শিরোনাম

পশ্চিমবঙ্গে সিএএ কার্যকর, ‘অবৈধদের’ বিএসএফে দেওয়ার ঘোষণা শুভেন্দুর

সিটিজেন ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে সিএএ কার্যকর, ‘অবৈধদের’ বিএসএফে দেওয়ার ঘোষণা শুভেন্দুর

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পর বহুল আলোচিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি সরকার। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, সিএএ’র আওতায় না থাকা ব্যক্তিদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, বুধবার রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শুভেন্দু। এ সময় বিএসএফের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পরই পশ্চিমবঙ্গে সিএএ কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেন তিনি।

শুভেন্দুর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার গত বছরই এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা রাজ্য সরকারকে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার তা কার্যকর করেনি। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন সেই আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে বুধবার সকালে উত্তরবঙ্গ সফর শেষে নবান্নে ফেরেন শুভেন্দু। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফের কাছে ২৭ কিলোমিটার জমিও হস্তান্তর করা হয়েছে।

অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করে আমরা রাজ্য ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল। আগের সরকার একদিকে সিএএ’র বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে আইনটি কার্যকরও করেনি। আজ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এই আইন বাস্তবায়ন শুরু হলো।”

কারা সিএএ’র সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে শুভেন্দু বলেন, আইন অনুযায়ী সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষ এর আওতায় থাকবেন। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা এসব সম্প্রদায়ের কাউকে পুলিশ হয়রানি বা আটক করতে পারবে না।

তবে যাঁরা এই আইনের অন্তর্ভুক্ত নন, তাঁদের ‘সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। শুভেন্দুর ভাষ্য, “রাজ্য পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করবে এবং বিএসএফের হাতে তুলে দেবে। পরে বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট।”

তিনি আরও জানান, সীমান্তবর্তী থানাগুলোতে এই আইন কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের ডিজি ও মুখ্যসচিবকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে জারি করা এক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বা সেই আশঙ্কায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে প্রবেশকারীরা এই সুবিধার আওতায় থাকবেন।

২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল কার্যকর হওয়া ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট’-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ভারতের পার্লামেন্টে তীব্র বিরোধিতার মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইনটি পাস করায় কেন্দ্রীয় সরকার।

এদিকে আনন্দবাজারের আরেক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত, আটক ও ফেরত পাঠানোর বিস্তারিত প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা ব্যক্তি স্থল বা জলপথে সীমান্ত অতিক্রমের সময় ধরা পড়লে প্রথমে তাদের বায়োমেট্রিক তথ্য—বিশেষ করে আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি—সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত ও জনতাত্ত্বিক তথ্যও নথিভুক্ত করা হবে।

এসব তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টালে (এফআইপি) আপলোড করতে হবে। যেসব এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা দুর্বল, সেখানে অফলাইনে তথ্য সংগ্রহ করে পরে কেন্দ্রীয় পোর্টালে যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী বাহিনীকে ফেরত পাঠানোর সব তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রতি মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করলে বিএসএফ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবে তার আগেও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে, যদি কাউকে সন্দেহজনক বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে তাকে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে।

অবৈধভাবে বসবাসকারীদের শনাক্ত করতে প্রতিটি রাজ্যে জেলা পর্যায়ে পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ) গঠনের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটককেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যেখানে সন্দেহভাজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গাদের রাখা হবে।

যদি আটক ব্যক্তিরা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক দাবি করেন, তাহলে ৩০ দিনের মধ্যে তাদের তথ্য যাচাই করা হবে। উপযুক্ত প্রমাণ দিতে না পারলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। এই সময় পর্যন্ত তাদের হোল্ডিং সেন্টারেই রাখা হবে।

তদন্ত শেষে কাউকে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা হিসেবে শনাক্ত করা গেলে তার বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে বিএসএফ বা সংশ্লিষ্ট সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করবে।

পরবর্তী ধাপে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ বা মিয়ানমারে ওই ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। একই সঙ্গে তাদের ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে ভারতে কোনো পরিচয়পত্র তৈরি করা না যায়।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে তদন্ত শেষে সরাসরি হোল্ডিং সেন্টার থেকেই কাউকে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

এ ধরনের অভিযানের সময় এক রাজ্যের পুলিশ অন্য রাজ্যের পুলিশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করবে, যাতে কোনো বিভ্রান্তি বা ভুল বোঝাবুঝি না ঘটে। কাকে কোন কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে, তারও বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

বাংলাদেশ সীমান্তে এ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে বিএসএফ এবং মিয়ানমার সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবে আসাম রাইফেলস।

/এমআর/