শিরোনাম

ইরান যুদ্ধে লাভবান অস্ত্র ও এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান

ইরান যুদ্ধে লাভবান অস্ত্র ও এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান
নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের পাশ দিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি: আল জাজিরা

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশে নামিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই প্রবৃদ্ধি ২.৫ শতাংশেও নেমে যেতে পারে।

সংঘাতের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা এবং দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে তেল, গ্যাস, রাসায়নিক ও সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও জাহাজ পরিবহন খাতও চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন-আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলো উচ্চ জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

তবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই পরিবেশেও কিছু খাত অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংকটের মধ্যেই নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা নির্দিষ্ট কয়েকটি শিল্পকে এগিয়ে দিচ্ছে।

বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে অস্থিরতাই সুযোগ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রম্পের নীতিনির্ধারণে অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক বাজারে ওঠানামা বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘ট্যাকো ট্রেড’ বা ‘ট্রাম্প সবসময় পিছু হটেন’ নামে একটি পরিভাষাও চালু হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করলেও বড় বড় বিনিয়োগ ব্যাংকের জন্য তা মুনাফার সুযোগ এনে দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা ঘন ঘন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করায় লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে, যা ব্যাংকগুলোর কমিশন ও আয় বাড়িয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে মরগ্যান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাক্স এবং জেপি মরগ্যান চেসের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে, যেখানে উল্লেখযোগ্য মুনাফা বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে।

ক্রিপ্টো-ভিত্তিক পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যেও এই অস্থিরতা নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছে। পলিমার্কেট ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ঘটনা—খেলাধুলা থেকে শুরু করে যুদ্ধ পরিস্থিতি—নিয়ে বাজি ধরার সুযোগ দিয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

ডেটা বিশ্লেষণ সংস্থা ডেফিলামার তথ্য অনুযায়ী, ফি কাঠামো পরিবর্তনের পর প্ল্যাটফর্মটির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যদিও এই খাতে লাভের বড় অংশ অল্পসংখ্যক ব্যবহারকারীর হাতে কেন্দ্রীভূত, তবুও এটি ২০২৬ সালে অন্যতম আলোচিত খাত হিসেবে উঠে এসেছে।

আকাশ প্রতিরক্ষা খাতে উত্থান

বিশ্বজুড়ে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ইউক্রেন, ইরান, গাজা, সুদান ও লেবাননের সংঘাত এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। অনেক দেশ তাদের সামরিক বাজেট বাড়িয়ে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র ক্রয়ে বিনিয়োগ করছে।

এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড অ্যারোস্পেস অ্যান্ড ডিফেন্স সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারের গড় প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের স্থিতিশীল অগ্রগতি

যুদ্ধের অভিঘাত সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত তার প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিএটিএডি)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে শক্তিশালী দেশগুলোর রপ্তানি বেড়েছে। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফল এই খাতের শক্তিশালী অবস্থানকে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআইর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য আইপিও পরিকল্পনাও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন গতি

এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে দেশগুলোকে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প শক্তির দিকে ঝোঁক বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, বহু দেশ ইতোমধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শক্তি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নীতিমালা গ্রহণ করেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, পারমাণবিক শক্তি পুনরুজ্জীবন এবং কর ছাড়ের মতো উদ্যোগ নিচ্ছে।

এই প্রবণতার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতেও। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশন সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা এই খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও কিছু খাত সেই সংকট থেকেই নতুন সুযোগ তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছে—যা বৈশ্বিক অর্থনীতির বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতাকেই সামনে তুলে ধরছে।

/এমআর/