শিরোনাম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

স্যানিটেশন সংকট ও অস্বাস্থ্যকর খাবারে বিপর্যস্ত, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

মো. রহমাতুল্লাহ
মো. রহমাতুল্লাহ
স্যানিটেশন সংকট ও অস্বাস্থ্যকর খাবারে বিপর্যস্ত, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার হোটেলে ঢাকনাহীন খোলামেলা খাবার। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মনোরম পরিবেশ আর উন্নত আবাসিক সুবিধার জন্য একসময় যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছিল অনন্য, তা আজ বিপর্যস্ত তীব্র স্যানিটেশন সংকট, মশার উপদ্রব এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারে। দেশের অন্যতম শীর্ষ এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে সমস্যাগুলো। প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অ্যাকাডেমিক ভবন, আবাসিক হল এবং ক্যাম্পাস সংলগ্ন চত্বরগুলোতে মৌলিক স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ভেস্তে যেতে বসেছে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী ক্যাম্পাসের প্রায় ১২ হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায় এক জরাজীর্ণ চিত্র। অধিকাংশ টয়লেটে নেই সাবান, টিস্যু, হ্যান্ডওয়াশ বা স্যানিটাইজারের মতো ন্যূনতম স্বাস্থ্যসামগ্রী। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধ আর নোংরা মেঝে নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙা পানির কল ও নিষ্কাশনহীন বেসিনের কারণে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে অধিকাংশ ওয়াশরুম।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
কাজী নজরুল ইসলাম হলের নোংরা বেসিন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

অন্যদিকে হলের ক্যান্টিন, ডাইনিং এবং ক্যাম্পাসের বটতলাসহ অন্যান্য খাবারের হোটেলগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম খাদ্য নিরাপত্তা সংকট। নিয়মিত পচা-বাসি ও নিম্নমানের শাকসবজি দিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই তৈরি করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন খাবার। মানহীন এসব খাবার খেয়ে প্রায়শই পেটের পীড়াসহ নানাবিধ শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা।

এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ক্যাম্পাসের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও তীব্র মশার উপদ্রব। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলের চারপাশে নিয়মিত ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করা, যত্রতত্র ময়লা ফেলা এবং উন্মুক্ত ড্রেনগুলো অবহেলায় ফেলে রাখার ফলে তৈরি হয়েছে মশার অবাধ প্রজননক্ষেত্র। দীর্ঘদিন ধরে মশক নিধন স্প্রে বা ফগার মেশিন ব্যবহার না করায় পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মশার কামড়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা তাদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক রাখা কঠিন করে তুলছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 3
বটতলার খাবার হোটেলের পাশে ময়লার ডোবা। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

ছাত্র-ছাত্রী উভয় হলের শিক্ষার্থীরাই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মনোরম বাহ্যিক অবয়বের আড়ালে বিরাজ করছে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। বিশেষ করে, ছাত্রী হলগুলোতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলার উপযুক্ত ডাস্টবিন না থাকা এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনিয়মিত ডিউটি পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বাজেট স্বল্পতা, কেন্দ্রীয় সমন্বয় মহাপরিকল্পনার অভাব এবং জনবল সংকটের কথা স্বীকার করা হলেও শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট দাবি, দ্রুত মশক নিধনসহ স্যানিটেশন ও খাদ্যের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ না নিলে এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি অচিরেই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কেন্দ্রে পরিণত হবে।

রফিক জাব্বার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আবু সায়েম বলেন, ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক পরিবেশটা যেমন সুন্দর, ভেতরে আমাদের থাকার পরিবেশটা ঠিক ততটাই করুণ। ডাইনিং-ক্যান্টিনের নিম্নমানের খাবার খেয়ে অর্ধেকের বেশি সময় পেটের সমস্যায় ভুগতে হয়। তার ওপর হলের বেসিন আর ওয়াশরুমগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ, আর সন্ধ্যায় মশার জন্য টেবিলে বসা দায় হয়ে পড়ে। আমরা তো পড়াশোনা করতে এসেছি, কিন্তু প্রতিদিন এই মৌলিক সমস্যাগুলোর সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 4
মওলানা ভাসানী হলের অপরিষ্কার বেসিন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

