শিরোনাম

ইউক্রেনে রাশিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

সিটিজেন ডেস্ক
ইউক্রেনে রাশিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর ভবনে আগুন জ্বলছে। ছবি: রয়টার্স

অধিকৃত পূর্ব ইউক্রেনে ড্রোন হামলার জবাবে রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।

রবিবার (২৪ মে) ভোরে চালানো এই সমন্বিত হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত চারজন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, হামলায় রাশিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেসনিক’ ব্যবহার করেছে।

ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এ হামলায় রাশিয়া প্রায় ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথ থেকে ছোড়া এসব অস্ত্রের মধ্যে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫৪৯টি ড্রোন এবং ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত বা জ্যাম করতে সক্ষম হয়। তবে বাকি ক্ষেপণাস্ত্র বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানে। এছাড়া ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বলেও জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রাজধানীতেই অন্তত দুইজন নিহত এবং ৫৬ জন আহত হয়েছেন। শহরের প্রায় প্রতিটি জেলায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। একটি স্কুল ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেখানে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে একটি ব্যবসাকেন্দ্রে হামলার পর বহু মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা পড়েন।

রাজধানীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, সেখানে আরও দুইজন নিহত এবং অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন। হামলার তীব্রতায় কিয়েভের কেন্দ্রস্থল ও সরকারি ভবনের আশপাশ কেঁপে ওঠে। আতঙ্কিত বহু বাসিন্দা নিরাপত্তার জন্য পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেন।

রাজধানীর বাইরে চেরকাসি অঞ্চলে ১১ জন এবং দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়া মধ্য ইউক্রেনের বিলা তেরকভা শহরে ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র একটি পানি সরবরাহ কেন্দ্রে আঘাত হানে। এছাড়া একটি বাজার সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এবং বহু আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলেনস্কি বলেন, ওরা সত্যিই উন্মাদ।

রাশিয়ার এই হামলায় ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে প্রথমবারের মতো একাধিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল রাশিয়া। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পশ্চিমাঞ্চলীয় লভিভ এলাকাতেও দ্বিতীয়বারের মতো এই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ওরেসনিক’ শব্দের অর্থ ‘হেজেলনাট গাছ’। তার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে এবং মাটির নিচে বহুস্তরবিশিষ্ট বাংকার ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে।

পুতিন আরও বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র ‘উল্কাপিণ্ডের মতো’ গতিতে আঘাত হানে এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এড়িয়ে যেতে সক্ষম। এমনকি সাধারণ ওয়ারহেড ব্যবহার করেও একাধিক ‘ওরেসনিক’ ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলা পারমাণবিক হামলার মতো ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিশোধের দাবি মস্কোর

গত বৃহস্পতিবার রাতে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন পূর্ব ইউক্রেনের স্টারোবিলস্ক শহরের একটি কলেজ ছাত্রাবাসে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। মস্কোর দাবি, ওই হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৪২ জন আহত হন, যাদের বেশিরভাগই তরুণী।

এই ঘটনার পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানায়, হামলার জন্য দায়ীদের কঠোর ও অনিবার্য শাস্তি দেওয়া হবে। একই সময়ে কিয়েভে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও।

২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে রাশিয়া প্রায় প্রতিদিনই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। তবে রোববারের হামলাকে যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ রাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যদিও রাশিয়া বরাবরের মতোই বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৪০টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাজারে ২২ বছর ধরে কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী বাসিন্দা সভেতলানা ওনোফ্রিচুক বলেন, এটি ছিল এক বিভীষিকাময় রাত। পুরো যুদ্ধের সময় এমন পরিস্থিতি কখনও দেখিনি।

তিনি বলেন, খুব কষ্ট নিয়ে এখন আমাকে কিয়েভ ছাড়তে হচ্ছে। এখানে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়। আমার কাজ শেষ, সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী, ৭৪ বছর বয়সী কিয়েভবাসী ইয়েভহেন জোসিন বলেন, বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমরা ছিটকে পড়েছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি। কিন্তু আমার অ্যাপার্টমেন্ট পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

/এমআর/