
একান্ত সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ
ডেঙ্গু হলে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রতিবছর ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এ রোগ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। চলতি বছরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা এবং জনগণ ও সরকারের দায়িত্বসহ নানা বিষয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাশেদ রাব্বি।

ডেঙ্গু হলে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না
সিজেডএন ডেস্ক

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের দেশে প্রায় ২৬ বছর ধরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রার্দুভাব চলছে । মাঝেমাঝে এটি বড় আকারে আসে এবং সারাদেশে একটি মহামারির অবস্থা তৈরি হয়। তারপরেও আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আমরা কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গু অনেক পুরোনো রোগ। আমরা সবাই জানি এটা এডিস মশার কামড়ে হয়। ২০০০ সাল থেকেই মূলত এটি মহামারির আকার ধারণ করতে শুরু করে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, আগে ডেঙ্গুকে শহরের রোগ বলা হলেও এখন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে ডেঙ্গু হতো, এখন বছরের যেকোনো সময়ই হচ্ছে। ডেঙ্গু হলে প্রচণ্ড জ্বর ও সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা হয়। কয়েকদিন পর জ্বর কমে গেলে শরীরে র্যাশ ওঠে এবং রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্ত হলে জটিলতা ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে এখন এই জ্বর হলে সাধারণ জ্বরের মতো সর্দি-কাশি থাকে। শুরুতে রোগী বুঝতে পারে না যে তার ডেঙ্গু হয়েছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: মূলত মশার বংশবিস্তার কমানো না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বয়স্ক মশা নিধন করার পাশাপাশি মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। এগুলো কারও একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। শুধু সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আপনারা একটি গাইডলাইন তৈরি করেছিলেন, যেখানে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের কথা বলা হয়েছিল। এখনো দেখা যায়, চিকিৎসকদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: আমাদের চিকিৎসকরা এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ। তবে এখন ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। পাশাপাশি রোগীরাও অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। কারও জ্বর হলে শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। এতে রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কমে। প্রত্যন্ত এলাকায় ডেঙ্গু হলে রোগীকে বাঁচানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো মূলত শহরকেন্দ্রিক।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: একসময় এত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ছিল না। তখন আপনারা রোগীদের সুস্থ করেছেন। কিন্তু আইসিইউ চালু হওয়ার পর অনেক স্থানীয় চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে রোগী শহরে আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: এটিও একটি সমস্যা। আমরা সবসময় পরামর্শ দেই, উপজেলায় কারও ডেঙ্গু হলে ভয় না পেয়ে নিজ এলাকাতেই চিকিৎসা নিতে। রাজধানীতে চিকিৎসার জন্য আসতে আসতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। রোগী খাওয়া-দাওয়া করতে পারলে বেশি করে তরল খাবার খেতে হবে। শরীরে পর্যাপ্ত তরল রাখতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী ভালো থাকে। যারা খেতে পারেন না, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিরার মাধ্যমে তরল দেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে গেলে অনেক সময় জুনিয়র কনসালট্যান্ট বা মেডিকেল অফিসাররা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে দেখা যায়, এসব রোগীর কেউ কেউ ডেঙ্গু শকে চলে যান এবং আর সুস্থ হতে পারেন না। এসব চিকিৎসকের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে—এমন নয়। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোগী বয়স্ক হলে কিংবা হৃদরোগ, লিভার, কিডনি বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ থাকলে এবং ছোট শিশু হলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদেরও বাড়িতে কীভাবে যত্ন নিতে হবে- সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এবার অনেক শিশুও ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
ডেঙ্গু হয়েছে বলে নিজের ইচ্ছায় ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না। তবে ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্য কোনো সংক্রমণ বা রোগ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ডেঙ্গুর চিকিৎসা নয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর চিকিৎসায় কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন বেশ আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশেও এটি আনা হবে বলে শুনেছি। এটি কোন পর্যায়ে আছে?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন এখনো গণটিকাদানের পর্যায়ে আসেনি, এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে। ডেঙ্গুর ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ও কিউডেঙ্গা (Qdenga) নামে দুটি ভ্যাকসিন রয়েছে। ডেংভ্যাক্সিয়া সবাইকে দেওয়া যায় না। এটি ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের দেওয়া যায় এবং যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর। তবে যাদের আগে ডেঙ্গু হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমনকি গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে কিউডেঙ্গা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কাজ করে এবং ৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। তবে বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। যেসব দেশে এর ব্যবহার ও ট্রায়াল চলছে, সেসব দেশের ফলাফল আরও কিছুদিন দেখা যেতে পারে। কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার তথ্য সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে কীভাবে সচেতন করা যায়? সরকারেরই বা কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: জনগণকে মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে অনেক পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে। যেমন ছাদবাগান, ড্রাম, ফ্রিজের নিচসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। দুই দিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
