শিরোনাম

ভেনেজুয়েলার বিধ্বস্ত রাস্তায় লাশের গন্ধ

সিজেডএন  ডেস্ক
সিজেডএন ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার বিধ্বস্ত রাস্তায় লাশের গন্ধ
ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার ভবন। ছবি: সিএনএন

দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে জর্জরিত ভেনেজুয়েলা জোড়া ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। ভূমিকম্পের ২৪ ঘণ্টা পর কারাকাসের ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শহরজুড়ে ধসে পড়া দালানগুলোর চারপাশে এখন পচনের দুর্গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। এই গন্ধ অসহনীয় হলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আটকে থাকা মানুষগুলোর পরিবারকে তা দমাতে পারছে না। অনেকেই চূর্ণবিচূর্ণ কংক্রিট ও রডের স্তূপের ধারে তাঁবু গেড়েছে তাদের স্বজনদের কোনো খবরের অপেক্ষায়।

মিরেলা হেরেরা তাদেরই একজন। তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের কোনো চিহ্নের আশায় প্রতিদিন তার ছেলের ধ্বংস হয়ে যাওয়া অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের বাইরে অপেক্ষা করছেন।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘এটা অসহ্য’।

‘আমি হাঁটি, পর্যাপ্ত পানি পান করি, আর ভাবি ওদের অবস্থা কেমন হতে পারে। যদি ওরা এখনও বেঁচে থাকে। তবে ওখান থেকে বেরোনোর ​​জন্য নিশ্চয়ই মরিয়া হয়ে আছে,’ যোগ করেন তিনি।

ঘটনাস্থলের কাছে একটি সাদা বোর্ডে ভবনটি এবং এর ৮ তলার একটি নকশা রয়েছে। প্রতিটি তলায় পরিবারের নাম লেখা আছে। এতে মৃত, উদ্ধারকৃত এবং নিখোঁজদের সংখ্যাও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ভবনটিতে এ পর্যন্ত ১২ জন মারা গেছেন, আর ৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। আর ২০ জন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে রয়েছেন। গত দুই দিনে একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এই ধরনের দুর্যোগের পর পরবর্তী তিন দিনই জীবিতদের খুঁজে বের করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। মানুষ পানি ছাড়া সাধারণত তিন দিনই বাঁচতে পারে। তবে ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও হেরেরা বলেছেন যে তিনি এখনও আশা ধরে রেখেছেন।

‘আমার মনে হয় আমার ছেলে খুব শক্তিশালী,’ বলেন তিনি। ‘আমার মনে হয় ও আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ও জানে যে আমি এখানেই ওকে দেখছি। এই কারণে আমি হাল ছাড়তে চাই না।’

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি লা গুয়াইরা বন্দরের বাসিন্দারা তাদের স্বজন ও প্রতিবেশীদের খুঁজে বের করতে শাবল, হাতুড়ি ও কোদাল ব্যবহার করছেন। এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

এর আগে বুধবার (২৪ জুন) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, প্রথম আঘাত হানা ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২। এর কেন্দ্র ছিল ইয়ারাকুয়ি অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে। এর ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়, যার মাত্রা ছিল ৭.৫। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ভেনেজুয়েলার ইউমারে শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এটি ছিল গত ১২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ভূমিকম্পে প্রায় ৮০০টি ভবন ধসে পড়ে।

সর্বশেষ সোমবার কারাকাস ও লা গুয়াইরায় ৪.৬ মাত্রার একটি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। এটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মানুষজন তাদের ঘরবাড়ি ও অস্থায়ী আশ্রয়স্থল ছেড়ে পায়জামা পরেই রাস্তায় নেমে আসে।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরা। সেখানে শত শত ভবন ধসে পড়েছে।

দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে। এখনো জীবিত মানুষ উদ্ধারের সম্ভাবনা থাকায় অভিযান বন্ধ করা হচ্ছে না।

জাতীয় সংসদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে ৭৭৪টি ভবন ধসে পড়েছে। এতে ১২,৭২১ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। সবশেষ সোমবার ভোরে ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর রাস্তায় ভেনেজুয়েলার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেলেও উদ্ধার অভিযানে তাদের তেমন দেখা যায়নি।

কারাকাসের পশ্চিমে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকা এল জুনকুইতোর এক বাসিন্দারা বলেছেন, উদ্ধার অভিযানে খুব কম সরকারি কর্মকর্তাকে দেখা গেছে। কৃষক ও অন্যান্য বাসিন্দাদের সরবরাহ করা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীই এখন দুর্গতদের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট বলেন, ২৫ হাজারেরও বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ সদস্য ও সেনাসদস্য ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় কাজ করছেন।

জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রামপোলা দেল তিনদারো বলেন, শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পের পর ৫০০টিরও বেশি পরাঘাত হয়েছে। এতে অন্তত ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে। সবমিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করছন তিনি।

দেশটির বিরোধীদল-সমর্থিত একটি ওয়েবসাইটের দাবি করেছে, এখনো প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আফটারশক অব্যাহত থাকায় উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সূত্র: সিএনএন, বিবিসি, আল জাজিরা

/জেএইচ/