শিরোনাম

মধ্যপ্রাচ্যে শিশুদের জীবন সংকটাপন্ন যে কারণে

সিটিজেন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে শিশুদের জীবন সংকটাপন্ন যে কারণে
মধ্য গাজা উপত্যকার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শিশুরা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে চরম সংকটে পড়েছে লাখ লাখ শিশু। ইরানে শিশু সেনা নিয়োগ, লেবাননে ব্যাপক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং শত শত অপ্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৪০ জনেরও বেশি শিশু নিহত এবং কয়েক হাজার শিশু আহত হয়েছে।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই শিশু হতাহতের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ইরানের একটি স্কুলে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ওই স্কুলের অন্তত ১৬০ জন শিশু ও শিক্ষক নিহত হয়। লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় অব্যাহত হামলায় আরও শিশু হতাহত হচ্ছে। পুরো অঞ্চলজুড়ে ১২ লাখের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

bigStoryContent

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল জানিয়েছেন, এ অঞ্চলের শিশুরা ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হচ্ছে এবং তাদের সুরক্ষার জন্য তৈরি ব্যবস্থাগুলোই এখন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বোমা হামলা এবং বাস্তুচ্যুতির নির্দেশের কারণে লেবাননে প্রায় ৪ লাখ শিশুসহ ১১ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এদের প্রায় ৯০ শতাংশই আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করছে এবং অনেকেই রাস্তায় ঘুমাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বৈরুতের নাইটক্লাব ডিস্ট্রিক্ট বিয়েল-এ ৫২ বছর বয়সী নিদাল আহমেদ তার ৮ মাস ও ৩ বছর বয়সী দুই সন্তান নিয়ে শত শত পরিবারের সাথে একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। এটি তার দ্বিতীয়বারের মতো বাস্তুচ্যুতি। ইউনিসেফের প্রতিনিধি মার্কোলুইগি কোরসি বলেছেন, লাগাতার বোমাবর্ষণ এবং বাস্তুচ্যুত শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত ও গভীর ভীতি তৈরি করছে।

অন্যদিকে, ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর আগে গাজায় ২৩ মাসের ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ২০ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছিল। চলমান পরিস্থিতিতে সেখানে ত্রাণ সরবরাহ ও শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতা বেড়েছে। গত ১৫ মার্চ তামোনে ইসরায়েলি পুলিশের গুলিতে ৫ ও ৭ বছর বয়সী দুই শিশুসহ এক দম্পতি নিহত হন। অপরদিকে, ইসরায়েলে ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত চারজন শিশু নিহত হয়েছে।

bigStoryContent

যুদ্ধের ডামাডোলে ইরানে শিশু সেনা ব্যবহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) 'মাতৃভূমি রক্ষাকারী যোদ্ধা' হিসেবে মাত্র ১২ বছর বয়সী শিশুদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগের প্রচারণা চালাচ্ছে, যা শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ। ইতোমধ্যেই নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১১ বছর বয়সী এক ইরানি শিশু নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এইচআরডব্লিউ-এর সহযোগী শিশু অধিকার পরিচালক বিল ভ্যান এসভেল্ড এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অব্যাহত হামলায় হাসপাতাল, স্কুল এবং পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন বোমা হামলায় ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী অনেক শিশু নিহত হয়, যা ইউনেস্কোর মতে আন্তর্জাতিক আইনের 'গুরুতর লঙ্ঘন'।

bigStoryContent

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, মার্কিন সমর্থিত ইসরায়েলি হামলায় তাদের ৩১৬টি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং ৭৬৩টি স্কুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে, এ সংঘাতের কারণে পুরো অঞ্চলে কমপক্ষে ৫ কোটি ২০ লাখ স্কুলগামী শিশুর শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। লেবাননের ৬৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৩৬৪টিই সরকারি স্কুল এবং ইসরায়েলেও অনেক স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের আঞ্চলিক পরিচালক আহমাদ আলহেন্দাউই বলেন, 'প্রতিটি যুদ্ধই শিশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। শিশুরা ভয়ের মধ্যে বাস করছে এবং এই প্রাপ্তবয়স্কদের যুদ্ধের মাঝে আটকা পড়েছে। যুদ্ধের নিয়ম আছে এবং প্রতিটি সংঘাতে শিশুদের অবশ্যই এর আওতার বাইরে রাখতে হবে।' লাগাতার সহিংসতা ও অস্থিরতা শিশুদের বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা মোকাবিলায় কিছু স্যাটেলাইট চ্যানেল শিশুদের মানসিক ভীতি কাটানোর পরামর্শ সম্প্রচার শুরু করেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এমএকে/