শিরোনাম

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবার ৫ কারণে অনন্য

সিটিজেন ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবার ৫ কারণে অনন্য
মমতা বন্দোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী। কোলাজ: সিটিজেন গ্রাফিক্স

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দুই দফার ভোটপর্ব শেষে পুরো রাজ্য এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে ৪ মে-র দিকে। এদিনই জানা যাবে তৃণমূল কংগ্রেস টানা চতুর্থবারের মতো রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারছে, না কি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

অনেকেই ধারণা করছেন, এবারের ভোটে প্রধান প্রতিপক্ষ দুই দলের মধ্যে খুব 'হাড্ডাহাড্ডি' লড়াই হবে। ‘এক্সিট পোল’ বা বুথফেরত সমীক্ষার প্রায় সবগুলোতেই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান খুব কম থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এবং গরিষ্ঠতা পেলেও কোনো দলই খুব বড় ব্যবধানে জিতবে না বলেও ইঙ্গিত মিলছে।

গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ প্রায় 'একপেশে' নির্বাচন দেখে এসেছে। কংগ্রেস, বামফ্রন্ট বা তৃণমূল কংগ্রেস– যখন যারাই জিতেছে তারাই বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে। ফলে এক্সিট পোলের ইঙ্গিত অনুযায়ী সত্যিই শেষ পর্যন্ত জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে সেটা হবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বেশ বিরল একটা ঘটনা।

পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন আরও এমন কয়েকটি কারণে একেবারে আলাদা ছিল যা এই ভোটকে একেবারেই অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে।

সহিংসতামুক্ত নির্বাচন

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি অনন্য নজির গড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে নির্বাচনী সহিংসতা সব দলের শাসনামলেই কমবেশি হয়েছে। ভোটের সময় বুথ দখল, জালভোট, রাজনৈতিক খুনোখুনি, ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে যেতে বাধা দেওয়া, পোলিং এজেন্টকে বসতে না দেওয়া– এগুলো কার্যত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছিল।

সেই তুলনায় এবার ভোট হয়েছে একেবারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে– দুই দফার ভোটগ্রহণে পুরো রাজ্যে একটিও সহিংসতাজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘাত ছাড়া খুব বড় কোনো গণ্ডগোলেরও খবর নেই। এমনকী, প্রথম দফার ভোটগ্রহণের পর ১৫২টি আসনের একটি বুথেও পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ জারি করতে হয়নি নির্বাচন কমিশনকে। দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনের ক্ষেত্রে সামান্য কয়েকটি বুথে অভিযোগ ওঠার পর শুক্রবার (১ মে) সন্ধ্যা পর্যন্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দুটি বিধানসভা আসনের ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেছেন নির্বাচন কমিশন।

এর পেছনে বড় একটা কারণ ভোটের সময় বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি। রাজ্যে এবার মোট ২ লক্ষ ৪০ হাজার আধাসামরিক বাহিনী সদস্য নির্বাচনী সুরক্ষায় মোতায়েন হয়েছে– যা সর্বকালের রেকর্ড। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বা ৭০ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা বাহিনী সদস্য ভোট শেষ হওয়ার দুইমাস পর পর্যন্তও রাজ্যে অবস্থান করবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা।

বহু মানুষ এবার ভোট দিতে নিজের কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন। ভিনরাজ্য থেকে দলে দলে গ্রামে ফিরেছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা।

ভোটদানের হারে রেকর্ড

পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ– দেশের স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে কোনো নির্বাচনে এত বেশি হারে ভোট পড়েনি।

পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য বরাবরই অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি ভোট পড়ে, কিন্তু শহর-গ্রামাঞ্চল নির্বিশেষে ৯০ শতাংশর কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পড়া ওই রাজ্যের জন্যও একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

জাতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে (শতাংশের হিসেবে) সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, ৮৪.৭২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙেছে।

অনেকেই এত বেশি ভোট পড়ার কারণ ভোটার তালিকার ‘নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআরের বিষয়টি বলছেন। এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে এবার ৯০ লাখেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে, এতে ভোটদানের শতকরা হার বেড়েছে।

আরেকটা যুক্তি হলো, এসআইআরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র কারণে যেহেতু লাখ লাখ বৈধ ভোটারেরও নাম বাদ পড়েছে– তাই তালিকায় নাম থাকা অনেকেই সতর্ক ছিল যে ‘এবারের ভোট দিতেই হবে, নাহলে সামনে নিজেদেরও নাম বাদ পড়তে পারে’। অর্থাৎ, আগামী দিনে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার আতঙ্কেও ভুগেছেন অনেক মানুষ।

বহু মানুষ এবার ভোট দিতে নিজের কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন। ভিনরাজ্য থেকে দলে দলে গ্রামে ফিরেছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা।

হাওড়ার বেলুড় এলাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রোড শো। ছবি: সংগৃহীত
হাওড়ার বেলুড় এলাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রোড শো। ছবি: সংগৃহীত

কলকাতায় মোদি-শাহর রাত্রিযাপন

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের কোনো প্রান্তে নির্বাচনী প্রচারণায় গেলেও রাতে রাজধানী দিল্লিতে ফিরে আসেন। সুদূর তামিলনাডুই হোক বা অরুণাচল প্রদেশ, দিনে ৩-৪টা জনসভা করেও তিনি দিল্লিতে ফিরে এসেছেন, এমন বহুবার হয়েছে।

