শিরোনাম

৭০ দশকের তেল সংকটের স্মৃতি ফিরে আসছে, এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ

সিটিজেন ডেস্ক
৭০ দশকের তেল সংকটের স্মৃতি ফিরে আসছে, এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
ভিয়েতনামের এক পেট্রল পাম্পে মানুষের ভিড়। ছবি: রয়টার্স

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে স্মরণকালের ভয়াবহতম জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার ইতোমধ্যে জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে। ফিলিপাইন জ্বালানি সাশ্রয়ে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে এবং বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ বাঁচাতে সশরীরে ক্লাসের পাশাপাশি আংশিক অনলাইন ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ভারতে রান্নার গ্যাসের অভাবে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁয় কাঠের ব্যবহার বেড়েছে, বিশ্বজুড়ে বাতিল হচ্ছে অসংখ্য ফ্লাইট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরলের মতে, এবারের এ সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট, কোভিড মহামারি কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে রওনা হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) শেষ চালানগুলো এপ্রিলেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। এরপর বিশ্বব্যাপী পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের মজুত তলানিতে ঠেকবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান এলএনজি রপ্তানি স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিশ্ববাজার থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে, যা পুরোপুরি সচল হতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। আরব অঞ্চলের অন্য উৎপাদকেরাও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

জ্বালানির তীব্র সরবরাহ সংকটের কারণে ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো সাময়িকভাবে কয়লার ওপর নির্ভরশীল হলেও, দীর্ঘমেয়াদে পুরো বিশ্ব অভাবনীয় দ্রুতগতিতে পরিবেশবান্ধব বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। সৌর প্যানেল, বায়ুচালিত টারবাইন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারির মতো বিকল্পগুলোর সহজলভ্যতা পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।

ফিলিপাইনে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর মানুষ ব্যাপকভাবে চীনা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডির বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনছে। জার্মানি, ব্রিটেন ও ভারতে যথাক্রমে সৌর পণ্য, হিট পাম্প ও ইনডাকশন কুকটপের বিক্রি অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এমনকি ভিয়েতনাম তাদের বৃহত্তম এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি সঞ্চয় প্রকল্পে এগোচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর চীনের শীর্ষ তিনটি ব্যাটারি কোম্পানির বাজার মূলধন প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোর জন্য দারুণ শিক্ষণীয় হতে পারে। সস্তা চীনা সৌর প্যানেলের বদৌলতে বর্তমানে পাকিস্তানের প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসছে সৌরশক্তি থেকে, যা ২০২০ সালেও ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। এর ফলে এ বছর দেশটি জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বাবদ প্রায় ৭০০ কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারবে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার।

তবে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে রূপান্তরের পথ একেবারেই বাধাহীন নয়। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং ট্রান্সফরমার, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও গ্রিড লাইন স্থাপন বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। জনস হপকিন্সের নেট জিরো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি ল্যাবের সহপরিচালক টিম সাহায়ের মতে, দেশগুলোকে এখন শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না, বরং সৌর প্যানেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির নিজস্ব সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এ রূপান্তরে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছে চীন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা পরিবহন ও শিল্প খাতের বড় অংশে বিদ্যুতায়ন করেছে এবং দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেলের ব্যবহার কমিয়েছে। এমনকি অন্যান্য দেশের সক্ষমতা বাড়াতে চীনা কোম্পানিগুলো ২২৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।

উল্টোদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রণোদনা প্রত্যাহার করে তেল-গ্যাস উৎপাদনে জোর দিচ্ছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিহাসমূলক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চলমান যুদ্ধ ও চরম দুর্ভোগ প্রমাণ করেছে, তেল ও গ্যাসের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, বায়ুদূষণ রোধ ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে পৃথিবীকে এখন পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নের দিকেই সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

/এমএকে/