শিরোনাম

পশ্চিমবঙ্গে ৫ কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়

সিটিজেন ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে ৫ কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়
মমতা বন্দোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় এখনও স্বীকার করেননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি অন্তত একশোটি আসন তাদের কাছ থেকে লুট করে নিয়েছে। লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন তা কখনোই সুষ্ঠু ও অবাধ বলে মানা যায় না।

১৫ বছর ধরে একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের ৫টি কারণ চিহ্নিত করেছে বিবিসি বাংলা। নিচে একে একে এগুলো তুলে ধরা হলো।

নারী ভোটব্যাংকে ধস

পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোট ৫০ শতাংশেরও বেশি। নারীদের অধিকাংশ ভোট এতকাল মমতার দল পেয়ে এসেছিল। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ বা ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণে ‘সবুজ সাথী’র মতো প্রকল্প তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

কিন্তু এবার সেই ভোটব্যাংকে ফাটল ধরেছে– যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ব্যর্থতা।

দুই বছর আগে কলকাতায় একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে ডিউটি দেওয়ার সময় ধর্ষণের শিকার ও নিহত হয়েছিলেন– সেই ‘অভয়া’র বিচারের দাবিতে সংগঠিত আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে প্রভাব ফেলেছে। এর একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকরের নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন।

বিজেপি সবসময় দাবি করে এসেছে, তালিকায় এই সব ভুয়া নামের কারণে তৃণমূল বছরের পর বছর ধরে ভোটে সুবিধা পেয়ে এসেছে। দেখা যাচ্ছে সেই বক্তব্য অনেকটাই সত্যি প্রমাণিত হলো।

এসআইআরে ক্ষতির ধাক্কা

এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, তা ভোটের ফলাফলেই বোঝা যাচ্ছে। আসনভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে আরও পরিষ্কার হওয়া যাবে যে, পুরো প্রক্রিয়ায় লাভবান হয়েছে বিজেপিই।

এই তালিকায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন। তবে এটা সত্য যে অনেক ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নামও বাদ পড়েছে। বিজেপি সবসময় দাবি করে এসেছে, তালিকায় এই সব ভুয়া নামের কারণে তৃণমূল বছরের পর বছর ধরে ভোটে সুবিধা পেয়ে এসেছে। দেখা যাচ্ছে সেই বক্তব্য অনেকটাই সত্যি প্রমাণিত হলো।

মমতা সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা

তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অপশাসন, ঘুষ ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো সরকারের আমলে এমনটা হয়নি।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও মমতার সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভোটের ঠিক আগে বেকারদের জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা চালু করেও সেই হতাশা কমানো যায়নি।

হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একটানা নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হলো রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম। এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই এতদিন তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে এসেছে। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়ার বিপরীতে হিন্দু ভোট শক্ত অবস্থান নিয়েছে, যার সুফল অবশ্যই বিজেপি পেয়েছে। মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও তারা বেশ কিছু আসন পেয়েছে।

‘মুসলিম তোষণে’র অভিযোগ খারিজ করতেই সম্প্রতি মমতা সরকারি খরচে একের পর এক হিন্দু মন্দির স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তার এই ‘সফট হিন্দুত্ব’ কাজে আসেনি। রাজ্যের বেশিরভাগ হিন্দু বরং ‘হিন্দুত্ববাদী’ বিজেপিকেই বেছে নিয়েছেন।

শাসক দল হিসেবে সুবিধা না পাওয়া

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে এবার তৃণমূল কংগ্রেস সেটা পায়নি বললেই চলে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ঢালাওভাবে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বদলি করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি ভোটের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি সদস্য। অনেকেই বলছেন, এই বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই ভোট এতো শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

অন্যভাবে বলা যায় , নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে।

/এফসি/