শিরোনাম

সদরঘাটই যাদের জীবিকার উৎস

সদরঘাটই যাদের জীবিকার উৎস
ভোর হতেই সদরঘাটে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। ছবি: জাকির হোসেন

ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সদরঘাট নদীবন্দর, যেখানে সাইরেনের শব্দে শুরু হয় একেকটি দিন, আর সেই শব্দের আড়ালেই বয়ে চলে হাজারো মানুষের জীবনসংগ্রাম। বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে থাকা লঞ্চ, হকারের ভিড়, খালাসিদের হাঁকডাক আর ডিঙি নৌকার দোলায় গড়ে উঠেছে এক অনন্য কর্মচঞ্চল জগৎ, যেখানে সময় যেন কখনো থেমে থাকে না।

ভোর হতেই ঘাটজুড়ে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রী আর পণ্য পরিবহনের চাপ সামলাতে ছুটে চলেন নৌকাচালক, কুলি, লস্কর, হেলপার, পরিবহন শ্রমিক, হকার ও ফেরিওয়ালারা। প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি এই নদীবন্দরকে সচল রাখেন এসব শ্রমজীবী মানুষ। এই নদীকেই কেন্দ্র করে চলে শত শত মানুষের জীবিকা।

অনেকেই দৈনিক শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
অনেকেই দৈনিক শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

লঞ্চঘাটের পাশ ঘেঁষে সারি সারি ছোট নৌকা। মাঝি কালাম হোসেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রী পারাপার ও মালামাল পরিবহন করেন। তিনি বলেন, ‘জনপ্রতি ১০ ট্যাকা কইরা লই, পাঁচজন হইলেই নৌকা ছাড়ি দেই। অনেকে রিজার্ভ করেও যায়।এইভাবে দিন ভালো গেলে ৫০০-৬০০ ট্যাকা থাকে, না হইলে ২০০ ট্যাকাও হয় না। নদীর স্রোত, লঞ্চের ধাক্কা আর এত প্রতিযোগিতার মধ্যে জীবনটা ঝুঁকির মইধ্যে নিয়া কাম করি। ঝড়-বৃষ্টি হইলে তো ঝুঁকি আরও বাড়ে, তয় থাইমা থাকার উপায় নাই। কাম না করলে আয় নাই।'

একই ঘাটে ব্যস্ত কুলিদের ছুটে চলা চোখে পড়ে। মাথায় বা কাঁধে ভারী বস্তা তুলে এক লঞ্চ থেকে আরেক লঞ্চে দৌড়াচ্ছেন তারা। পাশেই একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন কুলি মো. সেলিম। তিনি জানান, ‘একটা বস্তা তুলি ২০-৩০ টাকা পাই। সারাদিনে ৩০-৪০টা তুলতে পারলে দিন চলে যায়। আমাদের কাজে প্রতিযোগিতা চলে। তাই সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও খুব কম।'

নৌকায় বসেই বেকারি পণ্য বিক্রি করেন চাচা-ভাতিজা মাকসুদুর রহমান ও আশিকুর রহমান। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার বিক্রি হলেও খরচ বাদে হাতে থাকে প্রায় ৭০০ টাকা। আশিকুর বলেন, ‘আমি কলেজে পড়ি। কিন্তু নিয়মিত ক্লাস করতে পারি না। সংসারের জন্য এই কাজটা করতেই হয়। সকালে পণ্য নিয়ে নামি, তারপর সারাদিন ঘাটে ঘাটে ঘুরি। যখন পরীক্ষা থাকে, তখন শুধু পরীক্ষা দিতে যাই, কিন্তু পড়াশোনায় মন দেওয়ার সুযোগ পাই না।’

স্থলভাগেও কর্মব্যস্ততার কমতি নেই। রিকশাচালক, অটোরিকশা ও সিএনজি চালকরা সারাদিন যাত্রী পরিবহনে ব্যস্ত থাকেন। রিকশাচালক করিম হোসেন বলেন, ‘সদরঘাটে সবসময় যাত্রী পাওয়া যায়, তাই প্রতিদিন এখানেই আইসা দাঁড়াই। সকাল থেইকা রাত পর্যন্ত ঘুরি। কখনো ভালো ভাড়া পাই, আবার কখনো বসে থাকতেও হয়। তয় এই ঘাটে আইলে খালি হাতে ফিরতে হয় না, এইটাই ভরসা।'

ফুটপাতে ফল বিক্রি করে জীবনধারণ করেন অনেকেই। ছবি: সিটিজেন জার্নাল
ফুটপাতে ফল বিক্রি করে জীবনধারণ করেন অনেকেই। ছবি: সিটিজেন জার্নাল

পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার জন্যও সদরঘাট একটি বড় কেন্দ্র। ফল, মাছ, কাপড়, মুদি পণ্য থেকে শুরু করে ছোট ফেরিওয়ালাদের ব্যবসা, সব মিলিয়ে এটি একটি বিশাল কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। তবে এই কর্মচাঞ্চল্যের মাঝেও সমস্যা কম নয়। যানজট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপত্তাহীনতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রায় সবার মুখে মুখে। তবুও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ঘাটে ফিরে আসেন এসব মানুষ।

দিনশেষে লঞ্চের সাইরেন থেমে যায়, ভিড় কমে আসে। কিন্তু এই মানুষেরা থেমে থাকেন না। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরেন, আবার ফিরে আসেন নতুন দিনে। সদরঘাট তাই শুধু একটি নদীবন্দর নয়, এটি এক জীবন্ত সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিটি সাইরেনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অগণিত মানুষের বেঁচে থাকার গল্প।

/জেএইচ/