এ ছাড়া ঘরের বাইরে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি জমলেও মশা জন্মাতে পারে। প্রশাসনকে এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জনগণ ও প্রশাসনকে যৌথভাবে এবং সমন্বিতভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দিনের বেলাতেও প্রয়োজনে মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের হাফপ্যান্ট পরানো যাবে না। তাদের শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতসহ ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ, উপসর্গ এবং করণীয় বিষয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে। এতে হয়তো ডেঙ্গু নির্মূল হবে না কিন্তু অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এবিএম আব্দুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
একান্ত সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ
ডেঙ্গু হলে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রতিবছর ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এ রোগ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। চলতি বছরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা এবং জনগণ ও সরকারের দায়িত্বসহ নানা বিষয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাশেদ রাব্বি।

ডেঙ্গু হলে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না
সিজেডএন ডেস্ক

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের দেশে প্রায় ২৬ বছর ধরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রার্দুভাব চলছে । মাঝেমাঝে এটি বড় আকারে আসে এবং সারাদেশে একটি মহামারির অবস্থা তৈরি হয়। তারপরেও আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আমরা কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গু অনেক পুরোনো রোগ। আমরা সবাই জানি এটা এডিস মশার কামড়ে হয়। ২০০০ সাল থেকেই মূলত এটি মহামারির আকার ধারণ করতে শুরু করে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, আগে ডেঙ্গুকে শহরের রোগ বলা হলেও এখন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে ডেঙ্গু হতো, এখন বছরের যেকোনো সময়ই হচ্ছে। ডেঙ্গু হলে প্রচণ্ড জ্বর ও সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা হয়। কয়েকদিন পর জ্বর কমে গেলে শরীরে র্যাশ ওঠে এবং রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্ত হলে জটিলতা ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে এখন এই জ্বর হলে সাধারণ জ্বরের মতো সর্দি-কাশি থাকে। শুরুতে রোগী বুঝতে পারে না যে তার ডেঙ্গু হয়েছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: মূলত মশার বংশবিস্তার কমানো না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বয়স্ক মশা নিধন করার পাশাপাশি মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। এগুলো কারও একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। শুধু সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আপনারা একটি গাইডলাইন তৈরি করেছিলেন, যেখানে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের কথা বলা হয়েছিল। এখনো দেখা যায়, চিকিৎসকদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: আমাদের চিকিৎসকরা এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ। তবে এখন ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। পাশাপাশি রোগীরাও অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। কারও জ্বর হলে শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। এতে রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কমে। প্রত্যন্ত এলাকায় ডেঙ্গু হলে রোগীকে বাঁচানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো মূলত শহরকেন্দ্রিক।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: একসময় এত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ছিল না। তখন আপনারা রোগীদের সুস্থ করেছেন। কিন্তু আইসিইউ চালু হওয়ার পর অনেক স্থানীয় চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে রোগী শহরে আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: এটিও একটি সমস্যা। আমরা সবসময় পরামর্শ দেই, উপজেলায় কারও ডেঙ্গু হলে ভয় না পেয়ে নিজ এলাকাতেই চিকিৎসা নিতে। রাজধানীতে চিকিৎসার জন্য আসতে আসতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। রোগী খাওয়া-দাওয়া করতে পারলে বেশি করে তরল খাবার খেতে হবে। শরীরে পর্যাপ্ত তরল রাখতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী ভালো থাকে। যারা খেতে পারেন না, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিরার মাধ্যমে তরল দেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে গেলে অনেক সময় জুনিয়র কনসালট্যান্ট বা মেডিকেল অফিসাররা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে দেখা যায়, এসব রোগীর কেউ কেউ ডেঙ্গু শকে চলে যান এবং আর সুস্থ হতে পারেন না। এসব চিকিৎসকের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে—এমন নয়। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোগী বয়স্ক হলে কিংবা হৃদরোগ, লিভার, কিডনি বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ থাকলে এবং ছোট শিশু হলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদেরও বাড়িতে কীভাবে যত্ন নিতে হবে- সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এবার অনেক শিশুও ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
