শিরোনাম
সাক্ষাৎকার

প্রয়োজনে বড় বাজেট, তবে বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

প্রয়োজনে বড় বাজেট, তবে বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ
ড. গোলাম রসুল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি’র অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি একজন লেখক ও গবেষক। এবারের বাজেট নিয়ে সিজেডএন টোয়েন্টিফোরের বিশেষ আয়োজন ‘বাজেট ২০২৬-২৭, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা” অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন । এই অনুষ্ঠানে তিনি বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, ঝুঁকিসহ নানাদিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য দুই পর্বে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমগ্ন সৌর।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উত্থাপিত হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. গোলাম রসুল: বাজেটটি বুঝতে হলে আমাদের কতগুলো জিনিস দেখতে হবে। যেমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতা। এই সরকার মাত্র তিন মাস আগে নির্বাচিত হয়েছে। কাজেই এখনো নবীন সরকার। সেই সরকার এই বাজেট দিয়েছে। তারপর কতগুলো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ আছে। বিশেষ করে মিডল ইস্ট ক্রাইসিস। এই ক্রাইসিসের কারণে সারা বিশ্বে তেল, জ্বালানি, সার ইত্যাদির সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকটের একটা প্রভাব সারা বিশ্বে পড়ছে এবং বাংলাদেশেও পড়েছে। আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো এই সরকার একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। বাংলাদেশে ইকোনমিক গ্রোথ রেট এখন চারের নিচে চলে আসছে। এটা বোধহয় গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আমাদের দেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। বিনিয়োগ হচ্ছে না, কর্মসংস্থান বাড়ছে না, অন্যদিকে বৈশ্বিক একটা চাপ। ফরেন কারেন্সি রিজার্ভে একটা বিরাট প্রেশার আছে। এই বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের এই নতুন বাজেট। কাজেই এই বাজেট বোঝার জন্য এই প্রেক্ষাপটটা আমাদেরকে বুঝতে হবে।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: এই প্রেক্ষাপটে বাজেটের বড় আকারের বিষয়ে কী বলবেন?

ড. গোলাম রসুল: এবারের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। যেটা অনেকেই বলছেন একটু অ্যামবিশাস হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি আবার একটু কেয়ারফুলি দেখি তাহলে মনে হবে খুব একটা উচ্চাভিলাষী নয়। সরকারের অনেক কমিটমেন্ট আছে জনগণের কাছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ভেঙে অর্থনীতি পুনরায় চালু করার জন্য বড় বাজেট আমার মনে হয় সরকার নিয়েছে। আপনি যদি অর্থনীতির স্থবিরতা ভাঙতে চান তাহলে একটু বড় বাজেট লাগবে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে এটা হয়তো খুব বেশি উচ্চাভিলাষী না। তবে চ্যালেঞ্জ যেটা হতে পারে, এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: এবার রাজস্বের মাধ্যমে বেশি পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের কথা বলা হচ্ছে। অথচ এই পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে দুর্নীতি, আমাদের অসততা। বিভিন্নভাবে ফাঁকি দেওয়া হয় কর। ফলে রাজস্ব আহরণ কম হয়। এ বিষয়ে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেবে কি না?

ড. গোলাম রসুল: এটা আমাদের একটা ক্রনিক সমস্যা। দুর্নীতি বাংলাদেশের প্রায় কমবেশি সব সেক্টরে আছে। আমাদের রাজস্ব সেক্টরেও এটা আছে। কারণ এখনো এই রাজস্ব ব্যবস্থাটা ক্লায়েন্ট ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠেনি। অনেকেই এখনো ট্যাক্স অফিস ও ট্যাক্স অফিসারের কথা শুনলেই ভয় পান। এই যে একটা ভয়ের সংস্কৃতি, এর ফলে একটা গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, সরকারকে যা ট্যাক্স দেওয়ার কথা সেখান থেকে ট্যাক্সটা কমিয়ে দিয়ে কিছু টাকা অন্যদিকে সরানো হচ্ছে। এই কালচারটা আমাদের বহুদিন ধরে চলে আসছে। এটা সরকারও অবহিত আছে। সরকার চাচ্ছে এই ব্যবস্থাকে আরও অটোমেশন করতে। কিছুটা ডিজিটাল হয়েছে, বাট ডিজিটাল ইজ নট এনাফ। অটোমেশন করতে হবে পুরো সিস্টেম। এই বাজেটেও বলা হয়েছে অটোমেশন করার কথা।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: এবারে বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এটি পূরণে সরকার কী কী করতে পারে বলে মনে করছেন?

