করছি। নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে বহু পরিচিত রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিজে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি এবং প্রয়োজন হলে সিলগালাও করেছি। কোনো তদবির গ্রহণ করিনি। সরকারও আমাকে আইন ও বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই কারও রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ বা অনিয়মই আমাদের বিবেচ্য বিষয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ভবনের নকশা (প্ল্যান) অনুমোদন নিয়ে শহরবাসীর ভোগান্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই ভোগান্তি দূর করতে আপনি কী কী সংস্কার এনেছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: বর্তমানে পুরো নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া অনলাইনে হচ্ছে। গ্রাহকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। অনলাইনে প্ল্যানিং পারমিট নেওয়ার পর নকশা জমা দেওয়া হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী ২৪ কর্মদিবসের মধ্যে ইমারত নির্মাণ (বিসি) কমিটি সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর ছয় কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনো ত্রুটি থাকলে সেটিও অনলাইন আইডিতে জানিয়ে দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে একজন আবেদনকারী তার ফাইলের চূড়ান্ত অবস্থা জানতে পারেন। কেউ যদি দুর্নীতির অভিযোগ করেন, তাহলে নির্দিষ্ট তথ্য দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ এত বছরেও পুরোপুরি বসবাসযোগ্য হয়নি। এ নিয়ে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ আছে কি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: পূর্বাচল ১৯৯৫ সালের একটি প্রকল্প। দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখি, এত বড় প্রকল্পে জরুরি বহির্গমন পথের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও পরিকল্পনায় ছিল না। আবার প্রকল্পটি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর- এই তিন জেলার মধ্যে হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয়েরও সমস্যা রয়েছে।
রাজউকের কাজ অবকাঠামো নির্মাণ করে তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা। ইতোমধ্যে ১ থেকে ১৫ নম্বর সেক্টরে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। গ্যাস সংযোগ সরকারি নীতির কারণে নতুন করে দেওয়া হচ্ছে না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি সেক্টরের প্লট মালিকদের দ্রুত ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছি। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী প্লট বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে পূর্বাচলে স্কুল, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে বলে আশা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: পূর্বাচলের ‘পঞ্চম সংশোধনী’ নিয়ে কেন বার বার কথা উঠছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আদালতের নির্দেশনার পর পঞ্চম সংশোধনী কার্যত আর নেই। বর্তমানে চতুর্থ সংশোধনীর আওতায় কাজ চলছে। ভবিষ্যতে নতুন কোনো বাণিজ্যিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দের প্রয়োজন হলে আদালতকে অবহিত করেই তা করা হবে। আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন জলাশয়, বনভূমি, খেলার মাঠ বা পরিবেশ নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন করা যাবে না। আমরা সেই নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করছি। আবাসিক প্লট নিয়ে আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: উচ্চ আদালতের এই রায়ের পর সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে আপনি কি কাউকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই। একজন চেয়ারম্যান এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রতিটি ফাইল সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, পরিচালক ও সদস্যদের মাধ্যমে বোর্ডে আসে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া হয় না। বর্তমান বোর্ডে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, বুয়েটের প্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও সুশীল সমাজের সদস্যরা রয়েছেন। ফলে সব সিদ্ধান্ত জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। আমরা এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যেখানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ নেই।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকের মূল কাজ নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজউক মূল কাজ বাদ দিয়ে লাভজনক ফ্ল্যাট ও প্লট ব্যবসায় বেশি ঝুঁকছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আমরা নতুন করে প্লট ব্যবসায় যাচ্ছি না। পূর্বাচল ও ঝিলমিলে যে সরকারি জমি রয়েছে, সেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য আবাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উত্তরায় কর্মজীবী নারী, রিকশাচালক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভাড়াভিত্তিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি লাভের জন্য নয়, প্রয়োজন হলে সরকারি ভর্তুকি দিয়েও স্বল্প খরচে আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: হাতিরঝিল লেকের রক্ষণাবেক্ষণে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। সরকারপ্রধান ক্ষোভ প্রকাশের পর আপনারা তড়িঘড়ি অভিযানে নামলেন, এর আগে কেন নামেননি?