শিরোনাম

খামেনিকে হত্যার পথ তৈরি করে ইরানে মোসাদের গুপ্তচর ও ট্রাফিক ক্যামেরা

সিটিজেন ডেস্ক
খামেনিকে হত্যার পথ তৈরি করে ইরানে মোসাদের গুপ্তচর ও ট্রাফিক ক্যামেরা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে লেগে ছিল। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে লেগে ছিল। গত ছয় মাস ধরে এজন্য তাদের প্রযুক্তিগত ও জনবল সহায়তা দেয় সিআইএসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। তেহরানের প্রায় সব ট্রাফিক ক্যামেরাই বহু বছর ধরে হ্যাক করে রেখেছিল ইসরায়েল। জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তারা যখন তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিট সংলগ্ন কার্যালয়ে কাজে যেতেন, ইসরায়েলিরা তাদের ওপর নজর রাখত।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ গোয়েন্দা এবং কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্যে শনিবার চূড়ান্ত ওই অভিযান চালিয়েছিল তারা।

ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হওয়া ‘ইরানের শীর্ষস্থানীয় সাতজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা’ এবং খামেনির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রায় এক ডজন সদস্য এই হামলায় নিহত হন। মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় একই সময়ে চালানো একাধিক হামলায় খামেনিসহ তাদের হত্যা করা হয়। এছাড়া এই হামলায় ইরানের আরও ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন।

ফিনানশিয়াল টাইমস জানিয়েছে, একটি ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের জন্য বেশ সুবিধা করে দিয়েছিল, যা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ওই কমপ্লেক্সের ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে ইসরায়েলকে জানার সুযোগ করে দিয়েছিল।

ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন এই হামলাকে ‘কৌশলগত ও অভিযানগত এক বিশাল চমক’ বলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণ ধারণা ছিল, জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করা সেই আকস্মিক হামলার মতোই ইসরায়েল হয়তো রাতের আঁধারে হামলা চালাবে।

হামলার সময় শনিবার সকাল বেছে নেওয়া হয়েছিল সিআই এজেন্টদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। সে সময় তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে নেতৃত্বস্থানীয় একজনের কার্যালয় চত্বরে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনি ঠিক কখন ওই স্থানে থাকবেন এবং বৈঠকের সময় সম্পর্কে সিআইএ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল।

ইসরায়েলি গুপ্তচরেরাও অনেক বছর ধরে খামেনির ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। তারা তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, পরিবারের সদস্য, সহযোগী, মিত্র এবং তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নথি তৈরি করেছিল।

সিআইএর সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি বিশাল জিগস পাজলের মতো। আপনি তথ্যের এই ছোট ছোট টুকরোগুলো এক জায়গায় মেলাবেন। যেখানে আপনার কাছে (নির্ভরযোগ্য তথ্য) থাকবে না, সেখানে আরও গভীরভাবে খুঁজবেন। এতে সবকিছুই থাকে: কীভাবে তারা খাবার সংগ্রহ করে, তাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনার কী হয়।’

ইসরায়েল তাদের শত্রু দেশের রাজধানীতে এমন গোয়েন্দা জাল বিছাতে সক্ষম হয়েছে মূলত দীর্ঘদিন ধরে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে। তাতে বড় ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ৮২০০, মোসাদের বসানো বিপুল সংখ্যক গুপ্তচর এবং সামরিক গোয়েন্দাদের প্রতিদিনের ব্রিফের মাধ্যমে পাওয়া বিপুল তথ্যভাণ্ডার।

সোশাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস নামে পরিচিত একটি গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ইসরায়েল শতকোটি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করেছে।

গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ভেতরে মোসাদের শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেবার হামলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে এক ডজনের বেশি ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ফিনানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমরা প্রথমে তাদের চোখ অন্ধ করে দিয়েছিলাম।’

জুনের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েলি পাইলটরা ‘স্প্যারো’ নামে পরিচিত এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেন, যার কিছু সংস্করণ ১০০০ কিলোমিটারের বেশি দূর থেকে ডাইনিং টেবিলের সমান ছোট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

এই প্রতিবেদনের জন্য ইসরায়েলের সাবেক ও বর্তমান আধা ডজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে ফিনানশিয়াল টাইমস। ব্রিটিশ পত্রিকাটি লিখেছে, খামেনিকে হত্যা করা কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

ইরান নিয়ে কাজ করে আসা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক রুয়েল গেরেখ্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই অভিযানে বিশাল প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে এসেছিল। তবে মূলত ইসরায়েলই মাঠপর্যায়ে এমন এক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যারা সরাসরি মানুষের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে এবং ইরানের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিল।

