শিরোনাম

পানি সংরক্ষণাগারে মার্কিন হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল: ইরান

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
পানি সংরক্ষণাগারে মার্কিন হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল: ইরান
মার্কিন হামলায় ইরানের দুটি পানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়েছে। ছবি: ওয়ানা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার নতুন ধাপে এবার ইরানের পানি সংরক্ষণাগারে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, মার্কিন হামলায় দেশটির দুটি পানি সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়েছে। এ অভিযোগ সত্য হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটিই হবে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলা।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে হরমুজ প্রণালির আকাশে মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব বিনিময় হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

এ অচলাবস্থার মধ্যেই মঙ্গলবার (৯ জুন) হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ওয়াশিংটন একে ইরানের অযৌক্তিক আগ্রাসন আখ্যা দিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে পাল্টা বিমান হামলা শুরু করে। জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা মূলত ইরানের যোগাযোগ ও রাডার স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ঘটনার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে, যদিও এতে থাকা দুই পাইলটই অলৌকিকভাবে নিরাপদ ও অক্ষত আছেন। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক এবং আনুপাতিক জবাব হিসেবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, মার্কিন হামলায় তাদের বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে দুটি প্রধান পানির জলাধার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং পশ্চিম এশিয়া সংবাদ সংস্থা (ওয়ানা) নিশ্চিত করেছে, রাজধানী তেহরান থেকে ১ হাজার ১২ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টিতে এ হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি দুটি কংক্রিটের পানি সংরক্ষণ জলাধার ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার ক্ষয়ক্ষতি হওয়া এই জলাধার দুটি স্থানীয় কৌহেস্তাক শহর এবং পার্শ্ববর্তী ১০টি গ্রামের ২০,০০০-এরও বেশি বাসিন্দার পানীয় জল সরবরাহের প্রধান উৎস ছিল। এর প্রতিশোধ হিসেবে আইআরজিসি ইতোমধ্যেই বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দায় স্বীকার করেছে।

বেসামরিক পানি পরিকাঠামোতে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা নয়। এর আগে ৭ মার্চ যুদ্ধ চলাকালীন হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পানি সংকটের মুখোমুখি। বছরের পর বছর ধরে চলা খরা, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনার কারণে দেশটির প্রধান প্রধান নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো শুকিয়ে গেছে। বৈশ্বিক পানি ঝুঁকি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে, ইরানের পানি সংকট ‘অত্যন্ত উচ্চ’ ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে রয়েছে। দেশটি তার নবায়নযোগ্য পানি সম্পদের ৮০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করে ফেলছে। নভেম্বর মাসেই তেহরানের আমির কবির বাঁধের ধারণক্ষমতা মাত্র ৮ শতাংশে নেমে এসেছিল এবং সারাদেশের ১৯টি প্রধান বাঁধ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছিল।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের পানি শিল্প খাতের মুখপাত্র ইসা বোজর্গজাদেহ বেসামরিক পানির জলাধারে যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলাকে একটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং ২০০৪ সালে গৃহীত বার্লিন জলসম্পদ বিধিমালা অনুযায়ী, বেসামরিক নাগরিকদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো পানি সরবরাহ কেন্দ্র বা শোধনাগার যুদ্ধের সময় বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। ফলে, এ হামলা কেবল দুই দেশের সামরিক উত্তেজনাকেই বাড়িয়ে তোলেনি, বরং এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবনকে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

/এমএকে/