শিরোনাম
এক্সপ্লেইনার

প্রক্সি নীতি ছেড়ে সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে ইরান

সিটিজেন ডেস্ক
সিটিজেন ডেস্ক
প্রক্সি নীতি ছেড়ে সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রম্প, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (বাঁ থেকে)।

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশকের প্রক্সি ও পরোক্ষ সংঘাতের নীতি থেকে সরে এসে সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে ইরান। চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তেহরানের নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এ কৌশলগত পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব কেবল আঞ্চলিক মিত্র বা গোপন অভিযানের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছে।

লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরানের আক্রমণ একটি বড় বার্তা বহন করে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, তাদের লাল রেখা এখন আর শুধু নিজস্ব সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তারা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও তেহরান ক্রমাগত অভিযোগ করে আসছে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব একের পর এক সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সমঝোতার চেতনা ক্ষুণ্ন করছে। ইরানের দাবি, পরোক্ষ আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও তাদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার বিপরীতে লেবাননেও ইসরায়েল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হামলা পরিচালনা করেছে।

এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু লক্ষ্যবস্তুর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। পাশাপাশি তেহরান সতর্ক করে দেয়, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে এবং পারস্য উপসাগরের বাইরেও সংঘাত বিস্তৃত করতে প্রস্তুত। এরই মধ্যে সপ্তাহের শুরুতে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা আঞ্চলিক পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কাগজে-কলমে থাকা কিন্তু বাস্তবে বারবার লঙ্ঘিত হওয়া যুদ্ধবিরতির সমীকরণ তারা বদলে দিয়েছেন। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরানও আর চুপ থাকবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড বা ২০২৫ সালের যৌথ হামলার সময় ইরান যেভাবে কৌশলগত ধৈর্য বা সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল, নতুন নেতৃত্ব সেই রক্ষণাত্মক নীতি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে এসেছে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সির মতে, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো আঞ্চলিক শক্তি ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা ও ইচ্ছা প্রদর্শন করছে।

একই সঙ্গে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার কৌশলগত মতপার্থক্যকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে তেহরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে পরিস্থিতি আর না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, সেখানে ইরান ওয়াশিংটনকে এক কঠিন কূটনৈতিক উভয়সংকটে ফেলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, তেহরানের নতুন নেতৃত্ব এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, যা শুধু কূটনীতির মাধ্যমে অর্জন সম্ভব নয়, তা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব। আর এ বিশ্বাস মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

/এমএকে/