ডেঙ্গু হয়েছে বলে নিজের ইচ্ছায় ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না। তবে ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্য কোনো সংক্রমণ বা রোগ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ডেঙ্গুর চিকিৎসা নয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর চিকিৎসায় কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন বেশ আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশেও এটি আনা হবে বলে শুনেছি। এটি কোন পর্যায়ে আছে?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন এখনো গণটিকাদানের পর্যায়ে আসেনি, এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে। ডেঙ্গুর ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ও কিউডেঙ্গা (Qdenga) নামে দুটি ভ্যাকসিন রয়েছে। ডেংভ্যাক্সিয়া সবাইকে দেওয়া যায় না। এটি ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের দেওয়া যায় এবং যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর। তবে যাদের আগে ডেঙ্গু হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমনকি গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে কিউডেঙ্গা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কাজ করে এবং ৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। তবে বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। যেসব দেশে এর ব্যবহার ও ট্রায়াল চলছে, সেসব দেশের ফলাফল আরও কিছুদিন দেখা যেতে পারে। কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার তথ্য সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে কীভাবে সচেতন করা যায়? সরকারেরই বা কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: জনগণকে মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে অনেক পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে। যেমন ছাদবাগান, ড্রাম, ফ্রিজের নিচসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। দুই দিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
এ ছাড়া ঘরের বাইরে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি জমলেও মশা জন্মাতে পারে। প্রশাসনকে এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জনগণ ও প্রশাসনকে যৌথভাবে এবং সমন্বিতভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দিনের বেলাতেও প্রয়োজনে মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের হাফপ্যান্ট পরানো যাবে না। তাদের শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতসহ ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ, উপসর্গ এবং করণীয় বিষয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে। এতে হয়তো ডেঙ্গু নির্মূল হবে না কিন্তু অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এবিএম আব্দুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের দেশে প্রায় ২৬ বছর ধরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রার্দুভাব চলছে । মাঝেমাঝে এটি বড় আকারে আসে এবং সারাদেশে একটি মহামারির অবস্থা তৈরি হয়। তারপরেও আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আমরা কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গু অনেক পুরোনো রোগ। আমরা সবাই জানি এটা এডিস মশার কামড়ে হয়। ২০০০ সাল থেকেই মূলত এটি মহামারির আকার ধারণ করতে শুরু করে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, আগে ডেঙ্গুকে শহরের রোগ বলা হলেও এখন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে ডেঙ্গু হতো, এখন বছরের যেকোনো সময়ই হচ্ছে। ডেঙ্গু হলে প্রচণ্ড জ্বর ও সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা হয়। কয়েকদিন পর জ্বর কমে গেলে শরীরে র্যাশ ওঠে এবং রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্ত হলে জটিলতা ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে এখন এই জ্বর হলে সাধারণ জ্বরের মতো সর্দি-কাশি থাকে। শুরুতে রোগী বুঝতে পারে না যে তার ডেঙ্গু হয়েছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: মূলত মশার বংশবিস্তার কমানো না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বয়স্ক মশা নিধন করার পাশাপাশি মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। এগুলো কারও একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। শুধু সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আপনারা একটি গাইডলাইন তৈরি করেছিলেন, যেখানে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের কথা বলা হয়েছিল। এখনো দেখা যায়, চিকিৎসকদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: আমাদের চিকিৎসকরা এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ। তবে এখন ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। পাশাপাশি রোগীরাও অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। কারও জ্বর হলে শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। এতে রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কমে। প্রত্যন্ত এলাকায় ডেঙ্গু হলে রোগীকে বাঁচানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো মূলত শহরকেন্দ্রিক।