শিরোনাম

যুদ্ধের আগে ইরানকে বিভ্রান্ত করতে ট্রাম্পের কূটকৌশল

যুদ্ধের আগে ইরানকে বিভ্রান্ত করতে ট্রাম্পের কূটকৌশল
ইসরায়েল উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ছবি: এএফপি

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পরমাণু আলোচনা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। তবে ওমানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। কিন্তু আলোচনা শেষেও কোনো চুক্তি করতে পারেনি দুই দেশ।

ইরান বলছে, আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে এবং তারা প্রয়োজনে সুবিধাজনক সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তারা আলোচনার বিষয়ে খুবই ‘গঠনমূলক’ ভাবে এগোচ্ছে। আগামী সপ্তাহে তাদের মধ্যে পরবর্তী ধাপের বৈঠক হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিথ্যা দাবি

আলোচনার মধ্যেই বরাবরের মতোই ইরানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবার ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। দুই দেশের মধ্যে এই টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন ‘ইরান আমেরিকার ভূখন্ডে হামলা করতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে’। ট্রাম্পের এই অভিযোগ বা দাবি যাই বলা হোক, তা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ‘পুরোনো কৌশল’ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। ইরানে হামলা চালানোর দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই ট্রাম্প এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।

তবে ট্রাম্পের এই দাবি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থন করে না। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ২০২৫ সালের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান বাস্তবে ২০৩০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সরাসরি আঘাত হানতে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের এই অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ একটি ‘বড় মিথ্যা’।

তেহরানে ইসলামিক বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে প্রদর্শিত একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছবি: রয়টার্স
তেহরানে ইসলামিক বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে প্রদর্শিত একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ছবি: রয়টার্স

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও একইভাবে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। সেই অভিযোগ বা হামলা চালানোর অজুহাতগুলো পরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনও একই ধরনের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তাই এই পরিস্থিতিতে ‘যুদ্ধবাজ ট্রাম্প’কে ভরসা করতে চান না কেউই।

ভেনেজুয়েলায় হামলার আগেও ট্রাম্প বলছিলেন, মাদুরোর উৎখাত চান না তিনি, শুধু মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে চান। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর আগেও ট্রাম্প একইভাবে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে না। তিনি নিজেও যুদ্ধ চান না। তারপরও আচমকা হামলা চালিয়েছিলেন।

তেহরানে একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি নারী ছবি: রয়টার্স
তেহরানে একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ইরানি নারী ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের দ্বিমুখী আচরণ

একদিকে ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুদ্ধজাহাজ, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অস্ত্রশস্ত্র প্রস্তুত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। অন্যদিকে এত প্রস্তুতির মধ্যেও হঠাৎ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আগ্রহ দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে সর্বোচ্চ ছাড়ের কথা বলছেন, যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছেন। এই অবস্থায় যুদ্ধের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোকে কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বিষয়টিকে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে ট্রাম্পের কৌশল বলে মনে করছেন তারা।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই ধরনের দ্বিমুখী আচরণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। যুদ্ধের আগে এই ধরনের রণকৌশল যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করে ফেলে।

কে জয়ী হবে—কূটনীতি নাকি রণকৌশল?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—এটি সত্য। তবে শিগগিরই দেশ দুইটির মধ্যে পরবর্তী ধাপের আলোচনা হতে যাচ্ছে, যা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আরও একটি ইতিবাচক দিক।

তবে একই সময়ে চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেয়া—এগুলো যুদ্ধের আগে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত কৌশল বলে মনে হতে পারে ইরানের কাছে। যা দেশটিকে আলোচনার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। ফলে চলমান সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

জেনেভায় আলোচনা হলেও দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হবে কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ট্রাম্পের মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত দাবির বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার এই কৌশলগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জেনেভায় আলোচনা হলেও দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হবে কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ট্রাম্পের মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত দাবির বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার এই কৌশলগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়। এখন সময়ই বলে দেবে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনায় কূটনীতি জয়ী হবে নাকি রণকৌশল।

/এমআর/