যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে ওঠেন খামেনি

যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে ওঠেন খামেনি
সিটিজেন ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তিন দশকেরও বেশি সময়ের শাসনকালের পর শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইরানের শাসনব্যবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আলাদা; যদিও প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন, দেশের মূল ক্ষমতা সবসময় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হতে পারে। বহু বছর ধরে প্রশ্ন উঠেছে, কেন দেশের অন্য কোনো নেতা নয়, বরং আয়াতুল্লাহ খামেনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের টার্গেটে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার এই ক্ষমতার ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর। বিপ্লবের মাধ্যমে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্র উৎখাত হয় এবং ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দেশটি পেয়েছে দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা, যাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়। শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর অর্থ হলো সিনিয়র ধর্মীয় নেতা।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য তার সম্মতি প্রয়োজন। এমনকী ইরান পারমাণবিক ক্ষমতা ব্যবহার করবে কি-না, অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে কি-না– এসব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তার হাতে থাকে।

খামেনির মৃত্যুর পর পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন এবং কীভাবে নির্বাচিত হবেন, এই প্রশ্ন দেশজুড়ে জল্পনা সৃষ্টি করেছে। ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় সাধারণ জনগণের এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কার্যত কোনো অংশগ্রহণ নেই।
সামাজিক মাধ্যমে কেউ খামেনির সমালোচনা করলে তাকে জেল পর্যন্ত যেতে হতে পারে। ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ প্রায়শই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
জীবনী ও রাজনৈতিক যাত্রা
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি তার শুরুটা করেন স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে। পরে তিনি শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমেতে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৬২ সালে তিনি তখনকার শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। খোমেনির একজন নিবেদিত অনুসারী হয়ে ওঠেন তরুণ খামেনি। তার নিজের ভাষায়, আমি যা করেছি এবং যা বিশ্বাস করি, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।
শাহের বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে আলী খামেনি কয়েকবার গ্রেপ্তারও হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে এই গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮১ সালের জুনে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনি। হামলার পর তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। ওই হামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। দুই মাস পর সেই একই গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।
রাজাইয়ের মৃত্যুর পর আলী খামেনি নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। খামেনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানে অতিরিক্ত সংস্কার আনার চেষ্টা করছেন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে শাসন
১৯৮৯ সালের জুনে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ধর্মীয় আলেমদের বিশেষজ্ঞ পরিষদ আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। যদিও খামেনি তখন সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি।

সংসদীয় সংশোধনী আনার মাধ্যমে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। এরপর রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়।
ইরানের সংবিধানেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের হাতে বড় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।
নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ খামেনি ছয়জন প্রেসিডেন্টকে দেখেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি।
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন। খাতামির শাসনামলে সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
খাতামির পর প্রেসিডেন্ট হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। কিছু বিশ্লেষক তাকে খামেনির অনুগত মনে করলেও, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে তার নীতি ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ছাড়াও, ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে আহমাদিনেজাদ এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
খামেনির নেতৃত্বে ইরান
২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নির্বাচনের ফলাফল বৈধ ঘোষণা করেন এবং তীব্র আন্দোলন দমন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই অভিযানে বহু বিরোধী কর্মী নিহত হন, এবং হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হন।

২০১৩ সালে উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং খামেনির সম্মতিতে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন করেন। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে সীমিত বাধা দেন খামেনি।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে দেশজুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। সোলেইমানি ছিলেন খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু। হামলার পর খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ঘোষণা দেন এবং ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গালে চপেটাঘাত।
শীর্ষ নেতা হিসেবে খামেনি বহুবারই ইসরায়েলকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে ‘একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও, তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্টের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
২০২০ সালে খামেনি এবং ইরান দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়। প্রথমটি ঘটে ৮ জানুয়ারি, যখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের ভুলে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত হয়, ১৭৬ যাত্রী নিহত হন। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা দেশের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। খামেনি শুক্রবারের জুমার নামাজে বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত’। তবে সামরিক বাহিনীর পক্ষেই দাঁড়ান।
দ্বিতীয় সংকট ঘটে ফেব্রুয়ারিতে, যখন ইরানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। খামেনি প্রথমে ভাইরাসের হুমকিকে হালকাভাবে দেখান এবং বলেন, শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।
পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন?
২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের সময় রাইসিকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে, নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।

ইরানে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ। এই মণ্ডলীর সদস্য নির্বাচন হয় প্রতি আট বছর পর পর। তবে প্রার্থী কে হতে পারবে তা নির্ভর করে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদনের ওপর, যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা।
অর্থাৎ, এই দুটি প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞমণ্ডলী এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব অটুট থাকে। গত তিন দশক ধরে খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর সদস্যরা রক্ষণশীল হবেন, যারা তার নির্দেশ মেনে তার পরবর্তী উত্তরসূরী নির্বাচনের সময় কাজ করবেন।
নির্বাচিত হলে, সর্বোচ্চ নেতা আজীবন পদে বহাল থাকতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই আয়াতুল্লাহ হতে হবে, অর্থাৎ একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তিন দশকেরও বেশি সময়ের শাসনকালের পর শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইরানের শাসনব্যবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আলাদা; যদিও প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন, দেশের মূল ক্ষমতা সবসময় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হতে পারে। বহু বছর ধরে প্রশ্ন উঠেছে, কেন দেশের অন্য কোনো নেতা নয়, বরং আয়াতুল্লাহ খামেনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের টার্গেটে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার এই ক্ষমতার ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর। বিপ্লবের মাধ্যমে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্র উৎখাত হয় এবং ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দেশটি পেয়েছে দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা, যাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়। শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর অর্থ হলো সিনিয়র ধর্মীয় নেতা।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য তার সম্মতি প্রয়োজন। এমনকী ইরান পারমাণবিক ক্ষমতা ব্যবহার করবে কি-না, অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে কি-না– এসব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তার হাতে থাকে।

