শিরোনাম

ইরান যুদ্ধের ৩২তম দিন: কূটনীতির এক জটিল সমীকরণ

ইরান যুদ্ধের ৩২তম দিন: কূটনীতির এক জটিল সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ৩২তম দিনে গড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক নানা মাত্রায় আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। একদিকে হামলা-পাল্টা হামলা, অন্যদিকে গোপনে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে।

ইরানের রাজধানী তেহরান ও শিল্পনগরী ইসফাহানে প্রতিদিনই নতুন করে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর শোনা যাচ্ছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বরং বেশিরভাগ বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে, যদিও সীমিত আকারে সরাসরি যোগাযোগও চলছে।

রুবিওর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন লক্ষ্য ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই’ অর্জন করা সম্ভব। তবে তার এই আত্মবিশ্বাসের বিপরীতে রয়েছে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের বাস্তবতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শিগগির কোনো সমঝোতা না হলে ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও কঠোর হামলা চালানো হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের অবস্থান

এই অবস্থায় ইরানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে একটি সংসদীয় কমিশন। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত যুদ্ধের প্রভাবে অচল হয়ে পড়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ ভালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানি নেতৃত্ব এখন পুরোপুরি যুদ্ধকেন্দ্রিক অবস্থানে রয়েছে। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ থামাতে আন্তরিক নয়। এই অবিশ্বাসই কূটনৈতিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে, সাম্প্রতিক হামলায় তাদের নৌ কমান্ডার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইরানের নৌবাহিনী এক মাসে ৮৭তম হামলা চালিয়ে শক্ত অবস্থানের বার্তা দিয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ছবি: সংগৃহীত

আঞ্চলিক উত্তেজনা ও বহুমাত্রিক সংঘাত

সংঘাত এখন শুধু ইরান-ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা ও পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

সম্প্রতি কুয়েতের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করে ছোড়া অন্তত আটটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের উচ্চ সতর্কতায় থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।

জেদ্দায় অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ বৈঠকে সৌদি আরব, কাতার ও জর্ডানের নেতারা বেসামরিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়ে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন, যা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা পুরোদমে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘোষণা দিয়ে ইসরায়েলের ভূখন্ড লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও ইরানের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। ছবি: সংগৃহীত

কূটনৈতিক তৎপরতা

যুদ্ধের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও থেমে নেই। যুদ্ধ থামাতে পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের মধ্যে চলমান আলোচনা সম্ভাব্য যুদ্ধ বিরতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসলামাবাদে বৈঠকের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফরে গেছেন, যা এই সংকট সমাধানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সরাসরি ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রেরই রয়েছে। তার এই মন্তব্য অঞ্চলজুড়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন।

ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র দপ্তরে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক চলছে। ছবি: সংগৃহীত
ইসলামাবাদে পররাষ্ট্র দপ্তরে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক চলছে। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধ নিয়ে মতভেদও সামনে আসছে। ২০০-এর বেশি মার্কিন সেনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে, যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সবকটি অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জনসাধারণের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্জিত হয়েছে। তবে এই সংঘাত কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি।

ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানে আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত ইমাম হোসেইন বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার দাবি করেছে। একই সময়ে হাইফার একটি তেল শোধনাগারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

ইরানের ইউরেনিয়াম দখলে সেনা পাঠানোর কথা ভাবছেন ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ইউরেনিয়াম দখলে সেনা পাঠানোর কথা ভাবছেন ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

লেবানন ও ইরাকের প্রতিক্রিয়া

সংঘাতের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে লেবানন ও ইরাকেও। লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (ইউএনআইএফআইএল) জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে বিস্ফোরণে তাদের দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। এর আগের দিনও একজন শান্তিরক্ষী নিহত হন।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এর ধ্বংসাবশেষে একজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।

অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকট

যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথম। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় মূল্যও গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের বেশি হয়ে গেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় নরওয়ে সাময়িকভাবে জ্বালানির ওপর কর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা জারি করেছে, যা সংকটের বৈশ্বিক বিস্তৃতি তুলে ধরে।

ইসরায়েলের হাইফায় একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দেশটির তেল শোধনাগারে আগুন লাগে। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের হাইফায় একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দেশটির তেল শোধনাগারে আগুন লাগে। ছবি: রয়টার্স

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে এই যুদ্ধ এখন এক বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে—যেখানে সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধের ৩২তম দিনে এসে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই সংঘাত কি কূটনৈতিক পথে থামবে, নাকি আরও বিস্তৃত হয়ে বিশ্বকে একটি বড় সংকটের দিকে ঠেলে দেবে?

/এমআর/