শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধের অন্যতম রহস্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ

সিটিজেন ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের অন্যতম রহস্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। ছবি: নিউইয়র্ক টাইমস

ইরানের কট্টর ইসরায়েলবিরোধী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশটির সম্ভাব্য নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিবেচনা করেছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এমন একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্ক ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল ও পশ্চিমা-বিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত একজন চরমপন্থী নেতাকে কেন ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রাখবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন একটি পরিস্থিতির কথা ভেবেছিল, যেখানে আহমাদিনেজাদ ইরানের বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে এসে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির মতে, এ গোপন পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। কারণ, যুদ্ধের শুরুর দিকে গৃহবন্দিত্ব থেকে আহমাদিনেজাদকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে একটি হামলা চালানো হয়েছিল এবং সেই অভিযানে তিনি গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে আহমাদিনেজাদ বা তার সহযোগীদের পক্ষ থেকে এ দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি এবং তার বর্তমান অবস্থানও অজানা রয়ে গেছে।

এ খবরটি মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র সংশয় তৈরি করেছে, কারণ আহমাদিনেজাদের অতীত ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দেয়। ২০০৫ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি হলোকাস্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ইসরায়েলকে একটি মনগড়া শাসনব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করে ভৌগোলিক মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে এ কট্টর অবস্থানকে অনেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা ভিন্নভাবে দেখতেন। ২০০৮ সালে মোসাদের সাবেক প্রধান এফ্রাইম হালেভি তাকে ইসরায়েলের জন্য ইরানের সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, কারণ আহমাদিনেজাদের চরমপন্থী বক্তব্য বিশ্বমঞ্চে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে একটি বাস্তব হুমকি হিসেবে প্রমাণ করতে ইসরায়েলকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল। যদিও আহমাদিনেজাদের সমর্থকেরা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি কেবল একটি আক্রমণাত্মক ও আদর্শিক নীতি অনুসরণ করেছিলেন।

২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আহমাদিনেজাদের অবস্থান ক্রমশ জটিল হতে থাকে। তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এর ফলে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাকে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। ইংরেজিতে টুইট করা, মার্কিন ফুটবল দলকে অভিনন্দন জানানো, র্যাপার টুপাক শাকুরের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করার মতো বৈচিত্র্যময় ও অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখা গেছে তার মধ্যে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ রাজ জিম্মিত একে জনতাবাদ ও সুযোগসন্ধানের এক মিশ্রণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এ প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে বিবিসি পার্সিয়ানের সাথে আলাপকালে একাধিক মার্কিন ও ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞ গভীর উদ্বেগ ও অবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাক্স আব্রাহমস এ বিবরণকে অত্যন্ত সন্দেহজনক এবং যুদ্ধকালীন ভুল তথ্যের অংশ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মাইকেল রুবিন একে পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত বলে আখ্যা দিয়ে সংবাদমাধ্যমটির অজ্ঞাত সূত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে দায়ী করেছেন। তবে এ তীব্র সমালোচনার মুখেও নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তারা তাদের প্রতিবেদনের তথ্যের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। প্রতিবেদনটি মার্কিন, ইসরায়েলি ও ইরানি কর্মকর্তাদের মতো অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও অবহিত সূত্রের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।

অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর এ ধরনের কোনো চিন্তা যদি সত্যিই করা হয়ে থাকে, তবে তা ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর এক চরম ভুল বোঝাবুঝির বহিঃপ্রকাশ। ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ ও ইয়োসি মেলম্যানের মতে, আইআরজিসি-র মতো শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন ছাড়া আহমাদিনেজাদের কোনো নিজস্ব ক্ষমতার ভিত্তি নেই এবং পুরো ক্ষমতা কাঠামো ধ্বংস না হলে তার পক্ষে শাসনভার নেওয়া অসম্ভব ছিল। তবে এতকিছুর পরও তার নাম কেন আলোচনায় এলো, এর উত্তর হয়তো তার পরিচিতি, অতীত অভিজ্ঞতা এবং খামেনির সাথে দূরত্বের মধ্যে নিহিত। অতীতেও ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর সংস্কারপন্থীদের দমন করা আহমাদিনেজাদকে পরবর্তীতে একই বিরোধীদের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এ ধারাবাহিক অবস্থান পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, বিদেশি শক্তির সঙ্গে কোনো গোপন আঁতাত না থাকলেও, ইরানের রাজনীতিতে আহমাদিনেজাদের চরিত্রটি সবসময়ই সরল সমীকরণের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও কৌশলগত ছিল।

সূত্র: বিবিসি

/এমএকে/