গেরেখ্ত আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর নজর রাখছে এবং সেখানে তথ্যদাতা, গুপ্তচর ও লজিস্টিকসের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কের সহায়তায় তারা এর আগে ইরানে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান দিয়ে প্রত্যন্ত রাস্তায় চলন্ত গাড়িতে থাকা ইরানের এক শীর্ষস্থানীয় পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল কম্পিউটারগুলোতে ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া। এ ছাড়া পারমাণবিক নথির আর্কাইভ চুরির ঘটনাও রয়েছে। এমনকি ২০২৪ সালে তেহরানের একটি সরকারি গেস্টহাউসে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়ার কক্ষে বোমা রেখে তাকে গুপ্তহত্যা করা হয়।

হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর মত খামেনি আত্মগোপনে থাকতেন না। নাসরাল্লাহ বছরের পর বছর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে কাটিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলের একাধিক হত্যাচেষ্টা এড়িয়ে যান। পরে বৈরুতে তার আস্তানায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান প্রায় ৮০টি বোমা ফেললে তিনি নিহত হন।

অন্যদিকে ইরানের রাস্তায়, বিলবোর্ডে, দোকানে সর্বত্র খামেনির ছবি শোভা পেত। তাকে যে হত্যা করা হতে পারে, সে কথা তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন। তার ভাষায়, ইরানের ভবিষ্যতের তুলনায় তার নিজের জীবন নিতান্তই তুচ্ছ।

সিআইএ ও ইসরায়েল যখন নিশ্চিত হয় যে শনিবার সকালে পাস্তুর স্ট্রিটের কার্যালয়ে খামেনি বৈঠক করবেন, তখন তাকে এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশকে একসঙ্গে হত্যার সুযোগ তৈরি হয়।

পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তাদের খুঁজে বের করা অনেক কঠিন হত, কারণ ইরানিরা দ্রুত ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার মত কৌশল নিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি জড়ো করা হচ্ছিল। আবার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনাও শুরু হয়েছিল।

মধ্যস্থতাকারী ওমান জানিয়েছিল, ইরান কিছু ছাড় দিতে রাজি ছিল এবং গত বৃহস্পতিবারের বৈঠক ‘ফলপ্রসূ’ হয়েছিল।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও লেখক ইয়োসি মেলম্যান বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে মোসাদ তাদের কৌশলে এক বড় পরিবর্তন আনে। তারা ইরানের ভেতর থেকেই স্থানীয় চর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ দেয়।

২০২১ সাল থেকে মোসাদের নেতৃত্ব দিয়ে আসা ডেভিড বার্নিয়া গুপ্তচরদের নিয়ে একটি ‘ফরেইন লিজিয়ন (বিদেশি বাহিনী)’-এর জন্য বিশেষ বিভাগ তৈরি করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে তাদের মোতায়েন করা হয়।

মেলম্যানের মতে, ইরানে এ ধরনের চর নিয়োগ করা অনেক সহজ ছিল। কারণ, সেখানকার অনেকেই ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরোধী।

ইসরায়েল গত বছরই খামেনিকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি নিতে এবং কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার বিষয়ে মিত্রদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে তাতে তখন সায় দেননি। তবে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর গত বছরের সেই সংক্ষিপ্ত সংঘাত শেষ হয়।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এর পর থেকে ইরান নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অত্যন্ত গভীর সহযোগিতা’ গড়ে উঠেছে।

গত সপ্তাহে ইরানের মাঠপর্যায়ে থাকা মোসাদের নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আড়ি পাতা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় করা হয়েছিল।

হামলার পরিকল্পনা কয়েক মাস ধরে চললেও খামেনি ও তার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা শনিবার সকালে ওই কমপ্লেক্সে বৈঠক করবেন নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।

গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে ছিল হ্যাক করা ট্রাফিক ক্যামেরার ছবি এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স। বৈঠক নির্ধারিত সময়েই হচ্ছিল এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সেখানে যাচ্ছিলেন।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের ভাষ্য, মার্কিন বাহিনী সাইবার হামলার মাধ্যমে ইরানের নজরদারি, যোগাযোগ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানের জন্য তেহরানের আকাশ খুলে দেওয়া হয়।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লেখেন, “সে (খামেনি) আমাদের গোয়েন্দা ও অত্যন্ত উন্নত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এড়াতে পারেনি। তার বা তার সঙ্গে নিহত অন্য নেতাদের কিছুই করার ছিল না।”

ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) জানায়, প্রায় ২০০টি জঙ্গি বিমান ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় সামরিক ফ্লাইওভার’ সম্পন্ন করে এবং প্রায় ৫০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, নিহত হওয়ার সময় ইরানি কর্মকর্তারা সকালের নাশতার টেবিলে বসেছিলেন।

পরদিন রবিবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কালো ব্যানারে খামেনির ছবি প্রচার করে তার মৃত্যুর খবর দেয়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ফিনানশিয়াল টাইমস

/জেএইচ/