জাহানারা ইমাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নুসরাত তিশা বলেন, মেয়েদের হলগুলোতে স্যানিটেশন আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটটা আরও বেশি গুরুতর। স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলার মতো পর্যাপ্ত ও নির্দিষ্ট ডাস্টবিন নেই, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও দেখা মেলে অনিয়মিতভাবে। চারপাশের নোংরা ড্রেন আর ঝোপঝাড়ের কারণে মশার যে উপদ্রব বেড়েছে, তাতে সারাক্ষণ ডেঙ্গুর আতঙ্কে থাকতে হয়। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, বাজেটের অজুহাত না দেখিয়ে অতি দ্রুত নিয়মিত মশক নিধন ও হলগুলোর স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।

পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহফুজা মোবারক বলেন, যেই সেন্স থেকেই চিন্তা করি না কেন, সবগুলো বিষয়ই স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ। বটতলার খাবার ঢেকে না রাখা, মাছি বসা খাবার গ্রহণ করাটা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি। এই বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং প্রশাসন থেকে অনেকবার কাজ করা হয়েছে, কিন্তু সত্যি বলতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

স্যানিটেশন সংকট ও হলের আশপাশ অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রশাসন থেকে তো হলের আশেপাশের জায়গাগুলো নিয়মিত স্প্রে করার কথা। কিন্তু এগুলো ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা সেজন্য কর্তৃপক্ষকে এগুলো নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় হলের মালীদের এগুলো বোঝাতে হবে। তাছাড়া, শিক্ষার্থী যারা হলে থাকে তাদের রুম এবং বারান্দা পরিষ্কার রাখতে হবে। ফুলের টবে পানি জমে থাকলে তা পরিষ্কার করে রাখতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 1
মওলানা ভাসানী হলের পাশে ময়লার স্তুপ। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

মশা গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জাবিতে আগে এত মশা ছিলো না। এটা ইদানীং বেড়েছে। মশা বৃদ্ধির মূলত কিছু বিষয় থাকে। জাবিতে নতুন নতুন বিল্ডিং নির্মাণ হচ্ছে। যার ফলে নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশাও বংশবৃদ্ধি করছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে ঝোপঝাড় বেশি। নর্দমায় পানি জমে থাকে। এখানে কিউলেক্স মশা ডিম পাড়ে। অতিদ্রুত ঝোপঝাড় পরিষ্কার, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে না পারলে মশার উপদ্রব কমানো সহজ হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

জাবি মেডিক্যাল সেন্টারের খণ্ডকালীন মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. ইমরান বলেন, এখন তো বর্ষাকাল চলছে, হলের আশেপাশে ঝোপঝাড়, নালা নর্দমায় জমে থাকা পানি থেকে মশা উৎপাদন হওয়া খুব সহজ। কাউকে যদি ডেঙ্গু সেকেন্ড অ্যাটাক করে তাহলে তার মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। সুতরাং প্রশাসনের দিক থেকে এটা নিয়ে কাজ করতে হবে।

অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কাছে দৈনিক এমন রুগি অনেক বেশি আসে যাদের খাবার খেয়ে পেটের সমস্যা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বটতলা বা হলের খাবার খেয়ে এই সমস্যা হয়। জাকসুর পক্ষ থেকেও দেখি মাঝেমধ্যে অভিযান হয়, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আজকে হোটেল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে আসলে কালকে আবার তারা ভুলে যায়। খাবার ঢেকে রাখে না, নতুন পুরাতন একই রান্না করা খাবার দিনের পর দিন মিক্সিং করে খাওয়ানো হচ্ছে। খোলামেলা খাবারে যে পরিমাণ মাছি বা ক্ষতিকারক পোকা উড়ে এসে বসে, তাতে যে বিষক্রিয়া ছড়ায়, তাতে ছেলেমেয়েদের অসুস্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমার মনে হয় প্রশাসনের এটা নিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। নাহলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে না বরং শারীরিক ও মানসিক অবসাদ থেকে পড়াশোনায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাই উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, আবাসিক হলগুলোর আশেপাশে যে ঝোপঝাড়, নর্দমা বা ডোবা আছে, ওগুলো পরিষ্কার করার জন্য হলগুলোয় পর্যাপ্ত লোকবল আছে। তাদের ভালো পরিমাণে বেতনও দেওয়া হয়। হল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তারা কাজ করবে। পাশাপাশি হলের ওয়াশরুম, বেসিন ক্লিন করার জন্য যে লোক রাখা আছে তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে মনিটরিং করা হল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও বটে। এছাড়াও প্রশাসনের কাছে যে কোনো ধরনের সহযোগিতা চাইলে তারা অবশ্যই প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

/এমআর/