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: একসময় এত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ছিল না। তখন আপনারা রোগীদের সুস্থ করেছেন। কিন্তু আইসিইউ চালু হওয়ার পর অনেক স্থানীয় চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে রোগী শহরে আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: এটিও একটি সমস্যা। আমরা সবসময় পরামর্শ দেই, উপজেলায় কারও ডেঙ্গু হলে ভয় না পেয়ে নিজ এলাকাতেই চিকিৎসা নিতে। রাজধানীতে চিকিৎসার জন্য আসতে আসতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। রোগী খাওয়া-দাওয়া করতে পারলে বেশি করে তরল খাবার খেতে হবে। শরীরে পর্যাপ্ত তরল রাখতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী ভালো থাকে। যারা খেতে পারেন না, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিরার মাধ্যমে তরল দেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে গেলে অনেক সময় জুনিয়র কনসালট্যান্ট বা মেডিকেল অফিসাররা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে দেখা যায়, এসব রোগীর কেউ কেউ ডেঙ্গু শকে চলে যান এবং আর সুস্থ হতে পারেন না। এসব চিকিৎসকের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে—এমন নয়। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোগী বয়স্ক হলে কিংবা হৃদরোগ, লিভার, কিডনি বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ থাকলে এবং ছোট শিশু হলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদেরও বাড়িতে কীভাবে যত্ন নিতে হবে- সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এবার অনেক শিশুও ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
ডেঙ্গু হয়েছে বলে নিজের ইচ্ছায় ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না। তবে ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্য কোনো সংক্রমণ বা রোগ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ডেঙ্গুর চিকিৎসা নয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর চিকিৎসায় কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন বেশ আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশেও এটি আনা হবে বলে শুনেছি। এটি কোন পর্যায়ে আছে?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন এখনো গণটিকাদানের পর্যায়ে আসেনি, এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে। ডেঙ্গুর ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ও কিউডেঙ্গা (Qdenga) নামে দুটি ভ্যাকসিন রয়েছে। ডেংভ্যাক্সিয়া সবাইকে দেওয়া যায় না। এটি ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের দেওয়া যায় এবং যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর। তবে যাদের আগে ডেঙ্গু হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমনকি গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে কিউডেঙ্গা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কাজ করে এবং ৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। তবে বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। যেসব দেশে এর ব্যবহার ও ট্রায়াল চলছে, সেসব দেশের ফলাফল আরও কিছুদিন দেখা যেতে পারে। কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার তথ্য সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে কীভাবে সচেতন করা যায়? সরকারেরই বা কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: জনগণকে মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে অনেক পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে। যেমন ছাদবাগান, ড্রাম, ফ্রিজের নিচসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। দুই দিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
এ ছাড়া ঘরের বাইরে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি জমলেও মশা জন্মাতে পারে। প্রশাসনকে এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জনগণ ও প্রশাসনকে যৌথভাবে এবং সমন্বিতভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দিনের বেলাতেও প্রয়োজনে মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের হাফপ্যান্ট পরানো যাবে না। তাদের শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতসহ ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ, উপসর্গ এবং করণীয় বিষয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে। এতে হয়তো ডেঙ্গু নির্মূল হবে না কিন্তু অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এবিএম আব্দুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ডেঙ্গু হলে নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না
সিজেডএন ডেস্ক

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের দেশে প্রায় ২৬ বছর ধরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রার্দুভাব চলছে । মাঝেমাঝে এটি বড় আকারে আসে এবং সারাদেশে একটি মহামারির অবস্থা তৈরি হয়। তারপরেও আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আমরা কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গু অনেক পুরোনো রোগ। আমরা সবাই জানি এটা এডিস মশার কামড়ে হয়। ২০০০ সাল থেকেই মূলত এটি মহামারির আকার ধারণ করতে শুরু করে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো, আগে ডেঙ্গুকে শহরের রোগ বলা হলেও এখন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে ডেঙ্গু হতো, এখন বছরের যেকোনো সময়ই হচ্ছে। ডেঙ্গু হলে প্রচণ্ড জ্বর ও সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা হয়। কয়েকদিন পর জ্বর কমে গেলে শরীরে র্যাশ ওঠে এবং রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্ত হলে জটিলতা ও ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে এখন এই জ্বর হলে সাধারণ জ্বরের মতো সর্দি-কাশি থাকে। শুরুতে রোগী বুঝতে পারে না যে তার ডেঙ্গু হয়েছে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছে। