ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনে সরব পশ্চিমা নেতারা ইরানের বেলায় নীরব কেন

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনে সরব পশ্চিমা নেতারা ইরানের বেলায় নীরব কেন

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নীতির কথা যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তবতায় তার প্রতিফলন অনেক সময় ততটা দেখা যায় না। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে পশ্চিমা বিশ্বের সেই দ্বৈত নীতিই যেন আবারও সামনে চলে আসে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো দ্রুত ও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানায়। একে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক সমালোচনা– সবই জোরালোভাবে দেখা যায়। পশ্চিমা নেতারা জানতেন, আইনি চাপ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে থামাতে পারবে না; তবুও রাশিয়ার আগ্রাসনকে আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার নৈতিক দায়িত্ব থেকে তারা সরে যাননি।

তেহরানে হামলার পর বিস্ফোরণের দৃশ্য। ছবি: এএফপি
তেহরানে হামলার পর বিস্ফোরণের দৃশ্য। ছবি: এএফপি

কিন্তু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের ঘটনায় একই ধরনের স্পষ্ট ও সমবেত প্রতিক্রিয়া খুব একটা দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও ইউরোপের বেশিরভাগ নেতাই এ বিষয়ে নীরবতা বজায় রেখেছেন। ব্যতিক্রম হিসেবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ প্রকাশ্যে এই হামলার সমালোচনা করেছেন। নরওয়ের মতো কয়েকটি দেশও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন তুলেছে, তবে সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় নেতৃত্বের অবস্থান ছিল অনেকটাই সতর্ক ও নীরব।

অন্যদিকে কিছু দেশ সরাসরি এই অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ইরানের ওপর হামলাকে সমর্থন করেছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিত্রদের ‘উপদেশ দেওয়ার সময় নয়’– যা অনেকের কাছে নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানে চলমান হামলায় ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। এ ধরনের হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে ফেলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষভাবে এসব হামলায় জড়িত বলে অভিযোগ করেছে ইরান।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘শত্রুকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযানের সমালোচনাও হচ্ছে। সেখানে অবকাঠামো ধ্বংস, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে।

লেবাননের বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর উড়ছে ধোঁয়া। ছবি: এএফপি
লেবাননের বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর উড়ছে ধোঁয়া। ছবি: এএফপি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো পক্ষ যদি যুদ্ধাপরাধ করে থাকে, তবে সেটি অন্য পক্ষের অপরাধকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন সব পক্ষের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যে নৈতিক দৃঢ়তা দেখা গিয়েছিল, গাজা বা ইরান প্রসঙ্গে তা আর দেখা যাচ্ছে না। ফলে তাদের দ্বিমুখী নীতি ‘সিলেক্টিভ নিন্দা’-এর অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

ইরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর নালায় ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন জ্বলছে। ছবি: এএফপি
ইরানে জ্বালানি ডিপোতে হামলার পর নালায় ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন জ্বলছে। ছবি: এএফপি

সমালোচকদের মতে, এই দ্বৈত মানদণ্ডের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক হিসাব। ইরান বা ভেনেজুয়েলার মতো সরকারের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক অনীহা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চাপ এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বাস্তবতা—সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি শক্তিধর দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী আইনের প্রয়োগ করে, তবে বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. তামের মরিসের মতে, আন্তর্জাতিক আইনের মূল উদ্দেশ্য কোনো দেশকে ‘ভালা’ বা ‘খারাপ’ বলে বিচার করা নয়; বরং একটি ন্যূনতম বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হলে আন্তর্জাতিক আইনকে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য করতে হবে। নইলে নিয়মের কথা বলার পাশাপাশি নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাই বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এমআর/