শিরোনাম

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের আক্রমণ

সিটিজেন ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের আক্রমণ
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অভিযান চালাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিকে আবারও সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে যুদ্ধবিমান দিয়ে ইরানের নৌযান ধ্বংস করা হচ্ছে, আর অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ভূপাতিত করা হচ্ছে ড্রোন। প্রণালিতে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতেই এই সমন্বিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযান পেন্টাগনের একটি বহুস্তরীয় পরিকল্পনার অংশ। মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সশস্ত্র নৌযান, নৌমাইন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি কমানো। মার্চের শুরু থেকে এসব ঝুঁকির কারণে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে পারবে এবং পরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পারস্য উপসাগরে আনা-নেওয়া করা সম্ভব হবে।

বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিটি অচল হয়ে পড়ায় জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। একপর্যায়ে তা ১১৯ ডলার ছুঁয়ে পরে ১০৮ ডলারের ঘরে স্থির হয়। এর ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনকে।

পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ভারী অস্ত্রে সজ্জিত এ-১০ ওয়ার্টহগ যুদ্ধবিমান এবং অ্যাপাচি হেলিকপ্টার প্রণালির আকাশে ও ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। তার ভাষায়, এ-১০ বিমানগুলো দক্ষিণ দিক থেকে নৌযান লক্ষ্য করে দ্রুতগতিতে আক্রমণ চালাচ্ছে। পাশাপাশি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও ড্রোন প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধবিমান ও অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধবিমান ও অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরেই এ-১০ ও অ্যাপাচি যৌথভাবে ইরানের দ্রুতগতির ছোট নৌকা ধ্বংস করছে, যেগুলো বাণিজ্যিক জাহাজকে হয়রানি করছিল। আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া যুদ্ধবিমানগুলোও এসব হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল, তবে নতুন করে শক্তি যোগ হওয়ায় অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ঘাঁটি এবং সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র অবস্থানেও হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, এসব অভিযানে ১২০টির বেশি ইরানি নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে এত হামলার পরও ইরানের হাতে এখনও উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের কাছে প্রচুর নৌমাইন, ট্রাকভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত শত নৌযান রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো উপকূলীয় এলাকা ও গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমি বলেন, পুরো প্রণালিকে নিরাপদ করতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

ইরান ইতোমধ্যে প্রণালিতে বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিস্ফোরক বোঝাই চালকবিহীন নৌকা বা আকাশপথের ড্রোন ব্যবহার করেছে। শুধু হরমুজ প্রণালিতে নয়—ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরেও কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি গোলাবর্ষণও করা হয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে, কারণ ইরান এখন নির্বাচিত কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তেহরানের পার্লামেন্ট এ জন্য টোল আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি ও বাণিজ্য নিয়ে দরকষাকষির কৌশল নিচ্ছে।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড্যানি সিত্রিনোভিজ বলেন, এতে এক ধরনের ‘জোরপূর্বক নির্ভরশীলতা’ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ উপসাগরের জ্বালানি পেতে হলে অনেক দেশকেই কোনো না কোনোভাবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত সংকীর্ণ—সবচেয়ে সরু স্থানে এর প্রস্থ মাত্র ২৪ মাইল। ফলে দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রও সহজেই জাহাজে আঘাত হানতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকি কমিয়ে জাহাজ চলাচল চালু করা সম্ভব হলেও শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতির সঙ্গে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের আগের হামলারও মিল পাওয়া যাচ্ছে। তারাও আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলার জন্য ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন নৌকা ব্যবহার করেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েও দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।

অভিযানে ব্যবহৃত এ-১০ ওয়ার্টহগ যুদ্ধবিমান মূলত স্থলযুদ্ধে কাছ থেকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি হলেও এখন সমুদ্রপথে নৌযান ধ্বংসেও ব্যবহৃত হচ্ছে। শক্তিশালী ৩০ মিমি কামান ও ভারী বোমা বহনের সক্ষমতার কারণে এই বিমান এখনও কার্যকর। পাইলট সুরক্ষার জন্য এতে টাইটানিয়ামের আবরণও রয়েছে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক অভিযান ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পুরোপুরি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা কঠিন—এতে সময় লাগবে, আর ঝুঁকি পুরোপুরি কখনোই শূন্যে নামবে না।

/এমআর/