ড. গোলাম রসুল: বাজেট ঘাটতি আমাদের দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা। এটা শুধু আমাদের না, উন্নয়নশীল সব দেশের একটা বড় সমস্যা। যখন আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয় তখন বাজেট ঘাটতি থাকে। এখানে একটা মজার বিষয় হলো, আমরা যখন ব্যক্তিগত বাজেট করি তখন আমরা আয় অনুযায়ী ব্যয় করি। কিন্তু সরকার সেটা করে না। পাবলিক বাজেটটা অন্যরকম হয়। সরকার আগে তার খরচটা নির্ধারণ করে। আমার ব্যয়টা কত হবে? কারণ অনেকগুলো ব্যয় আছে যা সরকার ইচ্ছা করলেই বাদ দিতে পারবে না বা কমাতে পারবে না। কাজেই আগে সরকারি ব্যয়টা নির্ধারণ করতে হয়। তারপর চেষ্টা করে যে সেটা কী করে ম্যানেজ করবে। তো ব্যয়টা আমাদের সবসময় বেশি হয়। আয়টা কম হয়। যেহেতু আমাদের রেভিনিউ কালেকশনটা কম। অন্যান্য দেশেও এরকম ঘাটতি বাজেট হয়। আমরা ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন করি দুইটা সোর্স থেকে। এর মধ্যে আমরা বিদেশ থেকে কিছু অর্থ পাই বা বাজেট সহায়তা পাই। আর বাকি অংশটা সরকার অভ্যন্তরীণভাবে আমাদের ব্যাংকিং সিস্টেম বা অনেক সময় বন্ড বিক্রি বা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সংগ্রহ করে।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: এই বাজেটে সরকার ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির কথা বলেছে, এটি আসলে কী বা কেমন হবে?

ড. গোলাম রসুল: আসলে এখানে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বলতে উনারা যেটা মিন করছে, নরমালি আমরা বুঝাচ্ছি যে আমাদের ট্র্যাডিশনাল ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটিসের বাইরে যেয়ে নতুন নতুন সেক্টরগুলোকে এক্সপ্লোর করা। নতুন নতুন ইনোভেশন করা, বিশেষ করে নলেজ বেসড ইকোনমি, নলেজকে ক্যাপিটাল করা, নতুন নতুন প্রোডাক্ট ডেভেলপ করা, নতুন মার্কেট এক্সপ্লোর করা। ক্রিয়েটিভ ইকোনমির জন্য আমাদের দরকার দক্ষ জনগোষ্ঠী। শিক্ষার হার বাড়ছে কিন্তু মানে ঘাটতি আছে। শিক্ষার গুণগত মান না বাড়ার কারণে আমরা কিন্তু ইমব্যালেন্সড হয়ে যাচ্ছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু বাজারে চাকরি পাচ্ছে না। অন্যদিকে আবার যারা চাকরিদাতা তারা বলছে যে যোগ্য ক্যান্ডিডেট পাওয়া যাচ্ছে না। এমন একটা ইমব্যালেন্স আমরা দেখছি। এই জন্য দরকার এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করা। এজন্য মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই। এবার শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক।

সিজেডএন টোয়েন্টিফোর: বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতের বাজেটের ব্যাপারে বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় স্বাস্থ্য বাজেট আর কেউ দেয়নি। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

ড. গোলাম রসুল: এটা ভালো। কিন্তু আমি মনে করি এটা এনাফ না। আমি মনে করি এটা আরও দরকার। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে একটা বিরাট সংকট চলছে। স্বাস্থ্য খাতের এই বিরাট বরাদ্দ কিন্তু জিডিপির ১.০১ শতাংশ, যা খুবই কম। ইন্ডিয়াতে দেখেন যা জিডিপির ২ শতাংশের বেশি। শ্রীলঙ্কায়ও তাই। এমনকি নেপালেও আমাদের চেয়ে বেশি। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়টা কিন্তু একটা ইনভেস্টমেন্ট, ইনভেস্টমেন্ট ইন হেলথ। চিকিৎসা করতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার আমরা বিদেশে খরচ করছি। অথচ দেশের স্বাস্থ্য খাতের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

চলবে…

/বিবি/