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: মূলত মশার বংশবিস্তার কমানো না গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বয়স্ক মশা নিধন করার পাশাপাশি মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। এগুলো কারও একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। শুধু সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। টিকা আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আপনারা একটি গাইডলাইন তৈরি করেছিলেন, যেখানে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্টের কথা বলা হয়েছিল। এখনো দেখা যায়, চিকিৎসকদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে না। এর কারণ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: আমাদের চিকিৎসকরা এ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ। তবে এখন ডেঙ্গুর উপসর্গে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এ রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। পাশাপাশি রোগীরাও অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান। কারও জ্বর হলে শুরুতেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। এতে রোগ দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি কমে। প্রত্যন্ত এলাকায় ডেঙ্গু হলে রোগীকে বাঁচানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো মূলত শহরকেন্দ্রিক।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: একসময় এত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ছিল না। তখন আপনারা রোগীদের সুস্থ করেছেন। কিন্তু আইসিইউ চালু হওয়ার পর অনেক স্থানীয় চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে রোগী শহরে আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: এটিও একটি সমস্যা। আমরা সবসময় পরামর্শ দেই, উপজেলায় কারও ডেঙ্গু হলে ভয় না পেয়ে নিজ এলাকাতেই চিকিৎসা নিতে। রাজধানীতে চিকিৎসার জন্য আসতে আসতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। রোগী খাওয়া-দাওয়া করতে পারলে বেশি করে তরল খাবার খেতে হবে। শরীরে পর্যাপ্ত তরল রাখতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী ভালো থাকে। যারা খেতে পারেন না, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিরার মাধ্যমে তরল দেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গু আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে গেলে অনেক সময় জুনিয়র কনসালট্যান্ট বা মেডিকেল অফিসাররা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে দেখা যায়, এসব রোগীর কেউ কেউ ডেঙ্গু শকে চলে যান এবং আর সুস্থ হতে পারেন না। এসব চিকিৎসকের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে—এমন নয়। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রোগী বয়স্ক হলে কিংবা হৃদরোগ, লিভার, কিডনি বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ থাকলে এবং ছোট শিশু হলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদেরও বাড়িতে কীভাবে যত্ন নিতে হবে- সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এবার অনেক শিশুও ডেঙ্গুতে মারা গেছে।
ডেঙ্গু হয়েছে বলে নিজের ইচ্ছায় ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া যাবে না। তবে ডেঙ্গুর পাশাপাশি অন্য কোনো সংক্রমণ বা রোগ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক ডেঙ্গুর চিকিৎসা নয়।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর চিকিৎসায় কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন বেশ আলোচনায় এসেছিল। বাংলাদেশেও এটি আনা হবে বলে শুনেছি। এটি কোন পর্যায়ে আছে?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন এখনো গণটিকাদানের পর্যায়ে আসেনি, এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়েই আছে। ডেঙ্গুর ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ও কিউডেঙ্গা (Qdenga) নামে দুটি ভ্যাকসিন রয়েছে। ডেংভ্যাক্সিয়া সবাইকে দেওয়া যায় না। এটি ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের দেওয়া যায় এবং যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর। তবে যাদের আগে ডেঙ্গু হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এমনকি গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে কিউডেঙ্গা ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কাজ করে এবং ৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের জন্য এটি ব্যবহার করা যায়। তবে বাংলাদেশে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও তথ্য-উপাত্ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। যেসব দেশে এর ব্যবহার ও ট্রায়াল চলছে, সেসব দেশের ফলাফল আরও কিছুদিন দেখা যেতে পারে। কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার তথ্য সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে জনগণকে কীভাবে সচেতন করা যায়? সরকারেরই বা কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ: জনগণকে মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে উদ্যোগ নিতে হবে। মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে অনেক পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো প্রয়োগ করতে হবে। যেমন ছাদবাগান, ড্রাম, ফ্রিজের নিচসহ বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। দুই দিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
এ ছাড়া ঘরের বাইরে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি জমলেও মশা জন্মাতে পারে। প্রশাসনকে এসব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জনগণ ও প্রশাসনকে যৌথভাবে এবং সমন্বিতভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
দিনের বেলাতেও প্রয়োজনে মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের হাফপ্যান্ট পরানো যাবে না। তাদের শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতসহ ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ, উপসর্গ এবং করণীয় বিষয়ে ব্যাপকভাবে প্রচার চালাতে হবে। এতে হয়তো ডেঙ্গু নির্মূল হবে না কিন্তু অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এবিএম আব্দুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।







-CznNewsLab-32d440.jpg)