খামেনির মৃত্যুর পর পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন এবং কীভাবে নির্বাচিত হবেন, এই প্রশ্ন দেশজুড়ে জল্পনা সৃষ্টি করেছে। ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় সাধারণ জনগণের এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কার্যত কোনো অংশগ্রহণ নেই।
সামাজিক মাধ্যমে কেউ খামেনির সমালোচনা করলে তাকে জেল পর্যন্ত যেতে হতে পারে। ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ প্রায়শই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
জীবনী ও রাজনৈতিক যাত্রা
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি তার শুরুটা করেন স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে। পরে তিনি শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমেতে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৬২ সালে তিনি তখনকার শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। খোমেনির একজন নিবেদিত অনুসারী হয়ে ওঠেন তরুণ খামেনি। তার নিজের ভাষায়, আমি যা করেছি এবং যা বিশ্বাস করি, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।
শাহের বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে আলী খামেনি কয়েকবার গ্রেপ্তারও হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে এই গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮১ সালের জুনে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনি। হামলার পর তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। ওই হামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। দুই মাস পর সেই একই গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।
রাজাইয়ের মৃত্যুর পর আলী খামেনি নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। খামেনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানে অতিরিক্ত সংস্কার আনার চেষ্টা করছেন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে শাসন
১৯৮৯ সালের জুনে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ধর্মীয় আলেমদের বিশেষজ্ঞ পরিষদ আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। যদিও খামেনি তখন সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি।

সংসদীয় সংশোধনী আনার মাধ্যমে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। এরপর রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়।
ইরানের সংবিধানেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের হাতে বড় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।
নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ খামেনি ছয়জন প্রেসিডেন্টকে দেখেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি।
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন। খাতামির শাসনামলে সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
খাতামির পর প্রেসিডেন্ট হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। কিছু বিশ্লেষক তাকে খামেনির অনুগত মনে করলেও, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে তার নীতি ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ছাড়াও, ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে আহমাদিনেজাদ এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
খামেনির নেতৃত্বে ইরান
২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নির্বাচনের ফলাফল বৈধ ঘোষণা করেন এবং তীব্র আন্দোলন দমন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই অভিযানে বহু বিরোধী কর্মী নিহত হন, এবং হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হন।

২০১৩ সালে উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং খামেনির সম্মতিতে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন করেন। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে সীমিত বাধা দেন খামেনি।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে দেশজুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। সোলেইমানি ছিলেন খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু। হামলার পর খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ঘোষণা দেন এবং ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গালে চপেটাঘাত।
শীর্ষ নেতা হিসেবে খামেনি বহুবারই ইসরায়েলকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে ‘একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও, তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্টের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
২০২০ সালে খামেনি এবং ইরান দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়। প্রথমটি ঘটে ৮ জানুয়ারি, যখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের ভুলে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত হয়, ১৭৬ যাত্রী নিহত হন। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা দেশের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। খামেনি শুক্রবারের জুমার নামাজে বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত’। তবে সামরিক বাহিনীর পক্ষেই দাঁড়ান।
দ্বিতীয় সংকট ঘটে ফেব্রুয়ারিতে, যখন ইরানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। খামেনি প্রথমে ভাইরাসের হুমকিকে হালকাভাবে দেখান এবং বলেন, শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।
পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন?
২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের সময় রাইসিকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে, নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।

ইরানে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ। এই মণ্ডলীর সদস্য নির্বাচন হয় প্রতি আট বছর পর পর। তবে প্রার্থী কে হতে পারবে তা নির্ভর করে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদনের ওপর, যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা।
অর্থাৎ, এই দুটি প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞমণ্ডলী এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব অটুট থাকে। গত তিন দশক ধরে খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর সদস্যরা রক্ষণশীল হবেন, যারা তার নির্দেশ মেনে তার পরবর্তী উত্তরসূরী নির্বাচনের সময় কাজ করবেন।
নির্বাচিত হলে, সর্বোচ্চ নেতা আজীবন পদে বহাল থাকতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই আয়াতুল্লাহ হতে হবে, অর্থাৎ একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে ওঠেন খামেনি
সিটিজেন ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তিন দশকেরও বেশি সময়ের শাসনকালের পর শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইরানের শাসনব্যবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আলাদা; যদিও প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন, দেশের মূল ক্ষমতা সবসময় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে থাকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হতে পারে। বহু বছর ধরে প্রশ্ন উঠেছে, কেন দেশের অন্য কোনো নেতা নয়, বরং আয়াতুল্লাহ খামেনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের টার্গেটে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার এই ক্ষমতার ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর। বিপ্লবের মাধ্যমে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্র উৎখাত হয় এবং ইরানে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর দেশটি পেয়েছে দুজন সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা, যাদের পদবী হিসেবে আয়াতুল্লাহ ব্যবহার করা হয়। শিয়া ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর অর্থ হলো সিনিয়র ধর্মীয় নেতা।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। দেশের সব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য তার সম্মতি প্রয়োজন। এমনকী ইরান পারমাণবিক ক্ষমতা ব্যবহার করবে কি-না, অথবা জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে কি-না– এসব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তার হাতে থাকে।