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: হাতিরঝিলে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলে। তবে ঈদুল আজহার আগে-পরে ছুটির সময় কিছু গাফিলতির কারণে ময়লা জমে যায় এবং সেটিই সবার নজরে আসে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরার পর আমরা দ্রুত পুরো এলাকা পরিষ্কার করেছি। এই ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যর্থতা ছিল, সেটি আমি স্বীকার করছি।
তবে হাতিরঝিলের মূল সমস্যা পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং আশপাশের এলাকার পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি লেকে এসে পড়া। এই সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা এখন একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে বর্জ্যের উৎসই বন্ধ করা যায়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: গুলশান, বনানী বা বারিধারার কিছু বিতর্কিত ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্লট বিভিন্ন মহলের কাছে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে, যা বিগত দুই যুগেও কেউ কব্জা করতে পারেনি। এই প্লটগুলো হঠাৎ ছাড়ার পেছনে কারণ কী?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: কোনো বিতর্কিত প্লট কাউকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে দেওয়া হয়নি। আদালতের চূড়ান্ত রায় যাদের পক্ষে এসেছে, রাজউক কেবল সেই রায় বাস্তবায়ন করছে। জালিয়াতি ঠেকাতে আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করছি। একই নাম ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি দাবি করলে সিআইডির তদন্ত, প্রকৃত ওয়ারিশ যাচাই, এমনকি প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। সব সিদ্ধান্ত বোর্ডের মাধ্যমে এবং নথিপত্র যাচাই করেই নেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: রাজউকে আসার পর আপনি করতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি, এমন কী কী কাজ আছে?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: ১৯৫৩ সালের আইনে রাজউক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য। গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, পূর্বাচল, ঝিলমিলসহ পরিকল্পিত যেসব এলাকা রয়েছে, সেগুলো রাজউকের পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে। তাই প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা থাকলেও এর অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দায়িত্ব নিয়ে দেখেছি, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। অতীতে বিভিন্নভাবে বিশেষ অবদানের নামে প্লট বরাদ্দ হয়েছে, সেগুলো এখন যাচাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের কমিটিও কাজ করছে।
অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তারা জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ নেই; সমস্যা বেশি নিচের স্তরে। তাই সেখানেই সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বেপরোয়া কর্মকর্তাদের লাগাম টানতে আপনি কী কী করছেন?
মো. রিয়াজুল ইসলাম: যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাচ্ছি, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে কাউকে জেল দেওয়ার ক্ষমতা চেয়ারম্যানের নেই, সেটি আদালতের বিষয়।
অনেক সময় অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে আসে না। আবার এমনও দেখা যায়, কেউ কেউ নিজেরাই কর্মকর্তাদের বকশিশ দেন। একজন পরিচিত ডেভেলপার আমাকে বলেছেন, এখন আগের তুলনায় অনেক কম টাকা দিতে হয়, কিন্তু ভবিষ্যতের আশঙ্কায় তিনি নিজেই দিয়েছেন। আমি তাকে বলেছি, কেউ যদি স্বেচ্ছায় টাকা দেন, তাহলে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। দুর্নীতি প্রতিরোধে সেবাগ্রহীতাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ডেভেলপার নিজেরাই অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করেন। নকশা তারা নিজেরাই তৈরি করে অনুমোদন নেন, কিন্তু নির্মাণের সময় অতিরিক্ত জায়গা দখল বা অন্য অনিয়ম করেন। এরপর কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় যাতে তারা ব্যবস্থা না নেন। তাই দায় শুধু রাজউকের নয়; নিয়ম ভঙ্গকারী ডেভেলপার ও জমির মালিকদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। অতীতে এ ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলেছে, এখন আমরা তা বন্ধ করার চেষ্টা করছি।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মো. রিয়াজুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।