কিন্তু সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনের সময় তিনি কলকাতার রাজ্যপাল নিবাসে একাধিকবার রাতে থেকেছেন। শুধু তা-ই নয়, ভোরে উঠেই তিনি ছুটে গেছেন গঙ্গার ঘাটে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন, গঙ্গার বুকে ক্যামেরা হাতে নৌবিহারও বাদ দেননি।

সরু রাস্তাতেও একের পর এক রোড শো করেছেন, কলকাতার সাধারণ নাগরিকের কাছে এসে ধরা দিয়েছেন। এমনকী, বিজেপি জিতলে শপথ গ্রহণে নিজে আসবেন বলেও ঘোষণা করে গেছেন।

মোদির মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অমিত শাহ-ও দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। রাজ্যজুড়ে একের পর এক জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদি দৃঢ়ভাবে চাইছেন, তার বর্তমান মেয়াদেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসুক। বিজেপির পূর্বসূরী জনসঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, সেখানে শাসকের ভূমিকায় আসাটা বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের দিন নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জী। ছবি: সংগৃহীত
২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের দিন নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জী। ছবি: সংগৃহীত

মমতার নির্বাচনী লড়াই রক্ষণাত্মক

তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী লড়াইটা ছিল বেশ রক্ষণাত্মক– সেটাও এবারের ভোটে একটি ভিন্নতর মাত্রা।

বিরোধীরা অনেক সময় রসিকতা করে বলে থাকেন, তৃণমূল কংগ্রেসে আসলে একটাই পদ বা ‘পোস্ট’, আর সেটা শুধু মমতা বন্দোপাধ্যায়ের– বাকি সবই নাকি ‘ল্যাম্পপোস্ট’! তবে মমতা যে নিজের এলাকায় নিজের রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপারে কতটা আত্মবিশ্বাসী, এটা সম্ভবত তারও পরিচায়ক।

কলকাতার দক্ষিণে যাদবপুর বা দক্ষিণ কলকাতার মতো আসনে মমতা গত ৪২ বছর ধরে একটানা জিতে আসছেন। এখন তিনি যে ভবানীপুর আসনের প্রার্থী সেটাও এই এলাকার ভেতরেই পড়ে। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যখন পুরো রাজ্যে মাত্র একটি আসনে জিতেছিল, তখনও এই ভবানীপুরসহ দক্ষিণ কলকাতার এমপি ছিলেন তিনি।

চিরকাল এখানে তিনি অনায়াসে জিতে এসেছেন, নিজেকে খুব একটা প্রচারেও নামতে হয়নি। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে যেখানে তার আদি বাসভবন, সেটাও এই কেন্দ্রের ভেতরেই। অথচ এবার সেই ভবানীপুরে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাকে পুরো কেন্দ্র জুড়ে ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে। অনেক জায়গায় তিনি মেজাজ পর্যন্ত হারিয়েছেন।

২৯ এপ্রিল যারা ভবানীপুর কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের দিন মমতা বন্দোপাধ্যায়কে দেখেছেন, তারাও অনেকেই বলেছেন সেদিন তার শরীরের ভাষাতেও সেই আত্মবিশ্বাস ছিল অনুপস্থিত। ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকা তার সরকারের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগও উঠেছে।

আলোচনায় ‘বাঙালি অস্মিতা’

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে সেই রাজ্যের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস সবসময়ই একটি আলোচিত নির্বাচনী ইস্যু। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে ‘বাঙালিয়ানা’র সংস্কৃতি যেভাবে ইলেকটোরাল ডিসকোর্সকে প্রভাবিত করে চলেছে, তেমনটা বোধহয় আর কোনো রাজ্যেই কখনো হয়নি।

এর একটা বড় কারণ, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস চিরকাল নিজেদের 'বাঙলা ও বাঙালির দল' হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, দাবি করেছে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তারাই সবচেয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তি। উল্টোদিকে বিজেপিকে ওই রাজ্যে লড়তে হচ্ছে এমন একটা ধারণার সঙ্গে, যে তারা আসলে ‘হিন্দি হার্টল্যান্ড’ বা গোবলয়ের দল– বাঙালিয়ানার সঙ্গে যে দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো মিল নেই।

বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনায় এত গুরুত্ব পাওয়ার কারণেই ‘অস্মিতা’ শব্দটি পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে এখন বহুল ব্যবহৃত, যেটি এক সময় গুজরাটের নিজস্ব গর্ব বা সংস্কৃতিকে বোঝাতে নরেন্দ্র মোদি খুব ব্যবহার করতেন।

এই তথাকথিত ‘বাঙালি অস্মিতা’ এবার ভোটের ময়দানেও গুরুত্ব পেয়েছে। কলকাতায় একজন বিজেপি প্রার্থীকে মাছ হাতে ঝুলিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। স্মৃতি ইরানির মতো বিজেপি নেত্রীও এসে গর্ব করে বলেছেন, আমি বাংলার বাগচীবাড়ির মেয়ে, মাছের কাঁটা বেছে খেতে জানি!

এদিকে মমতা বন্দোপাধ্যায় নিজে তো বটেই, অভিষেক ব্যানার্জীসহ দলের অন্য নেতানেত্রীরাও একের পর এক সভায় দাবি করেছেন, বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায় এলে বাঙালির থালায় মাছ-মাংস ওঠা বন্ধ হবে, তখন নিরামিষ খেয়েই বাঁচতে হবে। নামের শেষে ‘জী’ বলে সম্বোধন করাটা বাঙালির সংস্কৃতি নয়, সেটাও তারা অনেকে মনে করিয়ে দিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এফসি/