শিরোনাম

চেনা উৎসবের রূপ হারিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ঈদ, ভর করছে আতঙ্ক

সিটিজেন ডেস্ক
চেনা উৎসবের রূপ হারিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ঈদ, ভর করছে আতঙ্ক
১৯৫০ সালের গবাদি পশু জবাই সংক্রান্ত আইন কার্যকর করছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, এতে কোরবানি নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি বলেন, মুসলিমরা তাকে ভোট দেয়নি, হিন্দুত্ববাদের জয় হয়েছে। এটাতেই অনেকেই ধরে নেন রাজ্যের মুসলিমদের ওপর কী নেমে আসছে! সেই ছোঁয়া দেখা গেলো ঈদুল আজহায়।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গে গরুর বাজারে নেমে আসে এক অজানা আতঙ্ক, ভয় ও অনিশ্চয়তার ছায়া। ঈদের আগে কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত বিশাল ধুলাগড় পশুর হাট প্রায় ক্রেতাশূন্য দেখা গেছে। বাজারজুড়ে বিক্রেতাদের উৎকণ্ঠা, আর খোলা আকাশের নিচে বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা শত শত গবাদিপশু যেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এবার কলকাতায় জমে ওঠেনি ঈদের বাজার। এমনিতেই গরুর মাংস বহন করার অভিযোগে দেশটিতে মুসলমানদের হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। তাই হিন্দুত্ববাদী বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের পর পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা কোরবানি দিতে সাহস করছেন না।

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি মুসলমান বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। ফলে কোরবানির ঈদকে ঘিরে সাধারণত গরুর বাজারে ব্যাপক বেচাকেনা হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কলকাতা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরের পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকে আসা এক হিন্দু বিক্রেতা বলেন, ঈদ উপলক্ষে গরু কেনার জন্য তিনি উচ্চ সুদে একাধিক ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু ক্রেতা নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিক্রেতা বলেন, ‘গরু কিনবে কে? মানুষ ভয়ের মধ্যে আছে।’

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের ধুলাগড় পশুর হাট ছিল হিন্দু বিক্রেতা ও মুসলিম ক্রেতাদের অন্যতম বড় মিলনস্থল। বাজারটি থেকে বহু মুসলিম পরিবার গরু, ছাগল, মহিষ বা উট কোরবানি দিত।

যদিও ১৯৫০ সালের একটি আইনে রাজ্যে প্রকাশ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়। তবু বহু বছর ধরে বামপন্থী বা মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তির শাসনে পশ্চিমবঙ্গে এই আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়নি। ফলে পশ্চিমবঙ্গে সেখানে গরুর মাংস ক্রয়-বিক্রয় অনেকটাই প্রকাশ্যে হয়ে আসছে।

তবে গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা আরোহন কের। এরপর পরিস্থিতি বদলে যায়।

নির্বাচনের সপ্তাহখানেক পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারি ১৯৫০ সালের আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেন।

এই আইনে বলা আছে, সরকারি অনুমোদন ব্যতীত কোনো গবাদিপশু জবাই করা যাবে না। কেবল সরকার নির্ধারিত কসাইখানায় এবং ১৪ বছরের বেশি বয়সী পশু জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে।

ভারতের বহু হিন্দুর কাছে গরু পবিত্র প্রাণী। পশুটিকে তারা ‘মা’ নামে সম্বোধন করেন। এ কারণে অধিকাংশ রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ।

২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু রক্ষার নামে স্বঘোষিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর হাতে বহু মুসলিম ও হিন্দু গবাদিপশু ব্যবসায়ী হামলা ও হত্যার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর রাজ্যে গরু ব্যবসায় ধস নেমেছে। অনেক রেস্টুরেন্ট, রেস্তোরাঁ ও খাবার দোকান সীমিত পরিসরে অথবা পুরোই বন্ধ করে দিয়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম কলকাতার জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘দ্য বার্গার শপ’। রেস্তোরাঁটি তাদের পরিচিত বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইনস্টাগ্রামে লিখেছে, ‘আমাদের বার্গারের কোনও ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির আছে।’

অন্যদিকে মুসলিম ব্যবসায়ী ও কসাইদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছে। এর প্রভাব পড়েছে কোরবানির ঈদেও।

এক মুসলিম ব্যবসায়ী বলেছেন, প্রতি ঈদে পশু জবাই করে তারা ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি লাভ করেন। এবারও ১০ লাখ রুপি ঋণ নিয়ে ২৫টি গরু কিনেছেন। তবে লাভ তো দূরের কথা, আসলও উঠবে কিনা সন্দেহ। তিনি বলেন, আমি খুব আতঙ্কে আছি।

সূত্র: আল জাজিরা

/জেএইচ/