খামেনির মৃত্যুর পর পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন এবং কীভাবে নির্বাচিত হবেন, এই প্রশ্ন দেশজুড়ে জল্পনা সৃষ্টি করেছে। ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় সাধারণ জনগণের এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কার্যত কোনো অংশগ্রহণ নেই।
সামাজিক মাধ্যমে কেউ খামেনির সমালোচনা করলে তাকে জেল পর্যন্ত যেতে হতে পারে। ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ প্রায়শই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
জীবনী ও রাজনৈতিক যাত্রা
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি তার শুরুটা করেন স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে। পরে তিনি শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমেতে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৬২ সালে তিনি তখনকার শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। খোমেনির একজন নিবেদিত অনুসারী হয়ে ওঠেন তরুণ খামেনি। তার নিজের ভাষায়, আমি যা করেছি এবং যা বিশ্বাস করি, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।
শাহের বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে আলী খামেনি কয়েকবার গ্রেপ্তারও হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে এই গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮১ সালের জুনে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনি। হামলার পর তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। ওই হামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। দুই মাস পর সেই একই গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।
রাজাইয়ের মৃত্যুর পর আলী খামেনি নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। খামেনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানে অতিরিক্ত সংস্কার আনার চেষ্টা করছেন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে শাসন
১৯৮৯ সালের জুনে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ধর্মীয় আলেমদের বিশেষজ্ঞ পরিষদ আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। যদিও খামেনি তখন সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ উপাধি অর্জন করতে পারেননি।

সংসদীয় সংশোধনী আনার মাধ্যমে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। এরপর রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়।
ইরানের সংবিধানেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং প্রেসিডেন্টের হাতে বড় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়।
নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ খামেনি ছয়জন প্রেসিডেন্টকে দেখেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি।
১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন। খাতামির শাসনামলে সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
খাতামির পর প্রেসিডেন্ট হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। কিছু বিশ্লেষক তাকে খামেনির অনুগত মনে করলেও, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে তার নীতি ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এ ছাড়াও, ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে আহমাদিনেজাদ এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
খামেনির নেতৃত্বে ইরান
২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নির্বাচনের ফলাফল বৈধ ঘোষণা করেন এবং তীব্র আন্দোলন দমন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই অভিযানে বহু বিরোধী কর্মী নিহত হন, এবং হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হন।

২০১৩ সালে উদারপন্থী নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং খামেনির সম্মতিতে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন করেন। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে সীমিত বাধা দেন খামেনি।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে দেশজুড়ে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। সোলেইমানি ছিলেন খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু। হামলার পর খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ঘোষণা দেন এবং ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের গালে চপেটাঘাত।
শীর্ষ নেতা হিসেবে খামেনি বহুবারই ইসরায়েলকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরায়েলকে ‘একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এছাড়াও, তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্টের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
২০২০ সালে খামেনি এবং ইরান দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়। প্রথমটি ঘটে ৮ জানুয়ারি, যখন ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের ভুলে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত হয়, ১৭৬ যাত্রী নিহত হন। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা দেশের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। খামেনি শুক্রবারের জুমার নামাজে বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত’। তবে সামরিক বাহিনীর পক্ষেই দাঁড়ান।
দ্বিতীয় সংকট ঘটে ফেব্রুয়ারিতে, যখন ইরানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। খামেনি প্রথমে ভাইরাসের হুমকিকে হালকাভাবে দেখান এবং বলেন, শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।
পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন?
২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষের সময় রাইসিকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে, নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে সম্ভাব্য তিনজন উত্তরসূরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।

ইরানে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ। এই মণ্ডলীর সদস্য নির্বাচন হয় প্রতি আট বছর পর পর। তবে প্রার্থী কে হতে পারবে তা নির্ভর করে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদনের ওপর, যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা।
অর্থাৎ, এই দুটি প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞমণ্ডলী এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব অটুট থাকে। গত তিন দশক ধরে খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞমণ্ডলীর সদস্যরা রক্ষণশীল হবেন, যারা তার নির্দেশ মেনে তার পরবর্তী উত্তরসূরী নির্বাচনের সময় কাজ করবেন।
নির্বাচিত হলে, সর্বোচ্চ নেতা আজীবন পদে বহাল থাকতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতাকে অবশ্যই আয়াতুল্লাহ হতে হবে, অর্থাৎ একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা




